এবার ইনিংস পরাজয়ের লজ্জা টাইগারদের

36
এমএনএ স্পোর্টস ডেস্ক : আগের টেস্টে ৩৩৩ রানের বড় ব্যবধানে পরজয়ের পর এবার ইনিংস পরাজয়ের লজ্জা পেতে হলো টাইগারদের।
প্রথম টেস্টে ব্লুমফন্টেইনে যে ইনিংস ব্যবধানে পরাজয় ঘটতেছে, তা মোস্তাফিজরা হয়তো বুঝে গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ইনিংস শেষেই। ফলো অনে পড়ার পরও লিটন দাস কোনো কোনো ব্যাটসম্যানের ডাবল সেঞ্চুরি এবং দলীয় ৬০০ রানের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন; কিন্তু বাস্তবতা যে তার চেয়ে অনেকদুর, সেটা বোধকরি তখনও বুঝতে পারেননি বাংলাদেশের এই ব্যাটসম্যান।
ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা ঠিকই। কিন্তু এতটা অনিশ্চয়তা তো কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। এ যেন সপ্তম আসমান জয় করে ফেলার অলিক কল্পনার মত। সেই অলিক কল্পনার ঘোর কাটিয়ে ওঠার আগেই দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ অলআউট ১৭২ রানে। প্রথম ইনিংসে অলআউট হয়েছিলো ১৪৭ রানে।
ব্লুমফন্টেইনে তাই টেস্টের তৃতীয় দিনের লাঞ্চের পরপরই ইনিংস এবং ২৫৪ রানের ব্যবধানে হারতে হলো বাংলাদেশকে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরাজয়। যে যুগে বাংলাদেশ লড়াই করারও স্বপ্ন দেখতে সাহস পেতো না, তখনও এত বড় ব্যবধানে হারেনি টাইগাররা। এখন যখন লড়াই নয়, জয়ের স্বপ্ন দেখার সাহস তৈরি হয়েছে, তখন পরাজয় মানতে হয় আগের চেয়েও বড় ব্যবধানে। স্বপ্নের ঘোরে থাকা লিটন কুমার দাস বোল্ড হয়েছিলেন ১৮ রানে। যদিও প্রথম ইনিংসে তিনি করেছিলেন সর্বোচ্চ ৭০ রান।
ঘরের মাঠে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার সাথে ১-১ এ টেস্ট সিরিজ ড্র করেছিল মুশফিকুর রহীম অ্যান্ড কোং। সেই সুখস্মৃতি নিয়েই দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিল বাংলাদেশ টেস্ট দল। তবে সুখস্মৃতি কোন কাজেই লাগল না। দু প্লেসিস বাহিনীর কাছে যে ইনিংস ব্যাবধানে হেরে ‘ধবল ধোলাই’ হতে হলো বাংলাদেশ দলকে!
প্রথম ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকা রানের পাহাড় গড়ার পরই বাংলাদেশের দুঃস্বপ্নের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বজ্ঞানহীন শটে প্রথম ইনিংস শেষেই ফলো অনে পড়া বাংলাদেশের হার অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়। তারপরও লড়াইয়ের আশায় ছিলেন বাংলাদেশের সমর্থকরা। ব্লুমফন্টেইন টেস্টে লড়াইয়ের ছিঁটেফোটাও উপহার দিতে পারেননি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। পচেফস্ট্রুমের মতো এখানেও অসহায় আত্মসমর্পণ করে টাইগাররা। আজ রবিবার টেস্টের তৃতীয় দিন বাংলাদেশকে ইনিংস ও ২৫৪ রানের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে দক্ষিণ আফ্রিকা।
পচেফস্ট্রুম টেস্টে ৩৩৩ রানের বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিল বাংলাদেশ। ব্লুমফন্টেইন টেস্টে অসহায় আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজে ০-২ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হয় মুশফিকের দল। দক্ষিণ আফ্রিকার একক আধিপত্যে পাঁচদিনের টেস্ট আড়াই দিনের একটু বেশি সময়েই শেষ হয়।
