গ্রীস্ম ও বর্ষাকালে টমেটোর লাভজনক চাষ

40

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : বাংলাদেশে যেসব সবজি চাষ করা হয় তার মধ্যে টমেটো অন্যতম। এর ইংরেজি নাম Tomato ও বৈজ্ঞানিক নাম Solanum lycopersicum. টমেটো একটি শীতকালীন সবজি। শীতকালীন সবজি ফসল হলেও এর কয়েকটি জাত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে চাষ করা যায়। তবে আমাদের দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই শীতকালীন টমেটো চাষ করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশের অনেক
Tomato-1স্থানে এখন ব্যবসায়িক ভিত্তিতে টমেটো চাষ ও বাজারজাত করা হয়।

পুষ্টিগুণ

টমেটোতে আমিষ, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ‘এ’ ও ভিটামিন ‘সি’ আছে।

বাজার সম্ভাবনা

টমেটো হচ্ছে একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর সবজি। কচি ও পাকা টমেটো সালাদ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন রান্নায় টমেটো ব্যবহার করা হয়।

এছাড়া টমেটো দিয়ে সুস্বাদু সস, কেচাপ ইত্যাদি তৈরি করা হয়। তাই টমেটোর চাহিদা সব সময়ই থাকে। টমেটো চাষ করে পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয় করা সম্ভব। এছাড়া দেশের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত উৎপাদন বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বিভিন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সহায়তা দিয়ে থাকে। টমেটো বিদেশে রপ্তানি করার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

টমেটো উৎপাদন কৌশল

জাত

* বিভিন্ন জাতের টমেটোর বৈশিষ্ট্য

জাতের নাম                  ফলের ওজন (গ্রাম)                   গাছ প্রতি ফলের সংখ্যা                 জীবনকাল (দিন)
বারি টমেটো-১                           ৮৫-৯০                                   ২৫-৩০                                     ১০৫-১১০
বারি টমেটো-২                           ৮৫-৯০                                   ৩০-৩৫                                     ১০৫-১১০
বারি টমেটো-৩                           ৮০-৯০                                   ৩০-৩২                                     ১১০-১১৫
বারি টমেটো-৪                           ৩৫-৪০                                   ২০-২৫                                      ৯০-৯৫
বারি টমেটো-৫                           ৪০-৫০                                   ২০-২২                                      ৯৫-১০০
বারি টমেটো-৬ (চৈতী)               ৮০-৯০                                   ৩০-৩২                                    ১০০-১১০
বারি টমেটো-৭ (অপূর্ব)              ১৪৫-১৫৫                               ৩০-৩২                                    ১০০-১১০
বারি টমেটো (শিলা)                   ১০০-১১৫                               ২৫-৩০                                     ১০০-১১০
বারি টমেটো (লালিমা)               ৮৫-৯০                                    ৩২-৩৫                                    ৯৫-১০৫
বারি টমেটো (অনুপমা)              ২৫-৩০                                    ৭০-৮০                                    ৯০-১০০

Tomato-2
চাষের উপযোগী পরিবেশ ও মাটি

জলবায়ু, তাপমাত্রা, মাটির প্রকৃতি :
কার্তিক মাসের মাঝামাঝি থেকে মাঘ মাসের ১ম সপ্তাহ (নভেম্বর থেকে মধ্য জানুয়ারি) পর্যন্ত চারা রোপণ করা যায়। গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষের জন্য জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত বীজ বপন করা যায়।

২০-২৬ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা টমেটো চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী পর্যাপ্ত আলো বাতাস পাওয়া যায় এমন দো-আঁশ মাটি টমেটো চাষের জন্য ভালো।

জমি তৈরি

১. জমি ৪-৫ বার চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝরঝরে করে নিতে হবে।

২. গ্রীষ্মকালে টমেটো চাষের জন্য ২০-২৫ সে.মি. উঁচু ও ২৩০ সে.মি. চওড়া বেড তৈরি করতে হবে।

