অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত

এমএনএ রিপোর্ট : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি প্রয়াত অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের প্রথম জানাজা আজ শনিবার বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা জানানো হয়। সামরিক বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল তাকে গার্ড অব অনার জানায়। জানাজায় সংসদ সদস্যসহ বিশিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন।

জানাজার পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দুপুর ১২টার পর থেকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে বাদ আছর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে তৃতীয় জানাজা হবে।

ন্যাপ সূত্রে জানা যায়, রাতে মরদেহ কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদে মোজাফফর আহমদের গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হবে। আজ রবিবার সকাল ১০টায় সেখানে সমাহিত হবেন তিনি। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত গত শুক্রবার রাত ৮টায় ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত শারীরিক নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। এরই মধ্যে তাকে একাধিকবার আইসিইউতে নেয়া হয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক কন্যা সন্তানের জনক। তার স্ত্রী আমিনা আহমদ বর্তমানে ন্যাপের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং বাংলাদেশ নারী সমিতিতে সভানেত্রী হিসেবে আছেন।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আলহাজ্ব কেয়াম উদ্দিন ভূইয়া, মায়ের নাম আফজারুন্নেছা। বাবা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। মোজাফফর আহমদ স্থানীয় হোসেনতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথিমিক, জাফরগঞ্জ রাজ ইনস্টিটিউশন ও দেবিদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক এবং ভিক্টোরিয়া কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা করেন।

পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি গ্রহণ করেন এবং ইউনেস্কো থেকে ডিপ্লোমা লাভ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র মোজাফফর দীর্ঘদিন বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন। সর্বশেষ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেন ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। তার রাজনৈতিক জীবন অত্যন্ত বর্ণিল। রাজনীতি অঙ্গনে তার শুভসূচনা হয় ১৯৩৭ সালের দিকে। তিনি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের (শেরে বাংলা-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী) প্রার্থী হিসেবে নিজের এলাকা কুমিল্লার দেবিদ্বার থেকে প্রভাবশালী মুসলিম লীগ প্রার্থী ও তদানীন্তন শিক্ষামন্ত্রী মফিজউদ্দিনকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে তাক লাগিয়ে দেন।

আওয়ামী লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে ন্যাপ’র প্রতিনিধি নেতা হিসেবে অধ্যাপক মোজাফফর আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। সামরিক শাসক আইয়ুব সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করে ১৯৫৮ সালের দিকে। তাকে ধরিয়ে দিলে পুরস্কার প্রাপ্তির ঘোষণা পর্যন্ত করা হয়। আত্মগোপন থাকা অবস্থায় তিনি আইয়ুব সরকার শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সুসংগঠিত করেন। দীর্ঘ আট বছরব্যাপী আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেন।

১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি কারাবরণও করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার তথা মুজিবনগর সরকার ছয় সদস্যের যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এবং সেই ৬ জনের মাঝে তিনিই এ যাবৎ একমাত্র জীবিত উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করেন। সে সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়ন থেকে নিজস্ব উনিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনে অধ্যাপক আহমদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালে অধ্যাপক মোজাফফর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লার দেবিদ্বার আসন থেকে কুঁড়েঘর প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন। স্বৈরাচারী শাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শুরুতে তিনি কারারুদ্ধ হন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, অস্ট্রিয়া, দক্ষিণ ইয়েমেন, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যসহ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের নানান দেশে সফর করেন।

x

Check Also

ছাত্রলীগের নতুন দুই কাণ্ডারির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এমএনএ রিপোর্ট : ছাত্রলীগের নতুন দুই কাণ্ডারি হিসেবে আল-নাহিয়ান খান জয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং লেখক ...

Scroll Up