ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে জেরুজালেমকেই ট্রাম্পের স্বীকৃতি

23
এমএনএ রিপোর্ট : সারা বিশ্বের উদ্বেগ ও সাবধান বাণী উপেক্ষা করে মুসলমানদের পুণ্যভূমি জেরুজালেমকেই ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জাতিসংঘ, আরব ও বিভিন্ন মুসলিম দেশসহ অন্যান্য মার্কিন-মিত্রদের কোন আপত্তি আমলেই নিলেন না তিনি।
জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা ও দূতাবাস স্থানান্তর বিষয়ে ট্রাম্পকে সাবধান করেছিল জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরব লিগ, সৌদি আরব, জর্ডান, তুরস্ক, ফ্রান্স এবং জার্মানি সহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। তার পূর্বসুরিরাও শান্তি প্রক্রিয়ার স্বার্থে জেরুজালেম ইস্যুতে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে ট্রাম্প তার উল্টোটাই করে দেখালেন।
ঐতিহাসিক সময় থেকে জেরুজালেম মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদীসহ বিভিন্ন ধর্মের লোকদের কাছে পবিত্র নগরী হিসেবে বিবেচ্য হয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া জেরুজালেম ইস্যুটি সবচেয়ে বড় সমস্যার একটি।
ইসরাইল জেরুজালেমকে শাশ্বত এবং অবিভক্ত রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করে। পাশাপাশি তার মিত্র দেশের সব দূতাবাস সেখানে স্থাপন হোক এটাই তার দাবি।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা তাদের ভূমি থেকে দখলদার ইসরাইলকে সরে যাবার দাবি জানিয়ে আসছে বহুবছর ধরে। ১৯৬৭ সালে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর ইসরাইল ফিলিস্তিনের বিস্তীর্ণ ভূমি দখলের পাশাপাশি জেরুজালেমসহ অন্যান্য পবিত্র স্থানও দখল করে নেয়। পূর্ব জেরুজালেমকে নিজেদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দেখতে চায় ফিলিস্তিন। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও শহরটিকে ইসরাইলের অংশ হিসেবে মেনে নেয়নি। এ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে আসছে।
তবে এ সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি পুরো বিশ্বের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর ফিলিস্তিনের মুক্ত চিন্তার রাজনীতিবিদ মুস্তাফা মারঘুতি আল জাজিরাকে বলেন, এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটি বেপরোয়া কাজ। তার দেয়া ঘোষণায় গুরুতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, যা এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করবে। ট্রাম্পের ঘোষণা ১.৬ বিলিয়ন মুসলিম, ২.২ বিলিয়ন খ্রিস্টান এবং ৩৬০ মিলিয়ন আরবের জন্য নতুন সংকটের কারণ হবে।
গত সাত দশক ধরে মার্কিন প্রশাসনের কাছে এটি ‘স্পর্শকাতর’ বিষয় হিসেবেই চিহ্নিত ছিল। বিতর্ক এড়াতেই যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। সমঝোতার ভিত্তিতে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের সুরাহা করার যে মার্কিন-নীতি তাঁর স্পষ্ট ব্যত্যয় ট্রাম্পের এই ঘোষণা।
হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প এই স্বীকৃতির ব্যাপারে নিজের দৃঢ় সংকল্পের কথাই পুনর্ব্যক্ত করেছেন, ‘আমি ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে জেরুজালেমকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ ছিলাম। কাজটা ঠিকই হয়েছে।’
গত বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময় জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে প্রবেশের ১০ মাসের মাথায় তিনি সেই প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়ন করলেন।
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট নিয়ে অতীতের মার্কিন নীতিকেও নিজের বক্তব্যে কটাক্ষ করেছেন ট্রাম্প, ‘অতীতের অনেক প্রেসিডেন্টই বলেছিলেন যে তাঁরা এটি করতে চান (জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া)। কিন্তু তাঁরা তা করেননি। তাঁরা করার সাহস পাননি নাকি নিজেদের মতের পরিবর্তন করেছিলেন, আমি বলতে পারব না। আমি মনে করি অনেক আগেই এটি করা উচিত ছিল।’
১৯৯৫ সালে ইসরায়েলের রাজধানী তেলআবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নেওয়া হবে—এই মর্মে একটি আইন পাস হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু এরপর থেকে প্রতি ছয় মাস পরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি আদেশে সই করেন। এর মাধ্যমে এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া ছয় মাসের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে হামাস ট্রাম্পের এই ঘোষণায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা বলেছে এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ‘নরকের দরজা’ খুলে গেল।
তারা আরব ও অন্যান্য মুসলিম দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্রের দূতকে নিজ নিজ দেশ থেকে বহিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছে।
প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) মহাসচিব ট্রাম্পের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ‘পৃথক দুই রাষ্ট্রের ভাবনা’র সর্বশেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে গেছে।
তিনি মনে করেন, এই ঘোষণার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সমস্যার মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও মর্যাদা হারিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে ‘ঐতিহাসিক’ বলেছেন। তিনি এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বলেন, ‘এটি “সাহসী” ও “ন্যায়-সংগত” সিদ্ধান্ত।’
নেতানিয়াহু অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিষ্টান—এই তিন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর পুণ্যভূমি হিসেবে জেরুজালেমের যে অবস্থান, ট্রাম্পের এই ঘোষণায় এর কোনো পরিবর্তন হবে না। সূত্র: এএফপি