আগস্টে আরো ভয়ংকর রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু

এমএনএ ডেস্ক রিপোর্ট : চলতি আগস্ট মাসে আরো ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু। পুরো জুলাই মাসে সারা দেশে ১৬ হাজার ২২৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসাপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আর অগাস্ট মাসের প্রথম ৫ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৯৮৩ জন ডেঙ্গু রোগী। এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০৬৫ জন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ৮৬ জনেরও বেশি নারী, পুরুষ ও শিশু ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন।

গতকাল মারা গেছেন আবহাওয়াবিদের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীসহ ৭ জন। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় চিকিত্সা সেবা নিয়ে টেনশনে রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমনিতে সরকারি হাসপাতাল-গুলোতে চাহিদার তিন গুন চিকিত্সক সংকট। তার ওপর ডেঙ্গু রোগীর ভয়াবহ চাপ। এডিস মশার প্রকোপ না কমলে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপও কমবে না বলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তারা বলেন, হাসপাতালে পরীক্ষা করতে আসা ৬০ ভাগ রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নন। এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় ব্যবহারের জন্য মশার ওষুধের নমুনা বিদেশ থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছেছে। গতকাল সোমবার দুপুরে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে নমুনাগুলো ঢাকায় এসে পৌঁছায়।

কলকাতার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ ডেঙ্গু প্রতিরোধে কীটনাশক প্রয়োগের চেয়ে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার উত্পত্তিস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। গতকাল সোমবার দুপুর পৌণে তিনটায় রাজধানীর গুলশানস্থ নগর ভবনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি এ গুরুত্ব আরোপ করেন।

কলকাতা থেকে তিনি ভিডিও কনফারেন্সে বলেন, কলকাতা পৌরসভা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে প্রতিরোধ ও প্রতিকার এ দু’টি ভাগে বিভক্ত করেছে। কলকাতা পৌরসভা ২০০৯ সাল থেকে ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে তিন স্তর বিশিষ্ট মনিটরিং চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়ার্ড, বরো ও হেড কোয়ার্টার এ তিন পর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কলকাতায় সারা বছর ধরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মনিটরিং এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় বলেও তিনি জানান।

অতীন ঘোষ বলেন, ‘মশারে করো উেস বিনাশ’ এই স্লোগান নিয়ে বাসা-বাড়ি কিংবা উন্মুক্ত জলাশয় যেখানেই এডিস মশার প্রজননস্থল পাওয়া যায়, তা ধ্বংস করা হয়। ঢাকার কোন কোন এলাকা ডেঙ্গু প্রবণ তা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ি ব্যবস্থা গ্রহণেরও পরামর্শ দেন তিনি।

অতীন ঘোষ বলেন, প্রয়োজনভিত্তিক কৌশলী হতে হবে। কলকাতা পৌরসভা ৯ বছর যাবত অবকাঠামোভিত্তিক লড়াই চালিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিনি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন।

কলকাতার ডেপুটি মেয়র জানান, কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে ফগার মেশিনের সাহায্যে ধোঁয়া প্রয়োগ কার্যকরী হলেও এডিস মশা দমনে এর কার্যকারিতা কম। এডিস মশা দমনে উেস নির্মূল করা এবং জনসচেতনতা তৈরি করারও বিকল্প নেই বলে অতীন ঘোষ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের লক্ষ্যে আইন পরিবর্ধন করে শাস্তির পরিমান বাড়ানো হয়েছে। ফলে মানুষ আগের চেয়ে অনেক সচেতন। ডিএনসিসি মেয়র কলকাতার ডেপুটি মেয়রকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আজকের এই কনফারেন্স থেকে আমাদের অনেক ‘নলেজ শেয়ারিং’ হলো। কলকাতার অভিজ্ঞতা আমরা কাজে লাগাতে পারবো। কলকাতার সঙ্গে এ ধরণের ‘নলেজ শেয়ারিং’ এটি প্রথম হলেও শেষ নয়। ভবিষ্যতে দুই শহরের যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক মো. খলিলুর রহমান, ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল হাই, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান মামুন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার, কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী, কলকাতা পৌরসভার চিফ ভেক্টর কন্ট্রোল অফিসার ডা. দেবাশীষ বিশ্বাস, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মনিরুল ইসলাম, উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুব্রত রায় চৌধুরী, স্বাস্থ্য বিষয়ক মূখ্য পরামর্শক ডা. তপন মুখার্জী প্রমূখ ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম জানিয়েছে, রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে মোট ২০৬৫ জন ডেঙ্গু নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন। মাঝে দুদিন নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা কিছুটা কমলেও গত রবিবার থেকে এই ধারা আবার বাড়তির দিকে যায়। গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট ১৭১২ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ডেঙ্গু আতঙ্ক ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। এই রোগ পরীক্ষার হিড়িক পড়ায় ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিটের সংকট দেখা দিয়েছে সারাদেশে, দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। কোনো কোনো বেসরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অবস্থায় গত রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুরোধ করা হয়েছে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডেঙ্গুর পরীক্ষা না করাতে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত মোট ২৭ হাজার ৪৩৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৯ হাজার ৭৬১ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। মোট ৭ হাজার ৬৫৮ জন এখনো চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে রাজধানীর ৩৮টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৪ হাজার ৯৬২ জন ডেঙ্গু রোগী। আর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ভর্তি আছেন ২ হাজার ৬৯৬ জন।

