গুলশানের প্লট নিয়ে ভয়ঙ্কর জালিয়াতি

29
গুলশানের আলোচিত সেই প্লটটিকে ঘিরে গড়ে উঠা প্রতারক চক্রের কয়েকজন।

এমএনএ রিপোর্ট : রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের ৭ কাঠার একটি প্লট ঘিরে ঘটেছে একাধিক ভয়ঙ্কর জালিয়াতির ঘটনা। একটি চক্রই পাঁচটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত ওই চক্রের ১৮ সদস্যের মধ্যে ১৬ জনই ধরা পড়েছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। আর এভাবে চক্রের কবল থেকে রক্ষা পায় রাজউকের বরাদ্দপ্রাপ্ত কানাডাপ্রবাসী আবুল ফজলের আলোচিত প্লটটি। প্লট নিয়ে জালিয়াতির এ চাঞ্চল্যকর ঘটনা জানা গেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির দায়িত্বশীল সূত্র থেকে।

সিআইডির তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, সংঘবদ্ধ জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটেছে গুলশান-২ নম্বরের ৯৩ নং সড়কের ১৫/সি নম্বর প্লটটিকে ঘিরে। পৃথকভাবে জাল কাগজপত্র তৈরি করে একাধিক ব্যক্তির কাছে প্লট বিক্রির চুক্তি করে প্রতারণার ফাঁদ তৈরির মাধ্যমে অন্তত ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। ‘এম এম জলিল খান’ নামে পাঁচজন পৃথক ব্যক্তি নিজেদের ওই প্লটের প্রকৃত মালিক দাবি করে আসছিলেন। তারা সবাই ভুয়া ‘এম এম জলিল’ পরিচয়ে জাল কাগজপত্র তৈরি করেন। এরই মধ্যে রহস্যজনকভাবে মালিকের নথি রাজউকের ফাইল থেকে গায়েব হয়ে গেছে।

গুলশানের আলোচিত সেই প্লটটিকে ঘিরে গড়ে উঠা প্রতারক চক্রের কয়েকজন।
গুলশানের আলোচিত সেই প্লটটিকে ঘিরে গড়ে উঠা প্রতারক চক্রের কয়েকজন।

সিআইডি সূত্রে আরও জানা গেছে, ১৯৮৯ সালে রাজউক কর্তৃপক্ষ গুলশান ২ নম্বরে ১৫/বি প্লটটি চার ভাগে বিভক্ত করে চারজনের নামে বরাদ্দ দেয়। নতুন ১৫/বি নম্বর প্লটটি দেওয়া হয় সাবেক ডিআইজি নাজমুল হোসেনের নামে, ১৫/ডি নম্বর প্লটটি সারাহ বেগম কবরীর নামে, ১৫/ই নম্বর প্লট হারুল ইসলাম ও ১৫/সি নম্বর প্লট দেওয়া হয় ফেরদৌস ভুঁইয়ার নামে। এরমধ্যে প্লট নিতে ফেরদৌসের দাখিল করা আয়কর সনদ ভুয়া প্রমাণিত হয়। ফলে ব্যবসায়িক কোটায় ফেরদৌসের নামে বরাদ্দ দেওয়া ১৫/সি প্লটটি ১৯৯৭ সালে বাতিল করে রাজউক। দীর্ঘদিন পর ২০১৪ সালে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক আবুল ফজলকে প্রবাসী কোটায় ওই প্লট বরাদ্দ দেয় রাজউক কর্তৃপক্ষ। বৈধ মালিককে প্লটটির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার সময় রাজউক জানতে পারে ১৫/সি নম্বর প্লটের মালিকানা দাবি করছেন আরও পাঁচজন। তারা সবাই নিজেদের জমির আদি মালিক ‘এম এ জলিল’ বলে পরিচয় দিচ্ছেন। মালিকানা নিয়ে এ জটিলতা দেখা দেওয়ায় চলতি বছরের ৪ মার্চ রাজউকের সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) নাসির উদ্দিন শরীফ বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। সংস্থাটির তদন্তে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা মূল্যের (বর্তমান বাজারমূল্য হিসেবে) এই প্লট দখলে নিতে প্রতারণার পাঁচটি ঘটনা ও জালিয়াতির নানা তথ্য উঠে আসে। চলতি মাসের প্রথম দিকে প্রতারক চক্রের ১৮ সদস্যকে আসামি করে মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, গুলশান ২ নম্বরে সিএন (এ) ব্লকের এক বিঘা এক কাঠা ১২ ছটাক জায়গা নিয়ে ১৫/বি নম্বর প্লটটির মূল মালিক ছিলেন বিহারি এম এ জলিল। বালাম বইয়ে তার ঠিকানা দেওয়া আছে ৮৭ মতিঝিল, চেম্বার বিল্ডিং, নিচতলা, ঢাকা। তবে ‘রহস্যজনক’ কারণে দীর্ঘদিন তার খোঁজ নেই। তার কোনো আত্মীয়স্বজনেরও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ১৯৮৯ সালে রাজউক লে-আউট নকশা সংশোধন করে এম এ জলিলের প্লটটি ভাগ করে নতুন চারটি প্লট সৃজন করে। তাতে ১৫/সি নম্বর প্লটটিতে জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৮০ কাঠা। জালিয়াত চক্রের নজর পড়ে এই প্লটটির ওপর। বালাম বইয়ে থাকা তথ্য চুরি করে ভুয়া এম এ জলিল সাজিয়ে প্লটটি দখলের চেষ্টা শুরু হয়। প্রতারক চক্রের সদস্যরা মূলত ফেরদৌস ভুইয়ার নামে ১৫/সি নম্বর প্লট বাতিল হওয়ার পর পাঁচজনকে নকল জলিল সাজিয়ে রাজউকে ভুয়া কাগজপত্র জমা দেন। তারা বিভিন্ন সময় বয়স্ক বিহারি ও বাঙালি লোকজনকে প্লটের ভুয়া মালিক সাজান। এরপর বিভিন্ন আগ্রহী ক্রেতার কাছে ভুয়া নথি উপস্থাপন করে রেজিস্ট্রি, আম-মোক্তারনামা ও যৌথ আম-মোক্তারনামা দলিল করে অন্তত ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