রানের হিসেবে টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার এটাই সবচেয়ে বড় জয়। এর আগে ২০০১ সালে কেপটাউন টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ইনিংস ও ২২৯ রানে জিতেছিল প্রোটিয়ারা।
ব্লুমফন্টেইন টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেটে ৫৭৩ রান তোলে ইনিংস ঘোষণা করে দক্ষিণ আফ্রিকা। জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৪৭ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। ৪২৬ রানের বড় ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বজ্ঞানহীন শটে ১৭২ রানেই গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে মাহমুদউল্লাহ সর্বোচ্চ ৪৩ রান করেন। এছাড়া ইমরুল ৩২, মুমিনুল ১১, মুশফিক ২৬ ও লিটন দাস করেন ১৮ রান। সৌম্য সরকার ৩, সাব্বির রহমান ৪ এবং তাইজুল আউট হন ২ রান করে।
প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট নেয়া ক্যাগিসো রাবাদা দ্বিতীয় ইনিংসেও নেন পাঁচটি উইকেট। এছাড়া আন্দিলে ফেলুকওয়াইয়ো তিনটি এবং ডোয়াইন অলিভিয়ে ও ওয়েন পারনেল নেন একটি করে উইকেট।
শুরুর বিপর্যয় কাটিয়ে একটা সময় ৪ উইকেট হারিয়ে ১৩৫ রান করে ফেলেছিল বাংলাদেশ। এরপর ভয়াবহ ব্যাটিং ধস সঙ্গী হয় টাইগারদের। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের তোপের মুখে পড়ে ৩৭ রানে শেষ ৬ উইকেট হারিয়ে লজ্জাজনক হার নিয়ে মাঠ ছাড়ে টাইগাররা। এরমধ্যে মোস্তাফিজ (৭) ও শুভাশিষ রায় (১২) শেষ উইকেট জুটিতে ১৬ রান তোলেন।
আজ রবিবার টেস্টের তৃতীয় দিন বিনা উইকেটে ৭ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। দিনের শুরুতেই দলীয় ১৩ রানের মাথায় ক্যাগিসো রাবাদার বলে দ্বিতীয় স্লিপে ফাফ ডু প্লেসিসের দুর্দান্ত ক্যাচের শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন।
সৌম্যর বিদায়ের পর ক্রিজে আসেন মুমিনুল। তবে তিনিও সুবিধা করতে পারেননি। রাবাদার করা নবম ওভারের পঞ্চম বলে ডিপ স্কয়ার লেগে কেশব মহারাজের হাতে ক্যাচ দিয়ে সৌম্যকে অনুসরণ করেন মুমিনুল। তার বিদায়ের পর ইমরুলের সঙ্গে ক্রিজে যোগ দেন মুশফিক।
শুরুতেই দুই উইকেট হারানোর পর দারুণ খেলছিলেন ইমরুল-মুশফিক। তবে বেশিদূর এগোতে পারেনি এই জুটি। ডোয়াইন অলিভিয়ের করা ১৬তম ওভারে লেগ সাইডের বাইরের বলে অহেতুক শট খেলতে গিয়ে উইকেটের পেছনে কুইন্টন ডি কককে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন ইমরুল। ইমরুলের বিদায়ের পর ক্রিজে মুশফিকের সঙ্গী হন মাহমুদউল্লাহ।
এই দুজন দারুণই খেলছিলেন। তবে মুশফিক নিজের ভুলেই উইকেট ‘উপহার’ দিয়ে ফিরে গেলে ফের চাপের মুখে পড়ে যায় বাংলাদেশ। পারনেলের করা ২৪তম ওভারের চতুর্থ বল প্যাড দিয়ে ডিফেন্ড করতে চেয়েছিলেন মুশফিক। বল লাইন মিস করে বেরিয়ে যাবে বলেই ভেবেছিলেন তিনি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড়ররা জোরালো আবেদন করলে তাতে সাড়া দিতে দেরি করেননি আম্পায়ার। রিভিউ নিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি মুশফিকের।
