গভীর সমুদ্রবন্দরের স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে মাতারবাড়ীতে

মোঃ নূরননবী সরকার তুষার : ১৮ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ হতে যাচ্ছে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের উন্নয়ন অগ্রগতি প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে পাশের অপেক্ষায়।

গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য বড় দুটি জেটি নির্মাণকাজ শুরুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দরের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এ বন্দর চালু হবে বলে আশা করছে সরকার।

আগামীকাল ২ সেপ্টেম্বর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠকে ডিপিপির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি) এর আওতায় মহেশখালীর মাতারবাড়ী এলাকায় গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণের চূড়ান্ত স্থান নির্ধারিত হয়েছে।

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার ধলঘাট এলাকায় মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়নে ১৩ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা ঋণ দেবে জাপানভিত্তিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা। যার মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) খরচ করবে ৯ হাজার ৬১৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং সড়ক বিভাগ খরচ করবে ৮ হাজার ৯৬১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।  বন্দর কর্তৃপক্ষের খরচের অংশের মধ্যে নিজস্ব তহবিল থেকে দেয়া হবে ২ হাজার ৫৮৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জাইকা) দেবে ৭ হাজার ৩১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এছাড়া সড়ক বিভাগের ব্যয়ের বড় অংশও জাইকা দেবে। বাকি ২ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ও ২ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা অন্যান্য সংস্থা থেকে সংস্থান করা হচ্ছে।

২০১৫ সাল থেকে জাইকা মাতারবাড়ী কয়লা-বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ করতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সম্ভাবনাটি উদ্ঘাটন করে। সে থেকে উক্ত স্থানে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের দ্বার উন্মোচিত হয় বলে জানা যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরের অতিক্রান্ত সক্ষমতা, বড় আকারের জাহাজের প্রবেশের সীমাবদ্ধতা, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যকে সামনে রেখে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। প্রস্তাবিত এ গভীর সমুদ্রবন্দরে ১৬ মিটার গভীরতার এবং ৮ হাজার কনটেইনারবাহী জাহাজ সহজে যাতায়াত করতে পারবে।

ডিপিপি অনুসারে, প্রকল্পের আওতায় মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরে ৩০০ ও ৪৬০ মিটার দৈর্ঘ্যরে দুটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এতে ১৬ মিটার গভীরতার ৮ হাজার টিইইউ কন্টেইনারবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারবে। চট্টগ্রাম বন্দরে ৯ দশমিক ৫ মিটারের বেশি গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারে না। এর ফলে মাদার ভেসেলগুলো বন্দরের জেটিতে আসতে পারে না। ফিডার জাহাজে করে কন্টেইনার আনা-নেওয়া করা হয়।

সরকারের রূপকল্প ২০৪১ সালে দেশে বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৪ মিলিয়ন এবং জাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে ৮ হাজার ২০০টি। এ বিপুল সংখ্যক কনটেইনার ও জাহাজ হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দেশের বর্তমান বন্দরগুলো দিয়ে সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুসারে, প্রতিদিন ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টিইইউ আমদানি পণ্য কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে। চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজ সর্বোচ্চ ২০০০ টিইইউ কন্টেইনার নিয়ে ভিড়তে পারে। অথচ পার্শ্ববর্তী কলম্বো, ভারত, চেন্নাই, করাচির বন্দরে এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ ভিড়তে পারে। এ বিবেচনায় মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর অধিকহারে ড্রাফটের জাহাজের সমুদ্রবন্দর কন্টেইনার পরিবহনে বাংলাদেশের জন্য উত্তম বিকল্প হবে।

প্রকল্প সূত্র জানায়, প্রাথমিক পর্যায়ে মাতারবাড়ীতে নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জাহাজ ভেড়ানোর কাজে বন্দর চ্যানেল ও টার্মিনাল ব্যবহার করা হবে। এ লক্ষ্যে প্রথম পর্যায়ে দুটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। সেখানে ৩২০ থেকে ৩৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৬ মিটার ড্রাফটের (জাহাজের গভীরতা) আট হাজার টিইইউএস কনটেইনারবাহী বড় জাহাজ ভিড়তে পারবে।

প্রথম পর্যায়ে ৪৬০ ফুট দৈর্ঘ্যরে কনটেইনার জেটি এবং ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্যরে মাল্টিপারপাস জেটি নির্মাণ করা হবে। ওই জেটিতে বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) ভেড়ার সুযোগ থাকাবে। এ ধরনের একটি জাহাজে একসঙ্গে আট হাজার কনটেইনার রাখা সম্ভব। এ ধরনের একটি জাহাজ থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি কনটেইনার হ্যান্ডেলিং সম্ভব হবে। ফলে এখান থেকে ছোট জাহাজে (ফিডার ভেসেল) করে দেশের অন্যান্য বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর মাতারবাড়ী বন্দরে আরও একাধিক জেটি নির্মাণের পর্যাপ্ত জায়গা থাকছে। ফলে কনটেইনারসহ অন্যান্য কার্গোর পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে বন্দরের আয়তন বাড়ানোও সম্ভব হবে।

