খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ শাস্তি ন্যায়বিচারের স্বার্থে

এমএনএ রিপোর্ট : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট্র দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে দশ বছর কারাদণ্ড দেওয়া-সংক্রান্ত আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, এ মামলার মূল অপরাধী খালেদা জিয়া। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী। ন্যায় বিচারের স্বার্থে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যুক্তিযুক্ত। এ ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

১৭৭ পৃষ্ঠার রায়ের অনুলিপিতে হাইকোর্ট বিভাগের দুই বিচারপতির স্বাক্ষরের পর গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে তা প্রকাশ করা হয়।

হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তফিজুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত ৩০ অক্টোবর এ মামলার সংক্ষিপ্ত এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার তিন মাস পর গতকাল পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হলো। পরে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, রায়ের কপি পেলে তা পর্যালোচনা করে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এ মামলায় খালেদা জিয়া মূল অপরাধী। ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যুক্তিযুক্ত। কারণ, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষমতা অপব্যবহারের ক্ষেত্রে যেন দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়। রায়ে বলা হয়েছে, নিম্ন আদালত খালেদা জিয়াকে সাজা কম দেওয়ার ক্ষেত্রে বয়স, শারীরিক অসুস্থতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করার যুক্তি দেখিয়েছে। মূল আসামিকে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের এই যুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, অর্থনৈতিক অপরাধসহ দুর্নীতি আমাদের দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ধারণার ক্ষেত্রে শুধু বিপদজনক অবস্থায়ই পৌছায়নি, বরং গণতন্ত্রের ভিত, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ। কোথাও দুর্নীতি শুরু হলে সেখানে মানুষের অধিকার খর্ব হয়ে যায়, দুর্নীতি মানবাধিকারকে অবমূল্যায়ন করে।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার দায়িত্ব ছিল এতিমদের জন্য গঠিত তহবিল যথাযথভাবে ব্যবহার ও সংরক্ষণ করা। তবে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ভুয়া ফান্ড খুলে প্রতারণার উদ্দেশ্যে আসামির ছেলে, আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় ব্যক্তিদের আর্থিক সুবিধা নিতে এতিমদের জন্য তহবিল পরিচালনা করা হয়েছে।

এতিমদের জন্য তহবিল ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে তা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাই এ মামলায় খালেদা জিয়া যেহেতু প্রধান আসামি, তার সাজা কমানোর কোনো যৌক্তিকতা আমরা পাইনি। রাজনৈতিক কারণে এ শাস্তি দেওয়া হয়নি। শাস্তিযোগ্য অপরাধ প্রমাণের জন্যই তার সাজা বাড়িয়ে দশ বছর করা হলো।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, সংবিধানের মূল চেতনা হচ্ছে ন্যায় বিচার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তবে কিছু দুর্নীতি দেশের গণতন্ত্রকে ক্ষতি করে এবং মানবাধিকারকে খর্ব করে। এ কারণে মূল অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় সাহায্যকারী আসামিদের চেয়ে মূল আসামিকে কম সাজা দেওয়ার আইনগত কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

রায়ের কপি প্রকাশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, সাজা কমাতে বিচারিক আদালতের ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে হাইকোর্ট বলেছেন, এখানে পদ বড় নয়, এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জড়িত। ভবিষ্যতে সবাইকে আরও সতর্ক হতে হবে।

এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলের সদস্য সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন সমকালকে বলেন, হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পেলে তা পর্যালোচনা করে আপিল করা হবে। আপিলে খালেদা জিয়া সর্বোচ্চ আদালতে খালাস পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

গত ৩০ অক্টোবর ঘোষিত রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে বিচারিক আদালতের দেওয়া পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বাড়িয়ে ১০ বছর করেন হাইকোর্ট। এছাড়া ৫ বছরের দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে খালেদা জিয়া এবং ১০ বছরের দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে মাগুরার সাবেক এমপি বিএনপি নেতা কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে কাজী কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের আপিল খারিজ করেন আদালত।

২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুদকের করা মামলায় গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট্র দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর সাজা দেন। শারীরিক অসুস্থতা, বয়স ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে মামলার প্রধান আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ওই রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে আপিল করা হলে তাকে চার মাসের জামিন দেন হাইকোর্ট। এর বিরুদ্ধে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের পর একই বছরের ১৬ মে জামিন বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

এ মামলায় ছয় আসামির মধ্যে খালেদা জিয়াসহ তিনজন কারাবন্দি। বাকি তিন আসামি পলাতক। খালেদা জিয়া ছাড়া কারাবন্দি অন্য দু’জন হলেন- মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ।

পলাতক তিনজন হলেন- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান। দুর্নীতির দুই মামলায় ১৭ বছরের সাজাপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বর্তমানে কারাগারে আছেন।

x

Check Also

আবারও আটকে গেল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম

এমএনএ রিপোর্ট : বাংলাদেশের পক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পরও রোহিঙ্গারা যেতে রাজি ...

Scroll Up