চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

এমএনএ রিপোর্ট : টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমন্ত্রণে প্রথম পাঁচ দিনের সরকারি সফরে দেশটির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সফরসঙ্গীদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আজ সোমবার বিকাল সোয়া ৫টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইটে (ফ্লাইট বিজি-১৭২০) ঢাকা থেকে চীনের ডালিয়ানের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন।

বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, বেসামরিক বিমান পরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান এবং তিন বাহিনীর প্রধানসহ বেসামরিক ও সামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

স্থানীয় সময় রাত ১২টার পরে লিয়াওনিং প্রদেশের ডালিয়ানের ঝৌশুইজি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর মটর শোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রীকে ডালিয়ানের সাংগ্রি-লা হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। রাতে সেখানেই বিশ্রাম নেবেন শেখ হাসিনা।

ডালিয়ানে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের বার্ষিক সভায় অংশ নেওয়া ছাড়াও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমন্ত্রণে এ সফরকালে দেশটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান।

তার এই সফরে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি সই ছাড়াও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা হবে আশা করা হচ্ছে।

‘সামার দাভোস’ নামে পরিচিতি পাওয়া ডালিয়ানের এই সভায় বিভিন্ন দেশের সরকার, ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজ, শিক্ষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রের প্রায় দুই হাজার প্রতিনিধি অংশ নেবেন।

শেখ হাসিনার এই সফর তার গত মেয়াদের বেইজিং সফরের চেয়ে ভিন্ন হচ্ছে। ওই সফরে মূলত বিনিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হলেও এবার রোহিঙ্গা ইস্যুকে প্রাধান্য দেওয়া হবে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন জানিয়েছেন।

তিনি শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী ৪ জুলাই চীনের প্রধানমন্ত্রী লি খ্য ছিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি তুলবেন।

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিপীড়নের মুখে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসতে শুরু করার পর থেকেই এই সংকট সমাধানে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র চীনের শরণ নেওয়ার পরামর্শ আসছিল।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা মনে করছি, এ বিষয়ে মনোভাবের পরিবর্তন হয়েছে। এক সময় যারা এটার বিরোধিতা করেছে তারা আবার আমাদের বক্তব্যের কাছাকাছি এসেছে। তারা এখন আমাদের পক্ষে কথা বলছে।

“আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন বড় মাপের কূটনীতিক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার একটি বিশেষ জায়গা রয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উনার খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে, ৫ জুলাই তার সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী।”

ডালিয়ানে ‘ডব্লিইএফ অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্যা নিউ চ্যাম্পিয়ন্স-২০১৯’ বা সামার দাভোস-এ অংশ নেওয়া শেষে বুধবার একটি বিশেষ চীনা ফ্লাইটে বেইজিংয়ে যাবেন শেখ হাসিনা।

বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রীকে মটর শোভাযাত্রা সহকারে দিয়ায়োতাই স্টেট গেস্ট হাইজে নিয়ে যাওয়া হবে। চীনের রাজধানীতে সফরকালে তিনি এই হোটেলেই থাকবেন।

ওই দিন বিকেলে বেইজিংয়ে বাংলাদেশিদের দেয়া নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নেবেন।

পরের দিন বৃহস্পতিবার (৪ জুলাই) দুপুরে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বীরদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করার পর চীনের প্রধানমন্ত্রী লি খ্য ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন এবং গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

প্রধানমন্ত্রী গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত এক ভোজসভায় অংশ নিবেন। একই দিন বিকেলে শেখ হাসিনার সিসিপিআইটিতে চীনা ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একটি বিজনেস গোল টেবিল বৈঠকে অংশ নিবেন।

৫ জুলাই সকালে প্রধানমন্ত্রী চাইনিজ থিংক ট্যাংক ‘পাঙ্গোয়াল ইনস্টিটিউশন’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। চীনের বিভিন্ন কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরাও শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করবেন বলে তার সূচিতে রয়েছে।

চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান লি ঝাংসুর সঙ্গে বৈঠক হবে প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টিতে শি জিনপিংয়ের পর দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে তাকেই বিবেচনা হয়।

আগামী শুক্রবার (৫ জুলাই) বিকেলে শেখ হাসিনা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দিয়াওইয়ুতাই রাষ্ট্রীয় অতিথিশালায় বৈঠক করবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সন্মানে দেয়া চীনা প্রেসিডেন্টের ভোজ সভায়ও অংশ নেবেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে আটটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এসব প্রকল্পে মোট টাকা ঋণ নেওয়া হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন।

চুক্তিগুলো ও সমঝোতাগুলো হল-

১. ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ নিয়ে ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট।

২. ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ নিয়ে গভর্নমেন্ট কনসেশনাল লোন এগ্রিমেন্ট।

৩. ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ নিয়ে প্রিফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট লোন এগ্রিমেন্ট।

৪. পিজিসিবি প্রকল্পের আওতায় বিদ্যুৎ গ্রিড নেটওয়ার্ক জোরদার প্রকল্পের জন্য ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট।

৫. বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে অর্থনীতি ও কারিগরি সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি।

৬. ইনভেস্টমেন্ট কোঅপারেশন ওয়ার্কিং গ্রুপ প্রতিষ্ঠা নিয়ে সমঝোতা স্মারক।

৭. ইয়ালু ঝাংবো ও ব্রহ্মপুত্র নদীর তথ্য বিনিময় সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক ও তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা।

৮. সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পর্যটন কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা স্মারক।

২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল।

চীন সফর শেষে ৬ জুলাই বাংলাদেশের ফেরার কথা রয়েছে শেখ হাসিনার।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ ফারুক খাঁন, প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মূখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ , এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক।

x

Check Also

২১ আগস্ট নিয়ে রাজনীতি করছে আ.লীগ : রিজভী

এমএনএ রিপোর্ট  : একুশে আগস্ট বোমা হামলা মামলা নিয়ে আওয়ামী লীগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনীতি করছে বলে ...

Scroll Up