২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হওয়া ২০৬৫ জন নতুন রোগীর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ১৫৯ জন এবং রাজধানীর বাইরে সারা দেশে ৯০৬ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৮৭০ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন, তাদের মধ্যে রাজধানীতে এক হাজার ৫৩ জন এবং রাজধানীর বাইরে সারা দেশে ৮২১ জন। অর্থাৎ, ঢাকার পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এসব জেলার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ২২১ জন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮০ জন, খুলনা বিভাগে ১৫০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১১২ জন, বরিশাল বিভাগে ৯৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬১ জন, রংপুর বিভাগে ৪৭ জন এবং সিলেট বিভাগে ৩৬ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে।

ডেঙ্গুতে দুই দিনে ১৪ জন মারা গেছেন

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গতকাল সোমবার ঢাকা, মাদারীপুর, খুলনা, কুমিল্লা ও রংপুরের মিঠাপুকুরে মোট ৭ জন মারা গেছেন। আজ মঙ্গলবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই শিশুসহ অন্তত সাত জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

গতকাল সোমবার মৃতদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা এক নারী ও ১৩ বছরের এক শিশু রয়েছে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার আবহাওয়াবিদ নাজমুল হকের স্ত্রী শারমিন আক্তার (৩২) নামে ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারী মারা গেছেন। গতকাল সোমবার ভোরে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাসান (১৩) নামে এক কিশোর মারা গেছে। এ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ পর্যন্ত ১৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রিপন হাওলাদার (৩০) মারা গেছেন। খুলনায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে খাদিজা বেগম (৪০) মারা গেছেন। গতকাল সোমবার সকালে খুলনা নগরীর সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। রংপুরের মিঠাপুকুরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৪ বছর বয়সী এক শিশু মারা গেছে। তার নাম তিষা মণি।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে পাবনার শিশু নাইসা (৫ মাস)। এদিকে গতকাল ঢাকার শনির আখড়ার বাসিন্দা নকুল কুমার দাস (৪৫) নামে একজন মারা গেছেন।

এদিকে আজ মঙ্গলবার মৃতদের মধ্যে ঢাকায় দুই নারী ও এক পুরুষ, দিনাজপুরে এক কিশোর এবং রংপুর ও চাঁদপুরে একজন করে শিশু রয়েছে।

রাজধানী ঢাকার আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে গতকাল সোমবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইতালি প্রবাসী এক নারী এবং ধানমন্ডির একটি প্রাইভেট হসপিটালে শিশু মারা গেছেন। এদিকে, আজ মঙ্গলবার সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে বৃদ্ধা ও রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

স্বামী-সন্তান নিয়ে দেশে বেড়াতে এসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গতকাল সোমবার রাতে ঢাকার আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে মারা যান ইতালি প্রবাসী হাফসা লিপি (৩৪)।

হাসপাতালের পরিচালক জসিমউদ্দিন খান গণমাধ্যমকে জানান, ওই নারী চার দিন ধরে সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আইসিইউতে থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

হাফসার স্বামী সর্দার আব্দুল সাত্তার তরুণ (৩৬) নিজেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। দুই সন্তান অলি (১২) ও আয়ানকে (৬) নিয়ে সপ্তাহ তিনেক আগে দেশে এসে কলাবাগানে উঠেছিলেন তারা।

সাত্তারের বড় বোন ডা. নুরুন্নাহার গণমাধ্যমকে জানান, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ থানার সর্দার বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে হাফসাকে দাফন করা হবে।

এদিকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক বৃদ্ধা মারা গেছেন। তার নাম মনোয়ারা বেগম (৭২)। তাদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের আহমেদপুর। ছেলে মোশারফ হোসেনের পরিবারের সঙ্গে মিরপুরে থাকতেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন জানান, গত ৩ অগাস্ট ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন মনোয়ারা। আজ মঙ্গলবার ভোর ৪টায় তিনি মারা যান।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু জ্বরে আমজাদ মণ্ডল (৫২) নামে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার মধ্যরাতে তাকে ভর্তি করা হয়। আজ মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৬টায় তার মৃত্যু হয়।

আমজাদ পেশায় কৃষক। তার বাড়ি মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার তেতুয়াধারা গ্রামে।

