জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেট দিয়েছি : অর্থমন্ত্রী

এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৪ লাখ কোটি টাকার বাজেটকে নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেট হিসেবে অভিহিত করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আজ শুক্রবার অনুষ্ঠিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এ দাবি করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে তিনি এই বাজেট পেশ করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, মনে হয়েছে, এবার জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেট দিয়েছি। এ জন্য অনেক কষ্টও করেছি। প্রশাসনের অন্যরাও আমার মতোই কষ্ট করেছেন।

তার দাবি, এই বাজেটের সব জায়গাই ‘উজ্জ্বল’। কোথাও কোনো ‘দুর্বলতা নেই’।

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার পর্যালোচনা করা হবে। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার প্রতি বছর একবার পর্যালোচনা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকে সুদের হার ৭ শতাংশ, আর সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১ শতাংশ। এটি অসম্ভব। এত পার্থক্য থাকা উচিত নয়।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি বক্তৃতাতেই বলেছি যে প্রত্যেকটা বাজেটই উচ্চাভিলাষী। আগেরবারের চেয়ে পরেরবার কম হয়েছে, এমন একটি বাজেটও নেই। এ কাজটা আমরা সার্থকভাবে করেছি। এভাবেই দেশটাকে উন্নততর জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।

ব্যাংক হিসাবধারীদের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, এক লাখ টাকা থাকলে ভারমুক্ত থাকা যাবে। এর বেশি যাঁদের টাকা, তাঁদের আবগারি শুল্ক দিতে হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, যারা একলাখ টাকা ব্যাংকে রাখতে পারেন, তারা আমাদের দেশের তুলনায় সম্পদশালী। তারা বাড়তি ভারটা বহন করতে পারবেন, সমস্যা হবে না।

বছরের যে কোনো সময় ব্যাংক হিসেবে এক লাখ টাকার বেশি লেনদেনে আবগারি শুল্ক বিদ্যমান ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে।

তবে শুল্কমুক্তসীমা ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ আগে যেখানে বছরের যে কোনো সময় ২০ হাজার টাকা লেনদেনে শুল্ক দিতে হত, এখন ১ লাখ টাকার নিচে তা আর দিতে হবে না।

আবগারি শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্তে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে নিরুৎসাহিত হবে বলে যে সমালোচনা রয়েছে তা সংবাদ সম্মেলনে নাকচ করে দেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, যাদের টাকা এক লাখের উপরে থাকবে কেবল তাদের উপরই একটা কর ধার্য্য করেছি। বড়লোকের ক্ষেত্রে আমাদের করটা ছিল, কিন্তু যারা মিড লেভেলে ছিল তারা এর অন্তর্ভুক্ত ছিল না। একলাখ টাকার নিচে যারা আছেন, তাদের ভার থেকে মুক্ত করাই যথেষ্ট।

নতুন বাজেটে বছরের যে কোনো সময় ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনে আবগারি শুল্ক ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৮০০ টাকা, ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ টাকার বদলে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ৭ হাজার ৫০০ টাকার বদলে ১২ হাজার টাকা এবং ৫ কোটি টাকার বেশি লেনদেনে ১৫ হাজার টাকার বদলে ২৫ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।

তবে গত বৃহস্পতিবার বাজেট বক্তৃতার পর ব্যাংক লেনদেনে আবগারি শুল্ক আরোপের ভিন্ন হার উল্লেখ করে এনবিআর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করলে সংশয়ের সৃষ্টি হয়।

সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর চেয়ারম্যান বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত শুল্ক হারই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

১৫ শতাংশ ভ্যাটেও দাম বাড়বে না

নতুন অর্থবছরে বাজেটের খরচ মেটাতে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা জনগণের কাছ থেকে কর ও শুল্ক হিসেবে আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা আসবে মূল্য সংযোজন কর থেকে।

জুলাইয়ের শুরু থেকে সবক্ষেত্রে অভিন্ন হারে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা হলেও বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে না বলে দাবি করেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ছোট ব্যবসায়ীদের কথা বিবেচনা করে ভ্যাট অব্যাহতির সীমা ৩০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৬ লাখ টাকা করা হয়েছে। টার্নওভার করের সীমা ৮০ লাখ টাকা থেকে দেড় কোটি টাকা করা হয়েছে।

তার মানে আগে যারা ভ্যাট দিতেন তাদের অনেকেই ভ্যাট দেবেন না, ৩০ থেকে ৩৬ লাখ হওয়ার ফলে। আগে যারা বিভিন্ন হারে ভ্যাট দিতেন, ৮০ লাখের উপরে যারা ছিলেন তারা এখন ৪ শতাংশ ট্যাক্স দেবেন।

এছাড়া অনেক পণ্যে ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়েছে জানিয়ে মুহিত বলেন, এই কারণে আমি বলেছি দাম বাড়বে না। যারা ক্ষুদ্র ও মধ্যম সারির ব্যবসায়ী, তারা এর মধ্যে পড়ে যাবে।

গত বৃহস্পতিবার সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট অব্যাহতির আওতায় বিদ্যমান ৫৩৬টি পণ্য ও সেবার সংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় ১ হাজার ৪৩টি পণ্য ও সেবায় ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব রেখেছেন অর্থমন্ত্রী।

এর মধ্যে চাল, ডাল, মুড়ি, চিড়া, চিনি ও আঁখের গুড়, মাছ, মাংস, শাক-সবজি, তরল দুধ, প্রাকৃতিক মধু, বার্লি, ভুট্টা, গম ও ভুট্টার তৈরি সুজি, লবণসহ প্রায় ৫৪৯টি মৌলিক খাদ্যপণ্য রয়েছে।

এছাড়া ৯৩ ধরনের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং গণ-পরিবহন সেবা, জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এর সঙ্গে কৃষি, গবাদি পশু ও মৎস্য চাষ খাত সংশ্লিষ্ট প্রায় ৪০৪টি ক্ষেত্রে এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অবাণিজ্যিক কার্যক্রম, অলাভজনক সাংস্কৃতিক সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বিদ্যমান মূল্য কিছুটা হ্রাস পাবে এবং কোনো অবস্থাতেই কোনো পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে না।

অর্থমন্ত্রী ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেটে দুই লাখ ৮৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ঠিক করেছেন। তাতে আয়-ব্যয়ে ঘাটতি থাকছে এক লাখ ১২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা বিদেশি উৎস থেকে পাওয়ার আশা করেছেন মুহিত।

কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল মান্নানকে পাশে নিয়ে প্রশ্নোত্তর-নির্ভর সংবাদ সম্মেলনটি করেন অর্থমন্ত্রী।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান বলেন, ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনে যে ১৫০ টাকা আবগারি শুল্ক ছিল নতুন বাজেটে তা মওকুফ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমান, মুখ্যসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান, পরিকল্পনা কমিশনের সচিব জিয়াউল ইসলাম ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ভারপ্রাপ্ত সচিব কাজী শফিকুল আজম ছাড়াও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

x

Check Also

আমিরাতের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী

এমএনএ রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুবাই এয়ার শো-২০১৯ এবং আরো কিছু অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ...

Scroll Up