এক সপ্তাহের ছুটিতে বেড়িয়ে আসুন দার্জিলিং

57

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : দার্জিলিং ভ্রমণ মানেই যেন মেঘের মাঝে বিচরণ। আমাদের দেশের মানুষ পারিবারিক ভ্রমণে পাশের দেশ ভারতের যে অঞ্চলটি সবচেয়ে বেশী ভ্রমণ করেন তা হল দার্জিলিং। বহনযোগ্য খরচে কাছাকাছি ভ্রমণে আসলেই দার্জিলিং এর জুড়ি নেই। তাই চারদিন থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে যে কোন ছুটিতে বেড়িয়ে আসতে পারেন অপরূপ সৌন্দর্যের হাতছানি দার্জিলিং।

বাংলাদেশ থেকে যেসব মানুষ ভারতে যান তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যান দার্জিলিং। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই স্থানটির আকর্ষণ অন্য স্থানগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। আপনার দার্জিলিং ভ্রমণ অনেক আনন্দদায়ক হয়ে উঠুক সেজন্য দার্জিলিং সম্পর্কিত তথ্যাদি নিয়ে আমাদের এ বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে কিভাবে যাবেন?
বাংলাদেশ থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথ এখন তিনটি- রেলপথ, সড়কপথ ও আকাশপথ। আকাশপথে যেতে চাইলে ঢাকা, চট্টগ্রাম থেকে জেট এয়ার, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, বাংলাদেশ বিমানে করে সরাসরি কলকাতা। খরচ হবে ১১,০০০ টাকা থেকে ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত। সেখান থেকে আবার এয়ার ইন্ডিয়ায় চেপে সাশ্রয়ীমূল্যে শিলিগুড়ি। সেখান থেকে চান্দের গাড়ি চেপে যেতে হবে দার্জিলিং। চান্দের গাড়ির ভাড়া পড়বে ১৪০ রুপি বা ১৬০ টাকা। আর এতো ঝামেলা করার চেয়ে সরাসরি বাংলাদেশ থেকে বাস সার্ভিস রয়েছে ভারতে। তার মধ্যে শ্যামলী পরিবহন সরাসরি শিলিগুড়ি পর্যন্ত সেবা দিয়ে থাকে। ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার ভাড়া পড়বে ১,৬০০ টাকা। বর্ডার পার হওয়ার সময় ভ্রমণকর হিসেবে দিতে হবে অতিরিক্ত ৩০০ টাকা। এবার আসা যাক রেলপথ। রেলপথে যেতে হলে ঢাকা থেকে টিকেট করতে হবে। এখন অবশ্য চট্টগ্রাম থেকেও মৈত্রী ট্রেনের টিকিট করা যায় কিন্তু যাত্রা করতে হবে ঢাকা থেকে।

দার্জিলিংয়ে ভ্রমণের সময়

শীতের শুরু বা শেষের দিকে দার্জিলিং ভ্রমণের জন্য ভালো। দার্জিলিং এ পাহাড়ি ধস নামে বর্ষা মৌসুমে। শীত বা গরমে সে ঝুঁকি নেই। ঠাণ্ডার এড়াতে গরম কাপড় নেয়া জরুরি। হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে চলাফেরা করলে দালাল বা হারিয়ে যাওয়ার শংকা থাকে না।

দার্জিলিংয়ে কোথায় থাকবেন?

দার্জিলিং যেহেতু পর্যটন এলাকা তাই থাকার জায়গার সমস্যা নেই। দার্জিলিং শহরে সব মানের হোটেল আছে। এখানে মাঝারি দাম থেকে অল্প দামের হোটেলও পাবেন আপনি। গচ্ছা দিতে না চাইলে দালাল এড়িয়ে নিজে হোটেল ঠিক করুন। তবে ঠিক করার আগে জেনে নিন গরম পানি আর রুম হিটারের ব্যবস্থা আর বেড়ানোর জন্য জিপসহ তাৎক্ষণিক সেবা সম্পর্কে। দার্জিলিং ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে বেলভিউ, সাগরিকা, সোনার বাংলা, মহাকাল হোটেল বেশি জনপ্রিয়। প্রতিটি সিঙ্গেল রুমের ভাড়া পড়বে ১,০০০ রুপি। ডাবল রুমের ভাড়া ১,২০০ রুপি। আর তিন বেডের রুমের ভাড়া ১,৫০০ রুপি।

দার্জিলিংয়ে কোথায় খাবেন?

ভোজন রসিকদের জন্য খুব জনপ্রিয় স্থান দার্জিলিং। হোটেলে বাঙালি খাবারসহ পুরো ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবার আপনি এখানে পাবেন।এছাড়া ভোরবেলায় বেড-টি এবং ডিনারের আগে ইভনিং-টির ব্যবস্থা থাকে।তবে রেস্তোরাঁর খাবারের দাম বেশি। এক্ষেত্রে আপনি বেছে নিতে পারেন স্ট্রিটফুড। এখানের স্ট্রিটফুডগুলো বেশ উপাদেয়। নুডলস পাওয়া যায় সব রেস্তোরাঁয় কিন্তু পেটপুরে খেতে চাইলে যেতে হবে ম্যালয়ে। দার্জিলিং-এর ভালো চা পাতা কিনতে চাইলেও যেতে হবে ম্যালয়ে।

দার্জিলিংয়ে কোথায় বেড়াবেন?