৩. সেচ দেওয়ার সুবিধার জন্য দু’টি বেডের মাঝে ৩০ সে.মি. নালা রাখতে হবে।

বীজ বপন ও চারা রোপণ

১. বীজ বপনের ৩০-৩৫ দিন পর চারা (৪-৬টি পাতা বিশিষ্ট) রোপণের উপযোগী হয়।

২. প্রতিটি বেডে দুই সারি করে চারা রোপণ করতে হবে। এক সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব ৬০ সে.মি. রাখতে হবে।

৩. প্রতি সারিতে চারার দূরত্ব ৪০ সে.মি. রেখে ৩০-৩৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হবে।

Tomato-6সার প্রয়োগ

কৃষকদের মতে গুণগত মানসম্পন্ন ভালো ফলন পেতে হলে টমেটো চাষের জমিতে যতটুকু সম্ভব জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। মাটি পরীক্ষা করে মাটির ধরণ অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে। তবে জৈব সার ব্যবহার করলে মাটির গুণাগুণ ও পরিবেশ উভয়ই ভালো থাকবে। বাড়িতে গবাদি পশু থাকলে সেখান থেকে গোবর সংগ্রহ করা যাবে। নিজের গবাদি পশু না থাকলে পাড়া-প্রতিবেশি যারা গবাদি পশু পালন করে তাদের কাছ থেকে গোবর সংগ্রহ করা যেতে পারে। এছাড়া ভালো ফলন পেতে হলে জমিতে আবর্জনা পচা সার ব্যবহার করা যেতে পারে। বাড়ির আশে-পাশে গর্ত করে সেখানে আবর্জনা, ঝরা পাতা ইত্যাদি স্তুপ করে রেখে আবর্জনা পচা সার তৈরি করা সম্ভব।

সেচ ও নিষ্কাশন

১. টমেটোর চারা লাগানোর পর প্রথম সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিন বিকাল বেলা সেচ দিতে হবে (শেকড় মাটিতে না ছড়ানো পর্যন্ত)।

২. এরপর প্রয়োজনে প্রতি সপ্তাহে বা ১৫ দিন পর পর একবার সেচ দিতে হবে।

৩. জমিতে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। পানি জমলে তা সাথে সাথে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

রোগ বালাই

১. কৃমিজনিত রোগ বা রুট নট নেমাটোড এর আক্রমণে গাছের শেকড়ে ছোট ছোট গিট দেখা যায়। গিটগুলো আস্তে আস্তে বড় হয়। রোগাক্রান্ত গাছটি খাটো হয়।

২. এর আক্রমণে রোগাক্রান্ত শেকড়ে পচন ধরে ও মাটিবাহিত অন্যান্য রোগের প্রকোপ বাড়ে। সবশেষে গাছ মরেও যেতে পারে।

Tomato-7প্রতিকার

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে পোকা দমন না হলে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা অথবা উপজেলা কৃষি অফিসে পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করা যেতে পারে।

চাষের সময় পরিচর্যা

১. ১ম ও ২য় কিস্তি সার দেয়ার আগে পার্শ্বকুশিসহ মরা পাতা ছাঁটাই করতে হবে। নির্বাচিত গাছের নির্বাচিত ফল ছাড়া অতিরিক্ত ফুল ও ফল ভেঙ্গে ফেলতে হবে। এতে রোগ ও পোকার আক্রমণ কম হয় এবং ফলের আকার বড় হয়।
২. প্রবল বাতাসে গাছ যাতে নুয়ে না পড়ে সেজন্য টমেটো গাছে ঠেকনা দিতে হবে।
৩. জাতের শুদ্ধতা রক্ষার জন্য অন্য জাতের টমেটোর ক্ষেত থেকে বীজ ক্ষেতের দূরত্ব কমপক্ষে ৮০ ফুট রাখতে হবে।
৪. টমেটো স্বপরাগায়িত ফসল হলেও ২-৫% পর্যন্ত পরাগায়ণ হতে পারে। সেজন্য হাত দিয়ে পরাগায়ণ ঘটানোর মাধ্যমে জাতের শুদ্ধতা বজায় রাখা যায়। পরাগায়ণ ঘটানোর পর কাগজের ব্যাগ দিয়ে ফুলের গুচ্ছ ঢেকে দিতে হবে।
৫. কোন গাছ অন্যরকম বা ভিন্ন জাতের মনে হলে তা সমূলে তুলে ফেলতে হবে।