প্রতারক চক্র-১: শাহ মতিনুর রহমান নামে এক ব্যক্তি ভুয়া এম এ জলিল খান সেজে ১৫/সি প্লটের মালিক সেজে নকল কাগজপত্র তৈরি করেন। মতিনুরকে ব্যবহার করেন প্রতারক চক্রের হোতা আবদুল জব্বার। এই চক্রে আরও রয়েছেন আবদুস সালাম ও বেলায়েত হোসেন নামে দুই ব্যক্তি। তারা ভুয়া দলিল ও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে ১৫/সি নম্বর প্লটের মালিকানা দাবি করে রাজউকে কাগজপত্র জমা দেন। এম এ জলিল সেজে শাহ মতিনুর ওই জমির মালিকানা দাবি করে সেটি বিক্রির জন্য একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা নেন।

প্রতারক চক্র-২: গুলশানের ওই প্লটের মালিকানা দাবি করে আসছিল আরেকটি চক্র। এই চক্রের নেতা কামরুজ্জামান খান বকুল। তিনি জমির মালিক সাজান মো. জফির নামে একজন বিহারিকে। এই চক্রে আরও রয়েছেন ইউসুফ আলী, মো. কালাম, সাদেক খান ওরফে খোকন ও মো. মজিবুর রহমান। এই চক্রটিও বিহারি জফিরকে এম এম জলিল সাজিয়ে রাজউকে ভুয়া কাগজপত্র জমা দিয়ে প্লটের মালিকানা দাবি করে। চক্রের সদস্যরা কামরুজ্জামানের ভাড়া বাসায় কমিশনের মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রার নিয়ে আগ্রহী ক্রেতা জনৈক আবদুল কাদের খানের ভাই মান্নানের কাছ থেকে ভুয়া আম-মোক্তার নামা দলিল করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। ভুয়া ওই দলিলের নম্বর হলো- ৯০৫৯।

প্রতারক চক্র-৩: তিন নম্বর প্রতারক চক্রের মূল হোতা হলেন আবদুজ্জাহের ওরফে জসীম। এই চক্রে আরও রয়েছেন ইসরাফিল ও জাকির হোসেন। চক্রের সদস্যরা বিহারি ইসরাফিলকে ভুয়া এম এম জলিল খান সাজিয়ে প্লটটির মালিকানা দাবি করে রাজউকে কাগজপত্র জমা দেন। আসল জলিলের স্বাক্ষর ও ছবি তারা জাল করেছিলেন।

