গোপালগঞ্জের সেই উপাচার্যকে অপসারণের সুপারিশ

এমএনএ রিপোর্ট : গোপালগঞ্জে অবস্থিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে’র (বশেমুরবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক খোন্দকার নাসিরউদ্দিনকে অপসারণের সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত কমিটি।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান উপাচার্যকে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম আর পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে তাকে প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।

আজ রবিবার এই তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহর কাছে জমা দেয়। পরে প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মো. আলমগীর এই তদন্ত কমিটির প্রধান। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট এ তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম, ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ হুসেন, ইউজিসির পরিচালক (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়) কামাল হোসেন ও ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপ-পরিচালক মৌলি আজাদ। তিনি এ তদন্ত কমিটির সদস্য-সচিব।

শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের নির্দেশে গত ২৩ সেপ্টেম্বর এ তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল ইউজিসি। ১১ দিন ধরে বশেমুরবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। তার প্রেক্ষিতেই ২৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষা উপমন্ত্রী বিষয়টি তদন্ত করে ইউজিসিকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক তথ্যাদি জানাতে অনুরোধ করে। এর পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর এ কমিটি গঠন করা হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর কমিটির সদস্যরা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে সরেজমিনে যান। সেখানে দুই দিন সরেজমিনে কাজ করে তদন্ত কমিটি। এরপর আজ রবিবার এই প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসার ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন আজ রবিবার সিলেটে অবস্থান করছেন। যে কারণে তারা এখনো এ তদন্ত প্রতিবেদন দেখতে পারেননি। তারা আগামীকাল সোমবার ঢাকায় ফিরলে এ প্রতিবেদন তাদের কাছে উপস্থাপন করা হবে। এরপর তাদের নির্দেশনা অনুসারে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

তদন্ত কমিটি সূত্র জানায়, তদন্তকালে তারা উপাচার্য অধ্যাপক খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের প্রশাসনিক ও একাডেমিক নানা অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছেন। দুই দফায় উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক নাসিরউদ্দিন শিক্ষক নিয়োগে একাধিক অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে আরও বেশি। প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে তদন্তকালে।

সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটির কাছে বশেমুরবিপ্রবির শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মন খুলে কথা বলেছেন। তারা তদন্ত কমিটিকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েক বছরে যারাই ভিসি নাসিরউদ্দিনের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তাদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। শারীরিক, মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন অনেকেই।

কমিটি প্রতিবেদনে বলেছে, নারী কেলেঙ্কারি, ভর্তি বাণিজ্য, উপাচার্যের বাসভবনের পাশে বিউটি পার্লার দিয়ে ব্যবসা করার মতো খবরে বিগত কয়েক বছর গণমাধ্যমে বারবার নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হয়েছেন এই উপাচার্য। গত বছর এপ্রিল মাসে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝিলিক নামে এক নারী কর্মচারীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের তথ্য ফাঁস হয়। এতে নাসিরউদ্দিনকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

তদন্ত কমিটি সূত্র জানায়, কমিটির প্রতিবেদনে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তুলে ধরে সেগুলোর বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সুপারিশ করা হয়েছে সরকারের কাছে।

কমিটির দু’জন সদস্য গণমাধ্যমকে বলেন, গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্নিষ্টরা তাদের কাছে অভিযোগ করেছেন যে, ভিসি প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন গত ৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়কে টর্চারিং সেলে পরিণত করছেন। তার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এছাড়া তিনি নিয়োগ, ভর্তি বাণিজ্য ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়কে। বহিরাগত পেইড গুন্ডাপান্ডা দিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাসহ অব্যাহতভাবে মানসিক ও শারীরিক নির্যাত করা হয়েছে। এর কিছু কিছু প্রমাণও পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এ নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে অভিজ্ঞ ও সিনিয়র অনেক শিক্ষক শিক্ষা ছুটি নিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ বিভাগ চলছে প্রভাষকদের দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের কোন সুযোগ নেই। ফেসবুকে ভিন্নমত প্রকাশ করায় এ পর্যন্ত শতাধিক শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্নিষ্টরা অভিযোগ তুলে ধরে জানান, বিগত ৫ বছরে অতিরিক্ত মূল্যে ভর্তি ফরম বিক্রি করে এ ভিসি প্রায় ২০ কোটি টাকা লোপাট করেছেন। তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েই প্রথমে ‘ভিসি কোটা’ চালু করে শিক্ষাথী ভর্তির মাধ্যমে ‘বাণিজ্য’ শুরু করেন। পরে চাপের মুখে তিনি ভিসি কোটাকে ‘বিশেষ কোটা’য় পরিণত করে শিক্ষার্থী ভর্তির নামে কোটি কোটি টাকা লুটে নেন।

শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য তিনি বাসের ১৮টি ইঞ্জিন ক্রয় করেন। এসব ইঞ্জিনে তিনি গোপালগঞ্জে বসেই নিম্ন মানের বডি বানিয়ে সেখান থেকে কোটি কোটি টাকা পকেটে পুরেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে গাছ ক্রয়ের নামে ২৫ কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন। জিনসেং নামে একটি গাছ ৭ লাখ টাকায় ক্রয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে রোপণ করেন। এ গাছের মূল নাম ফাইবাস বনসাই। এটির বাজার মূল্য অনধিক ৬০ হাজার টাকা। টাকা লোপাটের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত টেবিল বেঞ্চ তৈরি করেন। খোলা আকাশের নীচে ফেলে রেখে নষ্ট করা হচ্ছে। ল্যাব স্থাপনের মালামাল ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছে। ফার্মেসি বিভাগের ল্যাব স্থাপনে ৪ লাখ টাকার মালামাল ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এখানে বিল ভাউচার করে ৪০ লাখ টাকা উত্তোলন করে ভাগ বাটোয়ারা করা হয়েছে। বই ও আসবাবপত্র ক্রয়ে খুলনা শিপইয়ার্ডকে ৪০ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেয়া হয়। এর মধ্যে ২০ কোটি টাকার চেক শিপইয়ার্ডকে প্রদান করা হয়েছে। এখানে কাজের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।

এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রথমে আব্দুল কুদ্দুস ও পরে আব্দুস সাত্তার দরপত্র অনুমোদনে অস্বীকৃতি জানালে তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। সেখানে ভিসির একনিষ্ঠ সমর্থক ইংরেজী বিভাগের চেয়ারম্যান আশিকুজ্জামান ভূঁইয়াকে প্রকল্প পরিচালক করা হয়। তিনি ভিসির সকল অপকর্মের বৈধতা দেন।

তদন্ত কমিটি বলেছে, বশেমুরবিপ্রবিতে বিদেশি ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে কোন মেধা যাচাই না করে ছাত্র প্রতি লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। এ কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দেন একাউন্টিং এ্যান্ড ইনফরমেশন সিন্টেমস বিভাগের শিক্ষক রবিউল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে নিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে ভিসি তা ধামাচাপা দেন।

তদন্ত কমিটি বলেছে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনো ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয় না। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ আইডি থেকে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল দেখেন। এ সুযোগে কোটি কোটি টাকার ভর্তি বাণিজ্য হয়। এর নেতৃত্ব দেন ছাত্রীদের যৌন হয়রানির দায়ে বহিষ্কৃত সিএসই বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মো. আক্কাছ আলী।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা আরেকটি বড় অভিযোগ, তিনি অবৈধভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্কুল অ্যান্ড কলেজ স্থাপন করে শিক্ষক, কর্মচারী নিয়ে দিয়ে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য করেন। এছাড়াও ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা লংঘন করে নিজ সমর্থক জুনিয়র শিক্ষকদের চেয়ারম্যান পদে বসিয়ে দিয়েছেন। নতুন নতুন অনেক বিভাগ খুলে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। অথচ শিক্ষার্থীদের বসার জায়গা দিতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

আরও অভিযোগ, ভিসি তার ভাতিজা খোন্দকার মোহাম্মদ পারভেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন। পরে ভিসির সহযোগিতায় সনদপত্র জালিয়াতি করে তিনি শিক্ষক হিসেবে আই আর বিভাগে নিয়োগ পান। নিয়োগের পরই তিনি ওই বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।

এ ছাড়া ফেসবুকে স্টাটাস দেওয়াকে কেন্দ্রে করে ভিসি প্রফেসর খোন্দকার নাসিরউদ্দিন গত ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্রী ও ডেইলি সানের ক্যাম্পাস প্রতিনিধি ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে সাময়িক বহিষ্কার করেন। এনিয়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠলে তিনি তা প্রত্যাহার করেন।

x

Check Also

আবরার হত্যার দায়ে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি

এমএনএ রিপোর্ট : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার দায়ে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ...

Scroll Up