ঈদের ছুটি কাটুক সমুদ্রের নীলে

40

মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ) ডেস্ক : বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণ দিয়েই শুরু হয় অনেকের ঘরের বাইরে দুই পা ফেলা, অর্থাৎ আনন্দযাত্রা। এবারের ঈদের ছুটি কাটুক সমুদ্রের নীলে।

কক্সবাজার বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এখানে বছরের প্রায় সব সময় পর্যটকের ভিড় লেগে থাকে। আর পর্যটন মৌসুমে তো কোনো কথাই নেই। প্রতি বছর দেশ ও দেশের বাইরে থেকে কয়েক লাখ পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। জুন ও জুলাই মাসে বঙ্গোপসাগর সবচেয়ে বেশি উত্তাল থাকে। সুতরাং এখন যারা কক্সবাজার যাবেন তারা দূর থেকে ধেয়ে আসা এক-একটি প্রকাণ্ড ঢেউ সৈকতে আছড়ে পরার দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন। পাঠক, এমন দৃশ্য স্মৃতিবন্দী করতে যদি ঈদের ছুটি কক্সবাজারে কাটাতে চান তাহলে মন্দ হয় না। আপনার সেই আনন্দ ভ্রমণ যাতে গোছানো, নির্ঝঞ্ঝাট ও সার্থক হয়ে ওঠে সে কারণেই আজকের এই লেখা।

চলুন প্রথমে জেনে নেয়া যাক কক্সবাজার গিয়ে আমরা কী কী দেখব?

বৌদ্ধ মনাস্ট্রি বা মঠ আশ্রম :  ‘আগমেদা খ্যাং’ আশ্রম বলে খ্যাত এই মঠ কক্সবাজারের অন্যতম একটি কীর্তি। কক্সবাজারসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের চার লক্ষাধিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্রতম স্থান এটি। শহরের প্রবেশদ্বারের নিকটেই এর অবস্থান। দীর্ঘ আকৃতির সব বৃক্ষের ছায়ার নিচে গম্ভীর ভাবমূর্তি আপনাকে বিনম্র হতে বাধ্য করবে। আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, কাঠের কলামগুলোতে খোদিত হয়েছে বুদ্ধের অসাধারণ সব প্রতিকৃতি। সংরক্ষিত রয়েছে বহু পুরনো হস্তলিপি। আরও সংরক্ষিত রয়েছে চুনাবালি ও ব্রোঞ্জের তৈরি বুদ্ধের মূর্তি। সাধারণ কিছু রীতি-নীতি মেনে যে কেউ ঘুরে দেখতে পারেন এই মঠ।

ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক :  দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সাফারি পার্ক এটি। কক্সবাজারের ডুলাহাজরায় এর অবস্থান। পার্কজুড়ে রয়েছে বয়লাম, গর্জন, তেলশুর এবং চাপালিশসহ নানা প্রজাতির গাছ। পশুপাখিও রয়েছে প্রচুর! উন্মুক্ত স্থানে বন্যপ্রাণির বিচরণ আপনাকে মুগ্ধ করবে। পার্কের অভ্যন্তরে বিশেষ বাস অথবা জিপে করে সেগুলো দেখার সুযোগ পাবেন আপনি। পাহাড়ি এলাকায় গড়ে তোলা এই পার্কের আয়তন ২,২২৪ একর। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় যাতায়াতও সহজ। যে কারণে এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আরেকটি তথ্য পাঠকদের জানিয়ে রাখি, ডুলাহাজরাতেই রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক। এটি দেশের প্রথম সাফারি পার্ক।

হিমছড়ি :  দৃষ্টি যত দূর যায়, আকাশ আর সমুদ্র মিশে একাকার। তারই এক পাশ দিয়ে ছুটে চলে গাড়ি। পথের আর এক পাশে সুদীর্ঘ পাহাড়। কক্সবাজার থেকে দক্ষিণে ২০ কি.মি. দূরে হিমছড়ির অবস্থান। এবার ভেবে দেখুন, নিরিবিলি সেই সড়কে ছুটছে আপনাকে বহনকারী জিপ অথবা ব্যক্তিগত গাড়ি। হিমছড়ি একটি জনপ্রিয় পিকনিক স্পট, একইসঙ্গে শুটিং স্পটও। এখানে একটি ঝরনাও রয়েছে। হিমছড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর যাত্রাপথের সৌন্দর্য।


