কোরবানির গুরুত্ব, ফজিলত ও আমল

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : কোরবানি’ ইসলামের ধর্মীয় পরিভাষাগুলোর মধ্যে একটি প্রসিদ্ধতম পরিভাষা। কোরবানি শব্দটি বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত একটি বিদেশি শব্দ। শব্দটি আরবি ও ফারসি উভয় ভাষা থেকেই আসতে পারে। আরবিতে কোরবানি শব্দের অর্থ নৈকট্য আর ফারসিতে শব্দটি ত্যাগ অর্থে ব্যবহার হয়। ইসলামের ধর্মীয় পরিভাষায় কোরবানি বলতে ‘মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় নির্দিষ্ট শ্রেণির পশুগুলোর মধ্য থেকে কোনো পশুকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে (জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদের সালাত আদায়ের পর থেকে ১৩ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত) আল্লাহর নামে জবাই করাকে বোঝায়। বস্তুত আল্লাহর রাস্তায় বান্দার কোরবানি বা ত্যাগই তাকে মহান আল্লাহর সর্বাধিক নৈকট্য এনে দেয়, তাই কোরবানিকে এই নামকরণ করা হয়েছে।

বছর ঘুরে আসে ঈদ, আসে ঈদুল আজহা। মুসলিম সমাজে ধর্মীয় উৎসবগুলোর অন্যতম হলো ঈদুল আজহা। প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ এ উৎসব পালিত হয়। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে গোটা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান আনন্দঘন পরিবেশে ঈদুল আজহা উদযাপন করে। এদিন মুসলমানরা আনন্দ ও খুশির এক মোহনায় এসে মিলিত হয়। তারা আল্লাহর আদেশ পালনের মাধ্যমে আনন্দ ও পরিতৃপ্তি লাভ করে। ঈদুল আজহার দিন মুসলমানরা একসঙ্গে ওয়াজিব নামাজ আদায় করে এবং নামাজ শেষে পশু কোরবানি করে। এভাবে ঈদের নামাজ আদায় ও কোরবানির মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুটি লাভের প্রয়াস পায়। ঈদুল ফিতরের আমেজ কাটতে না কাটতেই আমাদের দরজায় এসে কড়া নাড়ে ঈদুল আজহার সওগাত। এই ঈদের বড় কাজ হলো কোরবানি করা। কোরবানির ফজিলত : নেক আমলগুলোর মধ্যে কোরবানি একটি বিশেষ আমল। এর সঙ্গে জড়িত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অনুভূতি। আল্লাহর ভয়ে এবং ভালোবাসা অর্জনে মুসলমানরা তাঁর এই আদেশ পালন করে।

কোরবানির গুরুত্ব

মুমিন বান্দার জীবনে কোরবানির গুরুত্ব সীমাহীন। কারণ মুমিনের জীবনের একমাত্র আরাধনা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। আর কোরবানি তাকে অত্যন্ত দ্রুত স্থানে পৌঁছে দেয়। খলিলুল্লাহ হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) আত্মত্যাগের বলিষ্ঠ পরাকাষ্ঠা স্থপন করেই মহান মাওলার নৈকট্যের সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন নিঃসন্তান। খোদাদ্রোহী শক্তির বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামরত, জীবন সায়াহ্নে উপনীত। বয়সের আশি পেরিয়ে যাওয়া হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনের পতাকাবাহী একজন উত্তরসূরি রেখে যাওয়ার আকুতি জানিয়ে মহান রবের দরবারে দীর্ঘদিনের কাকুতি-মিনতির পরে লাভ করেছিলেন একটি পুত্রসন্তান। জীবনের পড়ন্ত বিকেলে জাগতিক নির্ভরতার একমাত্র সম্বল পুত্র ইসমাইলকে আল্লাহর নামে কোরবানি করেন হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং মহিমাময় আল্লাহর মহান ইচ্ছা পূরণে নিজেকে তীক্ষ্ণ খঞ্জরের নিচে সঁপে দিয়ে হজরত ইসমাইল (আ.) আত্মত্যাগের যে মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, সেই মহান স্মৃতির পুনরাবৃত্তিতেই ইসলামের কোরবানির বিধানকে সীমাহীন গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। যার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ‘ভোগে নয়, ত্যাগেই আত্মার পরিপূর্ণতা। পবিত্র কোরআনের বর্ণনায় ইব্রাহিম (আ.)-এর স্মৃতিকথা বিবৃত হয়েছে এভাবে- অতঃপর সে (ইসমাইল) যখন পিতার সাথে চলাফেরার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইব্রাহিম তাকে বলল : বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি তোমাকে জবাই করছি; এখন তোমার অভিমত কী সেটা ভেবে বল। সে বলল, পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারী হিসেবে পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহিম তাকে জবাই করার জন্য শায়িত করলেন। তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। (সুরা আস-সাফফাত : ১০২-১০৫)

কোরবানির ফজিলত

আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা আল্লাহর নামে কোরবানি করে তাদের জন্য সীমাহীন সওয়াবের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোরবানির দিনে কোরবানি করাই সবচেয়ে বড় ইবাদত। কোরবানির জন্তুর শরীরের প্রতিটি পশমের বিনিময়ে কোরবানিদাতাকে একটি করে সওয়াব দান করা হবে। কোরবানির পশুর রক্ত জবাই করার সময় মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহ দরবারে কবুল হয়ে যায়। (মেশকাত) কোরবানির বিনিময়ে সওয়াব পেতে হলে অবশ্যই কোরবানিটা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশে। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন, কোরবানির জন্তুর রক্ত-মাংস কোনো কিছুই আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না। তাঁর কাছে পৌঁছায় শুধু তোমাদের অন্তরের তাকওয়া। (সুরা আল-হাজ : ৩৭)