ডিপিপি অনুসারে, প্রকল্পের আওতায় দুটি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন, একটি মাল্টি গ্যান্ট্রি ক্রেন, ছয়টি আরটিজি, দুটি রিচ স্ট্যাকার ও ১২টি ইয়ার্ড চেসিস ট্রাক্টর কেনা হবে। একই সঙ্গে প্রাসঙ্গিক সুবিধার জন্য তিনটি টাগবোট, একটি পাইলট বোট, একটি সার্ভে বোট কেনা হবে। এছাড়া ২৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার চার লেন সড়কও নির্মাণ করা হবে।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে জাপানের একটি সংস্থার জরিপে বলা হয়েছে, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। এমনকি চট্টগ্রাম বন্দর সক্ষমতার বাইরে গিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম করছে। ব্যাপকসংখ্যক জাহাজ ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য আরও একটি সমুদ্র বন্দরের বিকল্প নেই। এ বন্দর চালু হলে একদিকে দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানির হ্যান্ডেলিং বাড়বে, অন্যদিকে চাপ কমবে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর। এ ধরনের একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধা পেলে অবশ্যই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সহায়ক হবে।

তা ছাড়া, দেশে বর্তমানে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় ডিপ ড্রাফটের জাহাজ এ সকল বন্দরে ভিড়তে পারে না। ফলে মাদার ভেসেল থেকে গভীর সমুদ্রে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে বন্দরে নিয়ে আসা হয়।

মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দরের উন্নয়নের পাশাপাশি আধুনিক কনটেইনারবাহী জাহাজ, খোলা পণ্যবাহী জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারকে জেটিতে ভেড়ার উপযোগী করে তোলা হবে। দেশের ও আঞ্চলিক দেশসমূহের চাহিদার সাথে সঙ্গে মহেষখালী ও মাদারবাড়ী এলাকায় গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলের পণ্য পরিবহনে সহযোগিতা করাই এ বন্দরের মূল উদ্দেশ্য।

এক হাজার ২২৫ একর জমির ওপর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হবে। মাতারবাড়ী ও ধলঘাট মৌজার উক্ত জমির মধ্যে ২৯৪ একর জমি জাইকার অর্থায়নে অধিগ্রহণ করা হবে। বাকি ৯৩১ একর জমি চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে অধিগ্রহণ করা হবে। কারণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। উক্ত প্রকল্পের জন্য গত বছরের ২৬ নভেম্বর পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। প্রথমপর্যায়ে ২৯৪ একর জমির ওপর টার্মিনাল, নেভিগেশন চ্যানেল, টার্নিং বেসিন, ডাম্পিং অব ড্রেজিং সয়েলের কাজ করা হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার লক্ষ্যে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে জাপান সরকারকে আহ্বান জানায় বাংলাদেশ সরকার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জাইকা ২০১৬ সালে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে, যাতে মাতারবাড়ীতে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দরের সম্ভাবনার কথা বলা হয়। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি এবং জাহাজ থেকে কয়লা খালাসের জন্য ১৬ মিটার গভীর ও ২৫০ মিটার চওড়া যে চ্যানেল ও টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে, সেই একই চ্যানেল ব্যবহার করে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা দেখা দেয়। এ চ্যানেলের ওপর নির্ভর করেই গড়ে তোলা হবে গভীর সমুদ্রবন্দর। এতে নতুন করে কোনো চ্যানেল করতে হবে না।

বর্তমানে দেশ-বিদেশি ৩ হাজারের মতো কর্মচারী কাজ করছেন মাতারবাড়ী প্রকল্পে। আর কর্মকর্তার সংখ্যা এক হাজার। এই প্রকল্পের ফেজ ১-এর কাজ প্রায় ১৯ শতাংশ শেষ। ১ হাজার ৪১৪ দশমিক ৬ একর জায়গায় ফেজ ১-এর আওতায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। পুরো কাজ শেষ হবে ২০২৪ সালে। একই প্রকল্পে ২০২৪ সালের পর শুরু হবে ফেজ ২-এর কাজ। এর আওতায় আরও ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে জাইকা-বাংলাদেশ কোম্পানি। এ ছাড়া মাতারবাড়ী বন্দরে এখন ১২ মিটার ড্রাপসের জাহাজ প্রবেশ করতে পারছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ২০৪১ সালের মধ্যে বার্ষিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫৭ লাখ টিইইউ থেকে ৬৫ লাখ টিইইউ। জাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে ৮ হাজার ২০০টি। এ বিপুলসংখ্যক কন্টেইনার ও জাহাজ হ্যান্ডেলিংয়ের ক্ষমতা দেশের বর্তমান সমুদ্রবন্দরগুলোর নেই। তাই গভীর সমুদ্রবন্দরই এ ক্ষেত্রে প্রধান ভরসা।

এ প্রসঙ্গে নৌপরিবহন সচিব আবদুস সামাদ বলেন, গভীর সমুদ্রবন্দর দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পথে মাইলফলক হবে নতুন এই বন্দর। প্রকল্পটির বিষয়ে সরাসরি তদারকি করছে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের ফাস্টট্র্যাক মনিটরিং কমিটি। এই প্রকল্প দ্রুত ও সফলভাবে বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করি। তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় দুটি টার্মিনাল নির্মাণের বাইরেও কার্গো হ্যান্ডেলিং যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হবে। এছাড়া প্রাসঙ্গিক সরঞ্জাম ও সংযোগ সড়ক তৈরি করা হবে। চলতি বছরে প্রকল্প অনুমোদন পেলে ২০২৬ সাল নাগাদ কাজ শেষ হবে।

x

Check Also

আজ বুধবারের দিনটি আপনার কেমন যাবে?

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : আজ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বুধবার। নতুন সূর্যালোকে আজ বুধবারের দিনটি আপনার ...

Scroll Up