ইনানী বীচ :  নীরব পরিবেশই ইনানী সমুদ্র সৈকতকে অধিক জনপ্রিয় করে তুলেছে। দীর্ঘ সৈকতজুড়ে রয়েছে সোনালী বালু। স্বপ্নের মত পরিবেশ বলতে যা বোঝায় ইনানী তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রয়েছে অসংখ্য পাম গাছ এবং সৈকতের পাশ দিয়ে বহু পুরনো কোরাল বোল্ডার (পাথর)। ধরুন কোনো একটি বোল্ডারে একাকী কিছুক্ষণের জন্য বসেছেন, অমনি একটি প্রকাণ্ড ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল আপনার সামনে। ফিরে যাওয়ার সময় সেই ঢেউ বালুকাবেলায় রেখে গেল নানা রঙের বাহারী সব ঝিনুক। ঢেউ পাথরের খেলা ইনানীতে নিত্ত দিনের বিষয়। এখানকার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত যে কারোরই হৃদয় ভরিয়ে দেবে মুগ্ধতায়। এই সৈকত কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে বত্রিশ কি.মি. দূরে উখিয়ায় অবস্থিত।

কলাতলী বীচ :  সমুদ্রস্নানের প্রকৃত স্বাদ নিতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক কলাতলী সৈকত ভ্রমণ করে। সমুদ্রস্নানের পাশাপাশি স্কি-বোটে করে ভেসে বেড়ানোর ইচ্ছাটিও পূরণ করা যায় এখানে। সামুদ্রিক তাজা মাছের হরেক পদ পরখ করে দেখার শখ কিন্তু অনেকেরই থাকে। এখানে সেই শখ মিটবে আপনার। এই সৈকতে চাঁদের আলোয় হাঁটার চমৎকার পরিবেশ রয়েছে।

লাবনী বীচ :  কক্সবাজারের প্রাণকেন্দ্রে হওয়ায় লাবনী সৈকতের জনপ্রিয়তা অনেক উপরে। অনেকে কক্সবাজারের সবচেয়ে সুন্দর সৈকত বলেন এটিকে। থাকা-খাওয়া, যানবাহন থেকে শুরু করে প্রায় সবই এখানে হাতের কাছে পাবেন। অর্থাৎ যে কোনো মানের সার্বিক ব্যবস্থা এখানে রয়েছে। নিকটেই শত শত ছোট দোকান পাবেন। সেখানে ঝিনুকের তৈরি উপহার সামগ্রী ও অলংকার বিক্রি হয়। এ ছাড়াও পাওয়া যায় সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণ সহযোগী উপকরণ যেমন হাফ, থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, হ্যাট, ক্যাপ, ছাতা, চশমা ইত্যাদি। এই সৈকতে সার্ফিং ও মোটর সাইকেল চালানোর ব্যবস্থা রয়েছে।


রামু :
কক্সবাজারের নিকটতম উপজেলা রামু। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। নানা প্রতিবন্ধকতার পরও বৌদ্ধ ধর্ম চর্চার অন্যতম নিদর্শন হিসেবে রামু আজও টিকে রয়েছে। এখানে একাধিক মন্দিরে রয়েছে বুদ্ধের মূর্তি। মহামূল্যবান পাথর, ব্রোঞ্জ ও সোনার তৈরি মূর্তিও রয়েছে। ছয় ফুট উঁচু ভিত্তির উপর স্থাপিত রয়েছে গৌতম বুদ্ধের তেরো ফুট দীর্ঘ ব্রোঞ্জ মূর্তি। আপনি অবাক হবেন যখন জানতে পারবেন এটিই বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ব্রোঞ্জের বুদ্ধ মূর্তি। রাংকুট বনাশ্রমে সংরক্ষিত রয়েছে সম্রাট অশোকের সময়কার বুদ্ধ মূর্তি। উত্তর মিঠাছড়ির বন বিহারে সম্প্রতি নির্মাণ করা হয়েছে বুদ্ধের ১০০ ফুট দীর্ঘ শয়ন মূর্তি।

মহেশখালী দ্বীপ :  মনোরম দৃশ্যের এই দ্বীপ কক্সবাজার থেকে উত্তর-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের মাঝে অবস্থিত। মহেশখালীর পাহাড়ি সবুজ প্রকৃতি এক কথায় মন কেড়ে নেয়ার মত। চারিদিকের সৈকত ম্যানগ্রোভে আচ্ছাদিত। এখানে অনেক লবণের খামার রয়েছে। বিশেষ করে বৌদ্ধ মন্দির ও পাহাড়ের উপর আদীনাথ মন্দিরের জন্য মহেশখালী বিখ্যাত। কক্সবাজার থেকে মহেশখালী যাওয়ার একমত্র উপায় নৌকা। সময় লাগে এক ঘণ্টা। স্পীড বোটে গেলে অবশ্য সময় আরো কম লাগবে। তার আগে অবশ্য আপনাকে রিকশা নিয়ে ৬নং ঘাটে যেতে হবে, সেখান থেকে নৌকা বা স্পীড বোট মেলে।