দার্জিলিং-এ বেড়ানোর জায়গার অভাব নেই। প্রত্যেক হোটেলের সামনেই পাবেন গাড়িসহ ট্যুর গাইড। যে কোন ধরণের তথ্যের জন্য আপনি সর্বাত্মক সহযোগিতা পাবেন পর্যটন অফিস থেকে। কাছাকাছি দেখার মতো উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলো হলো-

১.  পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু রেলওয়ে স্টেশন ঘুম।
২.  সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০,০০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে অপূর্ব সূর্যোদয় দেখা।
৩.  খুব ভোরে ৮ হাজার ৩’শ ফুট উঁচু টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা পাহাড় চূড়ায় সূর্যোদয়ের অসাধারণ দৃশ্য।
৪.  পৃথিবীর বিখ্যাত প্রার্থনা স্থান ঘুম মোনাস্ট্রি।
৫.  কেবল কারে ১৬ কিমিটার এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ভ্রমণ।
৬.  হ্যাপি ভ্যালি টি গার্ডেনে পৃথিবী খ্যাত ব্ল্যাক টি পানের অপূর্ব অভিজ্ঞতা।
৭.  যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থী কেন্দ্র তিব্বতিয়ান সেলফ হেলপ্ সেন্টার।
৮. প্রায় ৮’শ ফুট উঁচুতে দার্জিলিং গোরখা স্টেডিয়াম।
৯.  নেপালি জাতির স্বাক্ষর বহনকারী দার্জিলিং মিউজিয়াম।
১০. ব্রিটিশ আমলের সরকারি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র কাউন্সিল হাউস লাল কুঠির অসাধারণ শৈল্পিক নিদর্শন খ্যাত আভা আর্ট গ্যালারি।
১১. শতবর্ষের প্রাচীন মন্দির দিরদাহাম টেম্পল।
১২. পাথর কেটে তৈরি রক গার্ডেন এবং গঙ্গামায়া পার্ক।
১৩. হিমালয় কন্যা কাঞ্চন-জংঘা, পানির অবিরাম ঝর্ণাধারা ভিক্টোরিয়া ফলস্ এবং সুসভ্য জাতির সংস্কৃতি।

এছাড়াও যে জায়গাগুলোতে অবশ্যই যাবেন তা হলো-

টাইগার হিল
টাইগার হিলে সবাই যায় সূর্যদয় দেখতে। আর তা দেখা জন্য বের হতে হয় ভোর চারটায়। টাইগার হিল দার্জিলিং এর সবচেয়ে উঁচু যায়গা। মূল টাউন থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূর। আর জীপে করে পৌছাতে প্রায় ৪০ মিনিটের মত লাগে। অনেক মানুষ যায় ঐখানে। টিকেট কাটতে হয়। টিকেট কেটে আরো অনেক দূর হেঁটে যেতে হয়। পাহাড়ে হাঁটা যথেষ্ট কষ্টকর, তারপর ও সূর্যদয় দেখার জন্য সবাই টাইগার হিলে জড়ো হয়।

স্মৃতিসৌধ বাতাসিয়া লুপ
বাতাসিয়া লুপে কিছু ফুল গাছ সুন্দর করে সাজানো আছে। এটা ছোট রেইল লাইনের একটা রাস্তা বা লুপ। যেটা সুন্দর, তা হচ্ছে বাতাসিয়া লুপ থেকে দার্জিলিং শহরের ভিউ। এখান থেকে দার্জিলিং এর অনেক অংশের অসাধারণ ভিউ দেখা যায়।

Japaneese Peace Pagoda & Japanies Temple
জাপানি এই প্যাগোডা দেখে যাবেন অবশ্যই। ধবধবে সাদা ভিন্ন ধাঁচের এই প্যাগোডা নিঃসন্দেহে মুগ্ধ করবে আপনাকে। প্রবেশমুখে রয়েছ এদু’টি সিংহ মূর্তি। ভেতরে বৌদ্ধ মূর্তি এবং ধর্মীয় আবেশ একটা নীরব শান্তির পরিবেশ তৈরি করেছে।

Himalayan Mountaineering Institute:
এভারেস্টে যারা উঠতে চায়, তাদের জন্য HMI তীর্থযাত্রার মত। এখানে ট্রেনিং দেওয়া হয়। থাকার ব্যবস্থা সহ সব কিছু আছে। সাথে রয়েছে মিউজিয়াম। এখানকার সব সংগ্রহ এভারেস্ট সম্পর্কিত। এ ইন্সটিটিউটটি Tenzing Norgay এর সন্মানে করা হয়। মিউজিয়ামের সামনে Tenzing Norgay এর একটা স্ট্যাচু রয়েছে।