মুশফিকের বিদায়ের পর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মাহমুদউল্লাহ ও লিটন। তবে বোকামির খেসারত দিয়ে লিটন ফিরে গেলে সেই প্রতিরোধ ভেঙে যায়। দলীয় ১৩৬ রানের মাথায় আন্দিলে ফেলুকওয়াইয়োর করা ৩৩তম ওভারে পঞ্চম বল ছেড়ে দিতে গিয়ে বোল্ড হন লিটন। রাবাদার করা পরের ওভারের শেষ বলে ‘গালি’ অঞ্চলে ডিন এলগারের দুর্দান্ত ক্যাচের শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন মাহমুদউল্লাহ।
ক্রিজে নামতে না নামতেই যেন সাজঘরে ফেরার তাড়া পেয়ে বসে সাব্বিরকে। ফেলুকওয়াইয়োর করা ৩৭তম ওভারের শেষ বলে দ্বিতীয় স্লিপে ডু প্লেসিসকে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন সাব্বির। এরপর বাংলাদেশ শিবিরে হানা দেন রাবাদা। তার করা ৩৮তম ওভারের দ্বিতীয় বলে তাইজুল ইসলামের স্টাম্প ছত্রখান হয়ে যায়।
এক ওভার পর আক্রমণে এসে ফের বাংলাদেশ শিবিরে হানা দেন রাবাদা। তার করা ৪০তম ওভারের দ্বিতীয় বলে রুবেল বোল্ড হয়ে ফিরে গেলে ইনিংস পরাজয় থেকে এক উইকেট দূরে অবস্থান করে বাংলাদেশ। এক উইকেট হাতে নিয়ে পানি পানের বিরতিতে যায় সফরকারীরা। বিরতির পর মোস্তাফিজ বোল্ড হয়ে গেলে ইনিংস পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে টাইগাররা।
এর আগে চার-চারটি সেঞ্চুরির সুবাদে বড় সংগ্রহ গড়ে ইনিংস ঘোষণা করে দক্ষিণ আফ্রিকা। আমলা ১৩২ রান করে আউট হন। ডু প্লেসিস ১৩৫ রানে অপরাজিত থাকেন। তার সঙ্গী কুইন্টন ডি কক করেন ২৮ রান। মার্করাম ১৪৩ এবং এলগার ১১৩ রান করে আউট হয়েছেন।
বাংলাদেশের হয়ে শুভাশিষ রায় সর্বোচ্চ তিনটি উইকেট নেন; তিনি ১১৮ রান খরচ করেন। রুবেল হোসেন ১১৩ রানের বিনিময়ে নেন একটি উইকেট। মোস্তাফিজুর রহমান ১১৩ এবং তাইজুল ইসলাম ১৪৫ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকেন প্রথম টেস্টে ৩৩৩ রানের বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ একাদশ : ইমরুল কায়েস, সৌম্য সরকার, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম (অধিনায়ক), সাব্বির রহমান, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, লিটন দাস (উইকেটরক্ষক), তাইজুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, রুবেল হোসেন ও শুভাশিস রায়।
দক্ষিণ আফ্রিকা একাদশ : ডিন এলগার, এইডেন মার্করাম, টেম্বা বাভুমা, হাশিম আমলা, ফাফ ডু প্লেসিস (অধিনায়ক), কুইন্টন ডি কক (উইকেটরক্ষক), অ্যান্ডিলে ফেলুকওয়ায়ো, কেশব মহারাজ, কাগিসো রাবাদা, ওয়েইন পারনেল ও ডোয়াইন অলিভিয়ে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর :
দক্ষিণ আফ্রিকা ১ম ইনিংস : ৫৭৩/৪ ডি.
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস : ১৪৭
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস : ১৭২ (ইমরুল ৩২, সৌম্য ৩, মুমিনুল ১১, মুশফিক ২৬, মাহমুদউল্লাহ ৪৩, লিটন ১৮, সাব্বির ৪, তাইজুল ২, রুবেল ৭, শুভাশিস ১২, মুস্তাফিজ ৭; রাবাদা ৫/৩০, অলিভিয়ের ১/৩৯, মহারাজ ০/৩০, পার্নেল ১/৩১, ফেলুকওয়ায়ো ৩/৩৬)
ফল : দক্ষিণ আফ্রিকা ইনিংস ও ৫৪ রানে জয়ী
সিরিজ : দক্ষিণ আফ্রিকা ২-০ ব্যবধানে জয়ী
ম্যান অব দ্য ম্যাচ : কাগিসো রাবাদা
ম্যান অব দ্য সিরিজ : ডিন এলগার