আজ শনিবার বিকেলে আর্মি স্টেডিয়ামে প্রিয় মেয়র আনিসুল হকের জানাজায় অংশ নেয় সর্বস্তরের হাজারো মানুষ।

চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন মেয়র আনিসুল হক

এমএনএ রিপোর্ট : রাজধানীর বনানী কবরস্থানে মা ও ছোট সন্তান শারাফের সঙ্গে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক।  আজ শনিবার বিকেল ৫টা ১২ মিনিটে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
এর আগে বিকেল সোয়া ৪টায় রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে আনিসুল হকের দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজায় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষের ঢল নামে। এর আগে সর্বস্তরের মানুষ সেখানে তাদের প্রিয় মেয়রের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানায়।
জানাজার আগে আনিসুল হকের একমাত্র ছেলে নাভিদুল হক বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন একজন শৌখিন মানুষ। তিনি সুখী ও হাসি-খুশি মানুষ ছিলেন। দেশবাসীর কাছে বাবার জন্য দোয়া চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাজের খাতিরে কেউ যদি আমার বাবার ব্যবহারে দুঃখ পেয়ে থাকেন তাহলে আপনারা তাকে ক্ষমা করে দিয়েন।’
আনিসুল হকের প্রথম নামাজে জানাজা শুক্রবার বাদ জুমা লন্ডনের রিজেন্ট পার্ক সেন্ট্রাল মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। তার কুলখানি আগামী ৬ ডিসেম্বর (বুধবার) বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে।
লন্ডন থেকে আজ শনিবার দুপুর ১টার দিকে আনিসুল হকের মরদেহ বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের (বিজি ০০২) ফ্লাইটটি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে। বিমানে তার মরদেহ নিয়ে আসেন স্ত্রী রুবানা হক ও ছেলে নাভিদুল হক।
বিমানবন্দরে পরিবারের পক্ষে ভাই সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক মরদেহ গ্রহণ করেন। এসময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সভাপতি শফিউল আলম মহিউদ্দিন ও বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানসহ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এরপর দুপুর সোয়া ১টার পর বিমানবন্দর থেকে আনিসুল হকের মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স বনানীর বাসায় পৌঁছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। এসময় শেখ হাসিনা আনিসুল হকের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাতও করেন।
ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপির নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ শত শত মানুষ আনিসুল হকের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানাতে তাঁর বাসায় ছুটে যান।
সেখান থেকে আনিসুল হকের মরদেহ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি বেলা সাড়ে তিনটায় আর্মি স্টেডিয়ামে পৌঁছায়। সেখানকার চারটি ফটক দিয়ে হাজারো মানুষ সারিবদ্ধভাবে স্টেডিয়ামে ঢোকেন। ছিল উপচে পড়া ভিড়। বাইরেও ছিল সাধারণ মানুষের ঢল।
আনিসুল হকের মরদেহ আর্মি স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয় বেলা সাড়ে ৩টায়। সেখানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের পক্ষে সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সরোয়ার হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদিন, স্পিকার শিরীন শারমিনের পক্ষে ক্যাপ্টেন মোশতাক আহমেদ, আওয়ামী লীগের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন এবং সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
এ ছাড়া বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই, বিকেএমইএসহ সর্বস্তরের মানুষ তাদের প্রিয় মেয়রের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানায়।বাদ আসর জানাজায় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষের ঢল নামে।
মেয়রের একান্ত সচিব আবরাউল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, মেয়রের মরদেহের সঙ্গে দেশে এসেছেন তাঁর স্ত্রী রুবানা হক, ছেলে নাভিদুল হক, দুই মেয়ে ওয়ামিক উমায়রা ও তানিশা ফারিয়াম্যান হক।
মেয়ের সন্তান জন্ম উপলক্ষে গত ২৯ জুলাই সপরিবারে লন্ডন যান আনিসুল হক। সেখানে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে লন্ডনের ন্যাশনাল নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার মস্তিস্কের প্রদাহজনিত রোগ ‘সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস’ শনাক্ত করেন চিকিৎসকরা। একপর্যায়ে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় গত ৩১ অক্টোবর তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। পরে থেরাপি দেওয়ার জন্য তাকে অন্য একটি হাসপাতালেও নেয়া হয়। এরইমধ্যে গত ২৬ নভেম্বর তার অবস্থার অবনতি হলে আবারও তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। এরপর তার ফুসফুসও আক্রান্ত হয়। গত বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ২৩ মিনিটে লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মেয়র আনিসুল হক।
এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি, ব্যবসায়ী ও একসময়কার জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব আনিসুল হক ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালে নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তবে তাঁর শৈশবের একটি বড় সময় কাটে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় নানার বাড়িতে।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে টিভি উপস্থাপক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন আনিসুল হক। তাঁর উপস্থাপনায় ‘আনন্দমেলা’ ও ‘অন্তরালে’ অনুষ্ঠান দুটি জনপ্রিয়তা পায়। তবে পরে টেলিভিশনের পর্দায় মানুষ তাঁকে বেশি দেখেছিল ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেই। ২০০৫-০৬ সালে বিজিএমইএর সভাপতির দায়িত্ব পালনের পর ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি হন তিনি। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল মেয়াদে সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন আনিসুল হক।
x

Check Also

বরেণ্য অধ্যাপক অজয় রায়ের জীবনাবসান

এমএনএ রিপোর্ট : একুশে পদকপ্রাপ্ত পদার্থ বিজ্ঞানের বরেণ্য অধ্যাপক অজয় রায় (৮৫) রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে ...

Scroll Up