প্রতারক চক্র-৪: এই চক্রের সদস্যরা শেখ গোলাম নবী নামে এক ব্যক্তিকে এম এম জলিল খান সাজান। তাদের চক্রে আরও রয়েছেন মোশাররফ হোসেন রানা ও জসীম। চক্রটি আবদুল মতিন নামে একজন আগ্রহী ক্রেতার সঙ্গে যৌথ আম-মোক্তারনামা দলিল করে এক কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে। ওই ভুয়া আম-মোক্তারনামার দলিল নম্বর ৫৯৫৪। যা ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট সম্পন্ন হয়।

প্রতারক চক্র-৫: পেশাদার প্রতারক চক্রের এই দলে রয়েছেন রফিক খান ও তারেক মাজহার চৌধুরী। রফিক খান নিজেকে এম এ জলিল খান পরিচয়ে ওই প্লটের মালিক দাবি করে রাজউকে দলিলপত্র জমা দেন। এ চক্রের সদস্যরা প্লটটি বিক্রির প্রাথমিক চুক্তি করে ডা. জাফর আলী মীরের কাছ থেকে ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা নেন।

সরেজমিন: আজ বৃহস্পতিবার সকালে গুলশানে ২ নম্বরে গিয়ে দেখা যায়, ১৫/সি প্লটটি পাহারা দিচ্ছেন ৮-৯ জন। আশপাশের সব প্লটে বহুতল ভবন উঠলেও ওই প্লটটি ফাঁকা। প্লটের প্রকৃত মালিক আবুল ফজলের পক্ষে সেখানে নিরাপত্তারক্ষীরা অবস্থান করছেন। শওকত হোসেন নামে একজন নিরাপত্তারক্ষী জানান, কয়েক মাস আগেও অনেকে এসে তাদের ভয়ভীতি দেখাত। এখন সেটা নেই।

তদন্তে যা মিলেছে: সিআইডি সূত্র জানায়, প্লট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- শাহ মতিনুর রহমান, জফির, ইসরাফিল, রফিক খান, শেখ গোলাম নবী, ইউসুফ আলী, কালাম, কামরুজ্জামান, বকুল, মজিবর রহমান, সালাম, সাদেক খান, মোশাররফ হোসেন, তারেক মাজহার চৌধুরী, জাকির হোসেন, আবদুজ্জাহের ও বেলায়েত হোসেন। পলাতক দুই অভিযুক্ত হলেন আবদুল জব্বার ও হাফিজ উদ্দিন। প্রতারক চক্রের ১৩ জন দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এই চক্রের হোতা আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে গুলশান ২ নম্বরের ৫৮ নম্বর সড়কের আরেকটি প্লট নিয়ে প্রতারণায় যুক্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতারক চক্রের দুটি গ্রুপ গুলশানে দামি অফিসও ভাড়া নেয়। তারা মাসে অফিস ভাড়া দিত আড়াই লাখ টাকা। পুলিশের অভিযানের পর ওই অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্লট প্রতারকদের সঙ্গে রাজউকের একটি অসাধু চক্রও জড়িত আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্তে রাজউকের কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা যায়নি। এ ছাড়া রাজউকের রেকর্ড রুমে প্লটটির মূল মালিক এম এ জলিলের ফাইলটি গায়েব হওয়ার রহস্যও এখনও উন্মোচিত হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার উত্তম কুমার বলেন, জালিয়াতি করে কয়েকটি চক্র গুলশানের ওই প্লট (১৫/সি) হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় নেওয়া হয়েছে। রাজউকের সহকারী পরিচালক নাসির উদ্দিন শরীফ বলেন, পাঁচটি চক্র ওই প্লটের মালিকানা দাবি করায় প্রকৃত মালিককে তা বুুঝিয়ে দেওয়া যাচ্ছিল না। পরে এ ব্যাপারে মামলার পর সিআইডির তদন্তে জালিয়াতির বিষয়টি উঠে আসে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির উপপরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন বলেন, জালিয়াত চক্রের সদস্যরা পেশাদার প্রতারক। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে তারা আগ্রহী ক্রেতাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তদন্তের পর চলতি মাসের শুরুতে জড়িত সব প্রতারককে শনাক্ত করে আদালতে ১৮ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

১৫/সি নম্বর প্লটের প্রকৃত মালিক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক আবুল ফজলের আইনি বিষয়টি দেখভাল করছেন মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি জানান, প্রতারক চক্র ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে আবুল ফজলের প্লটটি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

ট্যাগ : গুলশানের, প্লট, নিয়ে, ভয়ঙ্কর, জালিয়াতি