কেবল কার
কেবল কার থেকে দার্জিলিংকে দেখার অভিজ্ঞতা এক ভিন্ন রকম আনন্দ দেবে আপনাকে। মোট ৪ কিলোমিটারের এই আকাশ ভ্রমণ হয়ে থাকবে চিরস্মরণীয়। একটি কারে ৬ জন করে ওঠা যায়। কেউ একা থাকলে অন্য পরিবার বা দলের সাথে মিলে উঠতে হয়।

রক গার্ডেন
দার্জিলিং এর জনপ্রিয় একটি স্থান রক গার্ডেন। রক গার্ডেন সাধারণত বিকেলের দিকে যায় সবাই। ৩টার দিকে। তখন জীপ পাওয়া যায়। শহর থেকে অনেক নিচে জায়গাটি। যাওয়ার পথে অনেক গুলো চা বাগান চোখে পড়ে। রক গার্ডেনের ভেতর আছে ছোট চমৎকার একটি ঝর্ণা। ঝর্ণার পাশে সিড়ি তৈরি করা আছে। পুরো এলাকাটি বেশ সাজানো গোছানো।

চৌরাস্তা এবং মল
এটি দার্জিলিং এর প্রাণকেন্দ্র। চৌরাস্তা আর মলের যেদিকেই যান না কেন অপরূপ দার্জিলিং এর দৃশ্য মুগ্ধ করবে আপনাকে। যেমন চমৎকার পাহাড়, এমনি মেঘের মিলনমেলা। একটি দিনকে সার্থক করতে আর কি চাই?

Observatory Hill and Mahakal Temple
চৌরাস্তার আরো উপরে রয়েছে অবজারভেটরি হিল এবং Mahakal Temple । যেখান থেকে সব কিছু সুন্দর করে দেখার কথা। কিন্তু ঐখানের গাছ গুলো এত বিশাল বিশাল যে, গাছের জন্য চারপাশ কিছুই দেখা যায় না। তার উপর গাছগুলো ঐ জায়গাটাকেই অন্ধকার করে রেখেছে। সেখানেই রয়েছে মন্দিরটি। প্রাচীন মন্দিরটি দেখতে ভালই লাগবে আপনার।

দার্জিলিং চিড়িয়াখানা
দার্জিলিং এ আছে একটি চিড়িয়াখানা। তেমন বড় না। অল্প কিছু প্রাণী। আছে বিলুপ্ত-প্রায় পাহাড়ি বাঘ। কিন্তু উঁচু নিচু হওয়াতে হাঁটতে ভালোই কষ্ট হবে। এখান থেকে সোজা চলে যান চা বাগান দেখতে। যদিও দার্জিলিং এর প্রায় পাহাড়েইও রয়েছে চা বাগান। তবু কাছ থেকে ঘুরে ঘুরে দেখার আর সেলফি তোলার মজাই আলাদা।

তেনজিং রক
চা বাগান দেখে এবার যান Tenzing Rock এর কাছে। এ বিশাল পাথরে প্র্যাকটিস করেই নাকি Tenzing Norgay এভারেস্ট জয় করতে যায়। পাথরটির উচ্চতা আসলেই অবাক করবে আপনাকে। দড়ি ধরে ওঠার ব্যবস্থা আছে। চাইলে আপনিও উঠে যেতে পারবেন এর চূড়ায়।

দার্জিলিংয়ে কেনাকাটা

দার্জিলিং শহরের লাডেন-লা রোডের মার্কেটে ক্রয়-ক্ষমতার মধ্যে শীতের পোশাক, হাতমোজা, কানটুপি, মাফলার, সোয়েটারসহ লেদার জ্যাকেট, নেপালি শাল এবং শাড়ি, অ্যান্টিক্স ও গিফট আইটেম, লেদার সু, সানগ্লাস। প্রতারনার শংকা নেই। তবে ভ্রাম্যমাণ ফেরি থেকে শাল, শাড়ি না কেনাই ভাল। যেতে বা আসতে শিলিগুড়ির বিধান মার্কেট থেকেও কেনাকাটা করা যায়।

দার্জিলিংয়ে বেড়ানোর মোট খরচ

ঢাকা থেকে দার্জিলিং থাকা, খাওয়া, যাতায়াত বাবদ প্রতিজনে সর্বোচ্চ খরচ ১৫ হাজার টাকা হতে পারে । বুড়িমারি দিয়ে খরচ কম। কলকাতার হয়ে গেলে খরচটা বাড়বে। ট্যুরিজম কোম্পানি প্যাকেজ ট্যুর করে থাকে।

দার্জিলিংয়ের আশপাশে

দার্জিলিং থেকে মিরিক লেক ও নেপালের পশুপতি মার্কেট জিপে ঘুরে আসুন সকাল ৯টা-বিকাল ৫টার মধ্যে। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেনে কার্শিয়াংয়ে থাকার পরে শিলিগুড়ি। যাত্রার দিন থেকে ৫ দিনেই ঘুরে আসতে পারেন। ভারতীয় ভিসার আবেদনপত্র পূরণের সময় স্থলবন্দরের নাম উল্লেখ করুন।