চিকিৎসক-নার্সের সুরক্ষা উপকরণের ঘাটতি

এমএনএ রিপোর্ট : করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী চিকিৎসকদের দম ফেলার ফুরসত নেই এখন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশেও চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ হাসপাতাল কর্মীরা সাধ্যমতো প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেই সঙ্গে ভয়-উৎকণ্ঠাও জেঁকে বসছে অনেকের মধ্যে। কারণ হাসপাতালে বেড ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি থাকলেও ঘাটতি রয়েছে ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণের।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার চিকিৎসক, সিভিল সার্জন ও দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নভেল করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত রোগীর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে হাসপাতালে গঠিত হয়েছে ‘রেসপন্স টিম’। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজটিও সম্পন্ন করেছে সরকার। চিকিৎসকরাও মানসিকভাবে প্রস্তুত রয়েছেন। কিন্তু এ চিকিৎসায় যেসব সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহারের প্রয়োজন পড়বে, তার পর্যাপ্ত মজুদ নেই, সরকারের এত আয়োজনের মধ্যেও যা শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, আগে থেকেই এ বিষয়ে আরো গুরুত্ব দেয়ার দরকার ছিল। না হয় সবারই পরিবার আছে, সুরক্ষা উপকরণের সংকট থাকলে অনেক চিকিৎসক সেবা দিতে অপারগতা প্রকাশ করতে পারেন। এছাড়া পারিবারিকভাবেও বাধা আসতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।

জানতে চাইলে ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন ডা. এবিএম মশিউল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, সুরক্ষা উপকরণের ঘাটতির কথা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানানো হয়েছে। এছাড়া স্থানীয়ভাবে প্রথাগত সুরক্ষা উপকরণ সংগ্রহ করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা টাঙ্গাইলেও রয়েছে সুরক্ষা উপকরণের সংকট। টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ওয়াহীদুজ্জামান বলেন, আমাদের কাছে সার্জিক্যাল মাস্কের মজুদ থাকলেও অন্যান্য ভারী উপকরণ সেভাবে ছিল না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানোর পর গত রবিবার ১৭ সেট সুরক্ষা উপকরণ পাঠানোর কথা বলেছে তারা, যদিও এখনো তা হাতে পাইনি। একই অবস্থা রাজধানীর হাসপাতালগুলোয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণের যথেষ্ট ঘাটতি আছে। ঢাকার বাইরে জেলাগুলোর মধ্যে সুরক্ষা উপকরণের ঘাটতির কথা জানিয়েছেন বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. কেএম হুমায়ূন কবির। তিনি বলেন, আমরা প্রস্তুতি হিসেবে সদর হাসপাতালের ১০টি এবং উপজেলা হাসপাতালে পাঁচটি করে বেড বরাদ্দ রেখেছি। তবে সুরক্ষা উপকরণ কম আছে। জেলা সদরে ভারী উপকরণ ১০টির মতো থাকলেও উপজেলা হাসপাতালগুলোয় দুই বা তিনটির বেশি নেই। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে।