মৃতের ছোট ভাই রাশেদ মণ্ডল গণমাধ্যমকে বলেন, আমজাদ শুক্রবার জ্বরে আক্রান্ত হলে তাকে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ধানমন্ডির একটি প্রাইভেট হসপিটালে গতকাল সোমবার রাতে ডেঙ্গুতে মদিনা আক্তার (৮) নামের এক শিশু মারা গেছে। তার বাড়ি মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর পৌরসভার ছোট ঝিনাইয়া গ্রামে। সে স্থানীয় অক্সফোর্ড কিন্ডারগার্ডেন এ কেজি ওয়ানে পড়তো। তার বাবা মিজানুর রহমান মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। দুই ভাই-বোনের মধ্যে মদিনা বড়।

ছেংগারচর বাজারের একটি ডায়াগনিস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয় তার পরিবার। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পর দ্রুত চাঁদপুর সদর হাসপাতালে প্রেরণ করে পরামর্শ দেওয়া হয়। চাঁদপুর থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হসপিটালে। সেখানে চিকিৎসা চলাকালীন আইসিইউতে নেয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে সিট না পাওয়ায় বেশ কয়েকটি হসপিটাল ঘুরে অবশেষে ভর্তি করানো হয় ধানমন্ডির একটি প্রাইভেট হসপিটালে। গত সোমবার রাত ১২টার দিকে সেই হসপিটালে মদিনা মৃত্যুবরণ করে।

মা ময়না আক্তার জানান, ডেঙ্গু আতঙ্কের কথা মেয়ে আমাকে প্রায়ই জানাতো। স্কুলে শিক্ষকরা না নাকি ডেঙ্গুর বিষয়ে তাদের সতর্ক থাকতে এবং বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে বলতো। কে জানে সেই ডেঙ্গুই মেয়ের প্রাণ নেবে। মদিনা বাড়িতেই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে।

এদিকে, দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে।

কিশোর রবিউল ইসলাম (১৭) ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ গ্রামের নয়ন ইসলামের ছেলে।

আজ মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তার মৃত্যু হয় বলে হাসপাতালের পরিচালক ডা. আবু মোহাম্মদ খয়রুল ইসলাম জানিয়েছেন।

এদিকে, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আজ মঙ্গলবার সকালে রিয়ানা নামের তিন বছরের এক শিশু মারা গেছে। তার বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার নাকাইহাট এলাকায়। রিয়ানার বাবার নাম আশরাফুল আলম।

হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকরী অধ্যাপক সাহেদুজ্জামান রিবেল গণমাধ্যমকে বলেন, ডেঙ্গু জ্বরসহ শিশুটিকে গত শনিবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সঙ্গে নিউমোনিয়াও ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ অযথা আতঙ্কিত হয়ে ডেঙ্গু টেস্ট না করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় প্রয়োজন। অকারণে চাপ বাড়ালে যারা সত্যিই খুব অসুস্থ, তাদের সেবায় বিঘ্ন ঘটবে। এজন্য অযথা আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে টেস্ট করতে হবে। গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি একথা বলেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, চিকিৎসকরা বিরামহীনভাবে ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে অনেকে সর্দি জ্বর ও সাধারণ জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। বাংলাদেশে যারা মারা গেছেন, তারা শুধু ডেঙ্গু জ্বরে নয়, তাদের হার্ট, কিডনি, ডায়াবেটিকস, উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য রোগ ছিল বলে তিনি জানান।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসকরা এখন অভিজ্ঞ হয়ে গেছেন। তবে যে হারে ডেঙ্গু রোগী আসা অব্যাহত আছে, তাতে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কতোটা সামাল দিতে পারবো তা জানি না। তিনি বলেন, তার কাছে আসা রোগীদের ৭৫ ভাগেরই ডেঙ্গু হয়নি।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তর কুমার বড়ুয়া বলেন, প্রচন্ড রোগীর চাপে এ হাসপাতালে ৭ জন ডাক্তার ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আবার তিন জনের ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। দুই জন নার্সও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত। এভাবে ডেঙ্গু রোগী আসা অব্যাহত থাকলে সেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সি বলেন, এ হাসপাতালে পরীক্ষা করতে আসা ৫০ ভাগ রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নন। সাধারণ জ্বর নিয়ে অনেক হাসপাতালে আসছেন।

সম্প্রতি সারাদেশে বেড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। তাই কম খরচে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে ডেঙ্গু টেস্ট কিট, ডেঙ্গু রি-এজেন্ট ও প্লাটিলেট অ্যান্ড প্লাজমা আমদানিতে শুল্ক, ভ্যাট, আগাম কর এবং অগ্রিম আয়কর অব্যাহতি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই সুবিধা আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বহাল থাকবে।

x

Check Also

তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ৬৬ যুদ্ধবিমান বিক্রি

এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : চীনের সঙ্গে চলমান ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’সহ বিভিন্ন সংকটের মধ্যেই তাইওয়ানের কাছে ৬৬টি ...

Scroll Up