জন কেরির সফর : সম্পর্কের উষ্ণতাকে কাজে লাগান

22

জঙ্গিবাদ এখন দুনিয়াজুড়েই বড় সমস্যা। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক আরো জোরদার করা প্রয়োজন। এ ছাড়া বাংলাদেশে উন্নয়নের যে গতি সঞ্চারিত হয়েছে, তা বেগবান রাখতে স্থিতিশীলতার বিকল্প নেই। এমন একসময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির বাংলাদেশ সফর আমাদের আশান্বিত করেছে। সন্ত্রাস দমনে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তাও নিঃসন্দেহে দূরদর্শী। তাই এ মুহুর্তে দুই দেশের সম্পর্কের উষ্ণতাকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ৯ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত ঢাকা সফর নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১২ সালে হিলারি ক্লিনটনের সফরের পর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটা ছিল প্রথম বাংলাদেশ সফর। কেরি এমন এক সময় এ সফর করে গেলেন যখন বাংলাদেশ জঙ্গি তৎপরতা প্রতিরোধে বিশেষভাবে কাজ করে যাচ্ছে। গত ১ জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ হামলার ঘটনা দেশে জঙ্গি তৎপরতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ওই হামলার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোনে জন কেরি বলেছিলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ সফরে এসেও একই আগ্রহ প্রকাশ করেছেন কেরি। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে দ্বিধাবিভক্ত করতেই গুলশানে জঙ্গি হামলা চালানো হয়। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) প্রসঙ্গে কেরি বলেছেন, সরাসরি না হলেও আইএসের সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিদের যোগাযোগ আছে।

জঙ্গিবাদ এখন এক বৈশ্বিক সমস্যা। এ সংকট মোকাবেলায় অন্যান্য রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক ও কারিগরি সহায়তা আমাদের প্রয়োজন। তবে সহায়তার নামে কোনো রাষ্ট্রের সামরিক বা অন্য কোনো ধরনের উপস্থিতি, যা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর PM-SH-&-Jhon-Kerry-2শামিল, তা কাম্য নয়। আইএসের বিষয়ে বাংলাদেশ তার বক্তব্য বরাবরই স্পষ্ট করে এসেছে : এখানে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব জঙ্গি হামলা হয়েছে সেসব স্থানীয় জঙ্গিদের কাজ, তারা আইএসের নামে এসব হামলা চালিয়েছে, প্রকৃতপক্ষে দেশে আইএসের উপস্থিতি নেই। পশ্চিমা বিশ্বের কেউ কেউ বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতির অভিযোগ তুলে হস্তক্ষেপের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কী ধরনের সহায়তা দিতে চায়, তা নিয়ে মানুষের মনে এক ধরনের কৌতূহল রয়েছে। স্বভাবতই জন কেরির সফর ঘিরে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল জনগণের মধ্যে।

কেরির এ সফরে একটি নতুন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেছেন, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চায়। আমরা মনে করি, সার্বিক দিক খতিয়ে দেখেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এ অঞ্চলে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এ নিয়ে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের বিরোধে জড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। সেক্ষেত্রে এ দ্বন্দ্ব থেকে বাংলাদেশের দূরে থাকাই সমীচীন। তবে এটি ঠিক, বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশের নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন আমাদের সমুদ্র সম্পদের সর্বোত্তম আহরণের স্বার্থেই।

জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য সুবিধা বৃদ্ধিসহ কিছু বিষয়ে আমরা ওয়াশিংটনের তরফে ইতিবাচক পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে আসছি। জন কেরির এ সফরে দুই দেশের সম্পর্ক নিশ্চিতভাবেই আরো উষ্ণ হয়েছে। এর আলোকে দাবি আদায়ের কাজটি আরো সহজ হতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত এগোচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি আয় বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র কিছু ক্ষেত্রে সহযোগী হলে এই প্রবৃদ্ধি আরো বেগবান হবে। এখনো যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। রানা প্লাজা ধসের পর ২০১৩ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করে। জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার জন্য এখানকার কারখানাগুলোতে কর্মপরিবেশ উন্নয়নসহ কিছু শর্ত তারা জুড়ে দেয়। সেই শর্তগুলোর অনেকটাই আমরা পূরণ করেছি। তাই বাংলাদেশ যে আবার জিএসপি সুবিধা দাবি করছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক সাড়া দেওয়া উচিত। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার দীর্ঘদিনের দাবিটিও ঝুলে আছে। যুক্তরাষ্ট্র আন্তরিক হলে এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, তিনি অল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে আসার পরও বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে গিয়ে জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। জন কেরির এই সফর দুই দেশের সম্পর্কে যে উষ্ণতা সৃষ্টি করেছে, তা ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে হবে। আমরা আশা করব, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাবে।

-সম্পাদক

ট্যাগ : জিএসপি সুবিধা, যুক্তরাষ্ট্র, বংলাদেশ, জঙ্গিবাদ, জন কেরি, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, উষ্ণতা, সম্পর্কের উষ্ণতা