সুরক্ষা উপকরণের ঘাটতির কথাটি স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস বড় আকারে এলে আগামী তিন মাসের জন্যও পর্যাপ্ত উপকরণ আমাদের মজুদ নেই। তবে এ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। আমরা এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আমাদের অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে দেশেই এসব পণ্যের উৎপাদন করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসকের সংখ্যা ১ লাখ ৯৮৭ জন। বিডিএস পাস করা চিকিৎসক ১০ হাজার ৪৪১ এবং নিবন্ধিত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আছেন ১৬ হাজার ৬০৪ জন। অন্যদিকে বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবার আরো বড় একটি অংশীদার নিবন্ধিত নার্স আছেন ৬৫ হাজার ৭৩৪ জন। এছাড়া সহকারী নার্স, এমসিএইচ ভিজিটরস, জুনিয়র মিডওয়াইফারি, জুনিয়র নার্স কমিউনিটি প্যারামেডিকস ও সমমানের স্টাফ আছেন ৫০ হাজার ৫৪২ জন। স্বাস্থ্য বুলেটিন ২০১৮ অনুযায়ী, এদের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হয়ে সরকারিভাবে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত আছেন ২০ হাজার ৯১৪ চিকিৎসক। প্রথম শ্রেণীর এসব চিকিৎসক সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে কর্মরত। এছাড়া সরকারি হাসপাতালগুলোয় কাজ করেন ৫ হাজার ১৮৪ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ২০ হাজার ১০৩ জন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার। এর বাইরে বড় সংখ্যক চিকিৎসক ও সাপোর্ট স্টাফ বেসরকারিভাবে নিয়োজিত আছেন। স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত এসব চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপাদান না থাকাটা উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করেন চিকিৎসক নেতারা।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধে নামিয়ে দেয়াটা আত্মঘাতী হতে পারে। একজন চিকিৎসক হিসেবে যদি বলি, তাহলে সুরক্ষা উপকরণের স্বল্পতা অবশ্যই উদ্বেগের কারণ। যদি সেবাপ্রদানকারীদের যথাযথ সুরক্ষা দেয়া না হয়, তখন সরকারের এত প্রস্তুতি বিলীন হয়ে যেতে পারে।

তার ভাষায়, এমনিতেই চিকিৎসকদের পারিবারিক চাপ আছে, এর মধ্যে জোর করে কাউকে সুইসাইড করতে পাঠানো যায় না। তবে বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সাধ্যমতো কাজ করছে এবং দ্রুত এ সমস্যা সমাধান হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রদান করার জন্য একজন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীকে (চিকিৎসক ও অন্যান্য সেবাপ্রদানকারী) অবশ্যই মেডিকেল মাস্ক, বিশেষায়িত গাউন, হাতের গ্লাভস, চোখের জন্য গোগলস ছাড়াও ক্ষেত্রবিশেষ এন৯৫ মাস্ক বা সমজাতীয় সুরক্ষা উপকরণের সঙ্গে অ্যাপ্রোণ ব্যবহার করতে হবে।

কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোড মেনে এ-জাতীয় উপকরণ উৎপাদন করে এমন প্রতিষ্ঠান একেবারে কম। ফলে এসব সুরক্ষা উপকরণের জন্য আমাদের আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে অধিকাংশ দেশে করোনা সংক্রমণ হওয়ায় এ মূহূর্তে কেউই এসব পণ্য রপ্তানি করছে না। এছাড়া এ-জাতীয় পণ্যের সবচেয়ে বড় কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ চীন ব্যাপকভাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় উৎপাদনে সীমাবদ্ধতাও দেখা যাচ্ছে।

এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সুরক্ষা উপকরণের মজুদ বাড়ানোর জন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে গঠিত জাতীয় কমিটির একজন সদস্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সদস্য গণমাধ্যমকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা পাওয়ার পর থেকে দিন-রাত কাজ করে সুরক্ষা উপকরণ তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে সরকারের কাছে উৎপাদিত সুরক্ষা উপকরণ পণ্যর একটি চালান প্রতিদিন প্রতিষ্ঠানটি সরবরাহ শুরু করেছে বলে জানান তিনি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের কাছে অনেক বেশি সুরক্ষা উপকরণ নেই এটা সত্য। এর মধ্যে যা আছে তা থেকে হাসপাতালগুলোয় কিছু উপকরণ দিয়ে রেখেছি। বাংলাদেশে শনাক্ত হওয়া পাঁচ রোগীর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, একটা রোগীর সেবা করতেই বেশ কিছুসংখ্যক সুরক্ষা উপকরণের ব্যবহার করতে হয়। তবে এখনই ঢাকার বাইরে সুরক্ষা উপকরণ মজুদের প্রয়োজনীয়তা কম বলে মনে করেন আইইডিসিআর পরিচালক।

x

Check Also

আজ রবিবারের দিনটি আপনার কেমন যাবে?

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : আজ ২৯ মার্চ ২০২০, রবিবার। নতুন সূর্যালোকে আজ রবিবারের দিনটি আপনার ...

Scroll Up