ফসল সংগ্রহ

ফাল্গুন মাসের ২য় সপ্তাহ থেকে চৈত্র মাসের ১ম সপ্তাহ (ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মাঝামাঝি) পর্যন্ত সময়ে টমেটো সংগ্রহ করা যায়। পুষ্ট ও রোগবালাই মুক্ত টমেটো সংগ্রহ করতে হবে।
উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ

প্রতি বিঘা জমি থেকে প্রায় ৮০-৯০ মণ টমেটো উৎপাদন করা সম্ভব।

Tomato-3বীজ সংগ্রহ

বীজ সংগ্রহের জন্য সম্পূর্ণ পাকা, পুষ্ট ও রোগবালাইমুক্ত টমেটো সংগ্রহ করতে হবে। ফল সংগ্রহ করে প্লাস্টিকের বালতি বা গামলাতে ২-৩ দিন রেখে দিতে হবে। তারপর ফলগুলো আড়াআড়িভাবে কেটে অথবা চাপ দিয়ে ফাটিয়ে মাটি বা প্লাস্টিকের গামলা বা বাটিতে ১-৩ দিন রেখে দিতে হবে। এসময় বীজ মাঝে মাঝে নাড়াচাড়া করতে হবে যাতে বীজগুলো ফলের আঠালো অংশ থেকে আলাদা হয়ে যায়। তারপর চালনির সাহায্যে বীজ আলাদা করে ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে। সাধারণত ১০০ কেজি পাকা টমেটো থেকে ১ কেজি বীজ পাওয়া যায়।

টমেটো উৎপাদন খরচ

* ১বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে ফসল উৎপাদন খরচ

খরচের খাত                          পরিমাণ                                                                                     আনুমানিক মূল্য (টাকা)  

বীজ                                       ২৫০০ চারা                                                                                        ১২৫০/-

জমি তৈরি                              ৪ থেকে ৫ টি চাষ ও মই                                                                    ৮০০/-
পানি সেচ                               আনুমানিক ৬ ঘন্টা (প্রতি ঘন্টা ৫০-১০০টাকা)                                ৩০০-৬০০/-
শ্রমিক                                     ১০ জন (প্রতিজন=২০০ টাকা)                                                       ২০০০/-
সার                                         প্রয়োজন অনুসারে জৈব সার                                                            নিজস্ব
বিকল্প হিসেবে                                                                                  ১০৪০/-

                                                টিএসপি= ১৫ কেজি (১ কেজি=২৫ টাকা)
ইউরিয়া=৩৫ কেজি (১ কেজি=১৩ টাকা)
পটাশ= ৭ কেজি (১ কেজি=৩০ টাকা)

কীটনাশক                              প্রয়োজন অনুসারে জৈব বা রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার             নিজস্ব/দোকান
জমি ভাড়া                              একবছর                                                                                           ৪০০০/-

মাটির জৈব গুণাগুণ রক্ষা ও উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য জৈব সার ও জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে লাভের পরিমাণ বাড়তে পারে।

Tomato-9মূলধন

এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে টমেটো চাষের জন্য আনুমানিক ১৫০০-২০০০ টাকার প্রয়োজন হবে। মূলধন সংগ্রহের জন্য ঋণের প্রয়োজন হলে নিকট আত্মীয়স্বজন, সরকারি ও বেসরকারি ঋণদানকারী ব্যাংক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও)-এর সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এসব সরকারি ও বেসরকারি ঋণদানকারী ব্যাংক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) শর্ত সাপেক্ষে ঋণ দিয়ে থাকে।

প্রশিক্ষণ

টমেটো চাষের আগে অভিজ্ঞ কারও কাছ থেকে টমেটো চাষ সম্পর্কে বিস্তরিত জেনে নিতে হবে। এছাড়া চাষ সংক্রান্ত কোন তথ্য জানতে হলে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা অথবা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্ধারিত ফি এর বিনিময়ে কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

বাণিজ্যিকভাবে টমেটো চাষ করে বিক্রি করার পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে টমেটো দিয়ে নানান মুখরোচক খাদ্য তৈরি করা সম্ভব।