গোয়েন্দা নজরদারিতে সম্রাট, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

এমএনএ রিপোর্ট : রাজধানীতে ক্লাব ব্যবসার আড়ালে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে কঠোর গোয়ন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে তার দেশ ত্যাগে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে নিষেধাজ্ঞার আদেশ পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। সূত্রটি বলছে, সম্রাট এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে।

জানা গেছে, গত বুধবার ঢাকার মতিঝিলের ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাব এবং মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্রে র‌্যাবের অভিযানে অবৈধ ক্যাসিনোর সন্ধান পাওয়া যায়। এরপরই সেগুলো পরিচালনায় যুবলীগ নেতাদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ পায়।

ওইদিনই গ্রেপ্তার করা হয় যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। পরদিন গ্রেপ্তার করা হয় ঠিকাদার জি এম শামীমকে, যিনিও যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন। দুদিন পর কলাবাগান ক্লাব থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কৃষকলীগের নেতা শফিকুল আলম ফিরোজকে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাটের নাম উঠে আসে। এরপর থেকে সম্রাট আত্মগোপনে চলে যায় বলে গুঞ্জন ওঠে।

যুবলীগের কর্মীরা জানিয়েছেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতির খোঁজ মিলছে না কোথাও। তিনি কার্যালয়েও যাচ্ছেন না, বাড়িতেও পাওয়া যাচ্ছে না তাকে।

এদিকে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত যুবলীগ নেতা সম্রাট ছয় দিন ধরে কাকরাইলের ভূঁইয়া ম্যানশনে তাঁর ব্যক্তিগত কার্যালয়ে শতাধিক যুবকের পাহারায় অবস্থান করছেন। সেখানে সবার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা আছে। যুবলীগের ঘনিষ্ঠ সূত্র প্রথম আলোকে বলেছে, দলের শীর্ষ নেতাদের পরামর্শে সম্রাট বাসায় না থেকে ব্যক্তিগত কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। তবে সম্রাট নিজের অবস্থান সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাটের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনাদের কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের সহযোগিতা করতে পারেন।

ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চললেও গডফাদার হিসেবে পরিচিত সম্রাটকে কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না- এ প্রশ্ন এখন সংশ্লিষ্ট প্রায় সবার। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, গডফাদার-গ্র্যান্ডফাদার বলতে কিছু নেই। আমরা চিনি অপরাধীকে। অপরাধী যে বা যারাই হোক তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

সম্রাটকে কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, অ্যাকশনটা শুরুর এক সপ্তাহও হল না। এক সপ্তাহের মধ্যে সব ব্যবস্থা হবে?

ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার সাহেব বাজার এলাকায়। তিনি প্রয়াত ফয়েজ উদ্দিন চৌধুরীর ছেলে। সম্রাট যুবলীগে খুবই প্রভাবশালী এক নেতা। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বিগত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

পরবর্তী কাউন্সিলে অনেকটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর থেকে যুবলীগের গুরুত্বপূর্ণ এ ইউনিটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তিনি। যুবলীগের দিবসভিত্তিক কর্মসূচি এবং রাজধানীতে আওয়ামী লীগের জনসভাগুলোতে সব সময়ই বড় শোডাউন থাকত সম্রাটের লোকজনের।

যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী সম্রাটের নেতৃত্বাধীন যুবলীগের এ ইউনিটকে ‘শ্রেষ্ঠ সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণাও দিয়েছেন।

আলোচিত এ সম্রাট মাসে অন্তত ১০ দিন সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলেন। এটি তার নেশা। সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় জুয়ার আস্তানা মেরিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনোতে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ থেকেও আসেন জুয়াড়িরা। সেখানেও সম্রাট ভিআইপি জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত।

প্রথম সারির জুয়াড়ি হওয়ায় সিঙ্গাপুরের চেঙ্গি এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করার বিশেষ ব্যবস্থাও আছে। সিঙ্গাপুরে গেলে সম্রাটের নিয়মিত সঙ্গী হন যুবলীগ দক্ষিণের নেতা আরমানুল হক আরমান, মোমিনুল হক সাঈদ ওরফে সাঈদ, সম্রাটের ভাই বাদল ও জুয়াড়ি খোরশেদ আলম। এদের মধ্যে সাঈদ কমিশনারের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

সম্রাটের ব্যাপারে এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘যার নাম আপনারা বলছেন, সে ছাড়াও সরকারের অন্য কেউ যদি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ায়, তাহলে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলেছে, শীর্ষ মহলের সবুজসংকেতের পরই সম্রাটের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

ক্যাসিনো বন্ধে গত বুধবার অভিযান শুরু করে র‍্যাব। ওই দিন মতিঝিলের ইয়ংমেনস, ওয়ান্ডারার্স, মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্র ও বনানীর গোল্ডেন ঢাকা ক্লাবে অভিযান চালিয়ে সেগুলো সিলগালা করে দেওয়া হয়। এ অভিযানের ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্লাব ও জুয়ার আসরে অভিযান চালায় পুলিশ। ঢাকার বাইরে বরিশালের নাজিরপুরে নবজাগরণ নামের একটি ক্লাবেও গতকাল অভিযান চালানো হয়।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় মোহামেডান, আরামবাগ, দিলকুশা, ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়া ও ফকিরেরপুল ইয়ংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো ছিল। এর মধ্যে ইয়ংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। বাকি পাঁচটি ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন সম্রাটের লোকজন। সম্রাট নিজে ক্যাসিনো দেখাশোনা না করলেও তাঁর ক্যাসিনো চালাতেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক ওরফে সাঈদ। তাঁরা এক বছর আগে পল্টনের প্রীতম–জামান টাওয়ারে ক্যাসিনো চালু করেছিলেন। কাওসার ও মমিনুল হক এখন বিদেশে।

ক্লাবপাড়ার একাধিক সূত্র বলেছে, ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাব প্রভাব খাটিয়ে দখল করে সেখানে ক্যাসিনো চালু করেন খালেদ মাহমুদ। আরামবাগ ও দিলকুশা ক্লাবের সভাপতি আওয়ামী লীগের স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল হক। তিনি অন্তত পাঁচটি ক্লাবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তিনি সম্রাটের ঘনিষ্ঠ লোক বলে পরিচিত। তাঁর হয়ে আরামবাগ ক্লাবে ক্যাসিনো দেখভাল করতেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী শাহাজাদুল ইসলাম।

ক্যাসিনোর কারণে বন্ধ হওয়া আরেক ক্লাব ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের সভাপতি স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কায়সার। এই ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন রশিদুল হক নামের এক ব্যবসায়ী।

ভিক্টোরিয়া ও মোহামেডান ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন আবুল কাশেম নামের এক ব্যবসায়ী। তিনি শান্তিনগরে বসবাস করেন। মমিনুল হক মোহামেডান ক্লাবকে চাপ দিয়ে ক্যাসিনো চালু করেছিলেন। বিনিময়ে প্রতি মাসে ক্লাবকে মাত্র ২০ লাখ টাকা করে দেওয়া হতো।

x

Check Also

সংকটের মুখে পদত্যাগ করলেন অনিল আম্বানি

এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : রিলায়েন্স কমিউনিকেশনস লিমিটেড (আরকম) ভারতের অন্যতম শীর্ষ সেলফোন অপারেটর। তবে দেশটির ...

Scroll Up