কেমন আছেন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহতরা?

33

এমএনএ রিপোর্ট : দেখতে দেখতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ঘটনার ১৩ বছর অতিবাহিত হলো। ভয়াবহ রক্তাত্ত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় বেচে যাওয়া মুষগুলো কেমন আছেন? সে সবের আলোকে তৈরি করা এ বিশেষষ প্রতিবেদন।

সেদিন গ্রেনেড হামলায় আহত, রক্তাক্ত হই আমি। আমাকে মৃত মনে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ফেলে রাখা হয়েছিল। পরে জ্ঞান ফিরে পাবার পর দেখতে পাই আমি মর্গে অন্য লাশের পাশে। এরপরই ধীরে ধীরে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠি। কিন্তু শরীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা পিছু ছাড়েনি আমার। চিকিৎসকরা বলেছেন, যতদিন জীবিত আছি ততদিন এই যন্ত্রণা আমাকে পোহাতে হবে। এখন মনে হয় সেদিন মরে যাওয়াই ভালো ছিল’, কথাগুলো বলছিলেন রত্না আক্তার রুবী। প্রায় ৫০টি স্পিন্টার এখনও শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন ৩৮ বছর বয়সী এই নারী।

স্বামী সবুজ হাওলাদার ও এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে থাকেন মিরপুরে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় মারাত্মক আহত হয়েছিলেন তিনি। ঘটনার কয়েক মাস পরেই তার শরীরের ডান দিকের অকেজো কিডনি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ফেলে দিতে হয়েছে। এ ছাড়া চর্মরোগ, পা ফুলে যাওয়াসহ নানা অসুখে ভুগছেন তিনি। অুসস্থতার প্রয়োজনে প্রতি মাসে ইনজেকশান এন্টিবায়োটিক বাবদ খরচ করতে হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। ঘটনার পর আর্থিক সাহায্য যা পেয়েছিলেন তা চিকিৎসাতেই ব্যয় হয়েছে। স্বামীর ব্যবসায়ের আয়ে সংসার চলে রুবির। বর্তমানে চরম দুঃসহ দিন পার করছেন রুবি।

শুধু রুবিই নয় এমন শত শত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী স্প্রিন্টারের আমৃত্যু যন্ত্রণা শরীরে বয়ে চলেছেন দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।

পুরান ঢাকার মাজেদ সরদার রোডে বাস করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেত্রী রাশেদা আক্তার রুমা। শরীরে ক্যান্সার বয়ে বেড়াচ্ছেন। ২১ আগস্ট শেখ হাসিনা যে ট্রাকে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন সেই ট্রাকের পেছনে ছিলেন তিনি। রুমা জানান, এখনও তার শরীরে প্রায় দুই হাজার স্পিন্টার রয়েছে। গ্রেনেডের আঘাতে ১৮টি দাঁত পড়ে যায় তার। ডান পা পচতে পচতে হাড়ে লেগেছে। এখন পচতে শুরু করেছে বাম পা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া অর্থসহ স্বামীর অর্থে চিকিৎসা চালাচ্ছেন তিনি।

রুমা বলেন, ক্যান্সারে পা পচে যাচ্ছে, শরীরের তীব্র জ্বালায় বাঁচতে পারছি না। গ্রেনেড হামলার ঘটনায় জড়িতদের এখনও বিচারকার্য শেষ হয়নি। জানোয়ারদের চূড়ান্ত বিচার দেখে যেতে পারলে মরেও শান্তি পেতাম।

বর্বরোচিত সে গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এস এম কামাল হোসেন এখনও ১০ থেকে ১২টি স্প্রিন্টার শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন। সেদিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতি মনে হলে এখনও আঁতকে ওঠেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে আলাপকালে এস এম কামাল হোসেন বলেন, বাঙালি জাতির ইতিহাসে যে কয়টি কালো দিন রয়েছে, তার মধ্যে ২১ আগস্ট অন্যতম একটি দিন। সেদিন আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই এ হামলা চালানো হয়।

যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল হাওয়া ভবনে বসে। এজন্যই বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে এ বিচার নিয়ে শুধু জজমিয়ার নাটকই তৈরি করেনি, বরং বিচারকে ভিন্ন খাতে নেয়ার জন্য তৎতকালীন সিআইডির অফিসারদের প্রমোশনের প্রলোভন দেখিয়ে সব আলামত নষ্ট করা হয়। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরে আবারও এ বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আমরা জেনেছি বিচার প্রক্রিয়া একেবারেই শেষ পর্যায়ে। যে কোনো সময় রায় হবে বলেও আমরা আশাবাদী।

লিটন মোল্লা (৪৩) আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছিলেন তিনি। এখনও শরীরের নানা জায়গায় ক্ষত ও স্পিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন। শ্রবণ শক্তিও প্রায় নেই বললেই চলে। অসুস্থতার কারণে অকর্মণ্য হয়ে পড়েছেন তিনি। পরিবার ও স্বজনদের সহায়তায় এবং প্রানমন্ত্রীর দেয়া আর্থিক সহযোগিতায় কোনমতে সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন তিনি। আবার এই টাকার বেশির ভাগ চলে যাচ্ছে চিকিৎসা খরচে।

হতাশ কণ্ঠে লিটন মোল্লা বলেন, আর পারছি না। দিনরাত শরীরিক যন্ত্রণা অসুস্থতা, অন্যদিকে আর্থিক অনটন। এভাবে বেঁচে থাকা যায়? তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার আবেদন, যারা ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহতদের মধ্য যারা কর্মক্ষমতা হাড়িয়েছেন তাদের জন্য যেন স্থায়ী ভাবে কিছু করা হয়। আর এখন একটাই চাওয়া বিচার যেন দ্রুত শেষ করা হয়।

প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সে সময়ের বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনা। অস্থায়ী ট্র্যাকমঞ্চে বক্তব্য শেষ করার সাথে সাথেই শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে একের পর এক গ্রেনেড ছোড়া হয়।

উপর্যুপরি ১৩টি গ্রেনেডের বিস্ফোরণে মুহূর্তেই সমাবেশস্থল পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। এই হামলায় আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতাকর্মী নিহত হন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শত শত নেতাকর্মী আহত হন। সে সময় মঞ্চ থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে দলীয় সভাপতিকে জীবিত উদ্ধার করে তৎকালীন বাসভবন তৎকালীন বাসভবন সুধা সদনে নিয়ে যেতে পারলেও মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি। গ্রেনেডের বিস্ফোরণের বিকট শব্দে শেখ হাসিনার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।