কোরবানির দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল :

ইসলামী আদব-কায়দা মেনে চলা এবং হাদিসে বর্ণিত সুন্নতের অনুসরণ করা যেমন-

এক.
গোসল করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, সর্বোত্তম কাপড় পরা- এগুলো সুন্নত।

দুই.
ক. ঈদের সালাত ওয়াজিব। তাই ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করবে।
খ. মসজিদের বাইরে উন্মুক্ত ময়দানে ঈদের জামাত করা সুন্নত। তাই বিভিন্ন মসজিদের পরিচালক মিলিত হয়ে ঈদগাহ বা খোলা ময়দানে ঈদের জামাতের ব্যবস্থা করে একটি সুন্নতের ওপর আমল করার পরিবেশ তৈরি করবেন।
গ. ঈদগাহে এক পথে যাওয়া অন্য পথে ফিরে আসা সুন্নত।
ঘ. যাওয়া ও আসার পথে তাকবির বলা সুন্নত।
ঙ. ঈদের জামাত শেষে খুতবা শোনা ওয়াজিব।

তিন.
ভালো আমলের প্রতি আগ্রহী হওয়া, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে তাদের খোঁজখবর নেয়া ও কুশল বিনিময় করা।

চার.
কোরবানিকৃত পশুর গোশত দিয়ে ইফতার করা। তাই ঈদের সালাত আদায় শেষে তার জন্য অপেক্ষা করা। অবশ্য এটা কেউ এককভাবে কোরবানি করলে তার জন্য সহজ। অংশীদারিত্বে দিলেও এটা অসম্ভব নয়। প্রথমেই কিছু গোশত অংশীদারেরা ভাগ করে নিলে এ আমল করা অসম্ভব নয়।

পাঁচ.
এ দিনের সবচেয়ে বড় আমল হলো কোরবানির পশু জবাই করা। এ জন্য রয়েছে কয়েকটি বিধান কোরবানি হবে ঈদের জামাত শেষে। এর আগে কোরবানির পশু জবাই করলে তা কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে না। কেননা হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, ‘এ দিনের সর্বপ্রথম যে কাজটি আমরা করব তা হলো আমরা (ঈদের) সালাত আদায় করব; এরপর আমরা ফিরে এসে পশু জবাই করব। যে এভাবে করবে সে আমাদের সুন্নতপ্রাপ্ত হলো। আর যে সালাত আদায়ের আগেই জবাই করল তাহলে তা জবাইকৃত প্রাণীর গোশতে পরিণত হলো, যা সে তার পরিবারের সদস্যদের জন্য ব্যবস্থা করল’ (বুখারি : সহি)।

ছয়.
পরস্পরে দেখা হলে এ বলে মুবারকবাদ দেয়া ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না- ওয়া মিনকা’ (আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের (আমল) কবুল করুন)। রাশিদ ইবন সা’দ বর্ণনা করেন যে, একবার এক ঈদের দিন ওয়াছিলা ইবন আসকা এবং আবু উমামা বাহিলী রা: তার সাথে দেখা করেন এবং বলেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না-ওয়া মিনকা’ (আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের (আমল) কবুল করুন) (তাবরানি : আদ দু’আ)। অন্য এক বর্ণনায় খালিদ ইবন মা’দান বর্ণনা করেন যে, একবার এক ঈদের দিন আমি ওয়াছিলা ইবন আসকার সাথে দেখা করি এবং বলি ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না-ওয়া মিনকা’ (আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের আমল কবুল করুন)। তখন তিনি বলেন, হ্যাঁ, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না-ওয়া মিনকা’ (আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের আমল কবুল করুন) (বায়হাকি : আস সুনানুল কুবরা)। অন্য এক বর্ণনায় উমার ইবন আবদুল আজিজের মাওলা আদহাম বর্ণনা করেন যে, ঈদের দিন আমরা উমার ইবন আবদুল ‘আজিজকে এ বলে মুবারকবাদ দিতাম ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না-ওয়া মিনকা ইয়া আমিরাল মুমিনিন’ ( হে আমিরুল মুমিনিন! আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের (আমল) কবুল করুন)। তখন তিনিও আমাদের উত্তর দিতেন এবং এ ব্যাপারে আমাদের নিষেধ করতেন। (বায়হাকি : শু’আবুল ঈমান)।

কোরবানির মাংস বণ্টন

কোরবানির মাংস তিন ভাগে বণ্টন করা মুসতাহাব। এক ভাগ কোরবানিদাতার নিজের ও পরিবারের জন্য, একভাগ তার আত্মীয়স্বজনদের জন্য আর একভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য। অনেকে মিসকিনদের এক টুকরো করে দিয়ে সব মাংস ফ্রিজে ভরে রেখে দেন। আবার অনেকে ফকির সেজে মাংস জমা করে বিক্রি করেন। কোনোটাই উচিত নয়। যদি কারো পরিবারের সদস্যসংখ্যা এত বেশি হয় যে, কোরবানির মাংস সবটুকু তাদের ঈদের দিনের খাবারের জন্য প্রয়োজন, তাহলে তার জন্য সম্পূর্ণ মাংস নিজের পরিবার নিয়ে খাওয়া জায়েজ এবং উত্তম। আমাদের সবার কোরবানি আত্মত্যাগের মহান প্রেরণায় মহান আল্লাহর উদ্দেশে নিবেদিত হোক!

x

Check Also

তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ৬৬ যুদ্ধবিমান বিক্রি

এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : চীনের সঙ্গে চলমান ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’সহ বিভিন্ন সংকটের মধ্যেই তাইওয়ানের কাছে ৬৬টি ...

Scroll Up