এর নিকটেই রয়েছে সোনাদিয়া দ্বীপ। দ্বীপটি পাখির অভয়ারণ্য বলে পরিচিত। মহেশখালীতে ঘুরে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে রওনা দেয়া যেতে পারে সোনাদিয়া। মাছ ধরা প্রত্যক্ষ করা ও জেলে পল্লীর জীবনচিত্র সোনাদিয়ার প্রধান আকর্ষণ। সকালে রওনা হয়ে কক্সবাজার থেকে মহেশখালী হয়ে সোনাদিয়া ঘুরে এক দিনেই আবার কক্সবাজার ফিরে আসা সম্ভব।

যেভাবে যাবেন : রাজধানী থেকে বিভিন্নভাবে কক্সবাজার যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে প্রতিদিন বিমান চলাচল করে। ট্রেনে যাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক। সেক্ষেত্রে চট্টগ্রাম থেকে পুনরায় বাস ধরতে হবে। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ছেড়ে যায় বিকেল ৩ টায়, মহানগর প্রভাতি সকাল ৭.৪০ মিনিটে, মহানগর গোধূলী  বিকেল ৩.২০ মিনিটে, তুর্ণা এক্সপ্রেস রাত ১১.৩০ মিনিটে। এ ছাড়াও  রাজধানীর কলাবাগান, সায়দাবাদ, মহাখালী ও ফকিরাপুল থেকে সারাদিনই বাস সার্ভিস রয়েছে।

সৈকতে ঘুড়ি উড়ানোর আনন্দ

শ্যামলী, সোহাগ পরিবহণ, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, সৌদিয়া, গ্রীনলাইন এই রুটের অন্যতম বাস। শ্যামলী পরিবহণ-০২-৭৫৪০৯৯৩,০২৭৫৫০০৭১। সোহাগ পরিবহণ-০২-৯৩৪৪৪৭৭, ০১৭১১-৬১২৪৩৩। সৌদিয়া -০১৯১৯-৬৫৪৮৫৮, ০১৯১৯-৬৫৪৮৬১, গ্রীন লাইন-০২-৮৩৩১৩০২-৪।
থাকার জায়গা :  মোটেল উপবন-৩৪১-৬৪২৫৮, মোটেল প্রবাল-৩৪১-৬৩২১১, হোটেল লাবনী-৩৪১-৬৪৭০৩, হোটেল শৈবাল-৩৪১-৬৩২৭৪, কোরাল রীফ-৩৪১-৬৪৪৬৯।

টুর অপারেটর : কক্সবাজার ভ্রমণের জন্য টুর অপারেটর কোম্পানিগুলোর সারা বছরই অফার থাকে। ৬,৫০০ থেকে ৭,৫০০ টাকায় তাদের মাধ্যমে কক্সবাজার ঘুরে আসা সম্ভব। কেউ কেউ আবার প্যাকেজে সেন্টমার্টিনসহ কক্সবাজার ভ্রমণের অফার দিয়ে থাকে। তবে এখন সমুদ্রের উত্তাল মৌসুম, তাই সেন্টমার্টিনের সমস্ত অফার বন্ধ। যোগাযোগ করতে পারেন এদের সঙ্গে। সাউথ এশিয়ান টুরিজম, ফোন : ০১৭১৬-৪৬৬০৪৭, সাবরিনা ট্রাভেল এ্যান্ড টুরস্, ফোন :  ০১৭৭৪-৭৫৫১৩১, গ্রীন বাংলাদেশ টুরস, ফোন : ০২-৮৬৫২২৫৪, ০১৮১৯-৪৮০৫৪০, দ্য গাইড টুরস লিমিটেড, ফোন : ০২-৯৮৮৬৯৮৩, ০১৭১১-৬৯৬৩৩৭, ক্যাপ্টেইন হলিডেজ,  ফোন : ০১৯৭৭০৫৮৪৫২,     লেজার টুরস এ্যান্ড ট্রাভেলস লি. ফোন : ০২-৯৩৪৮৭০৬, ০১৭১২-১১১১১১।