ঢাবির চার শিক্ষার্থীকে রাতভর নির্যাতন করল ছাত্রলীগ

এমএনএ ক্যাম্পাস রিপোর্ট : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার চার মাস না পেরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের চার শিক্ষার্থীকে আবরারের স্টাইলে রাতভর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। নির্যাতনের পর আহত শিক্ষার্থীদের হল প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও পুলিশের মাধ্যমে শাহবাগ থানায় নেয়া হয়। পরে শিক্ষার্থীদের রাতের বেলায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায় পুলিশ।

শিবির সন্দেহে ধরে ছাত্রলীগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করলেও কোনো সংশ্লিষ্টতা না পেয়ে আজ বুধবার (২২ জানুয়ারি) তাদের ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।

গতকাল মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে এ ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাবির হলে ফের এ ধরনের শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা ঘটলো।

নির্যাতনের শিকার চার শিক্ষার্থী হলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মুকিম চৌধুরী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সানওয়ার হোসেন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজ উদ্দীন ও একই বর্ষের আরবী বিভাগের শিক্ষার্থী আফসার উদ্দীন।

ক্যাম্পাস সূত্র জানা যায়, জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসাইন ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আমির হামজা রাত সাড়ে ১১টায় শিবির সন্দেহে তারা দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুকিমকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য গেস্টরুমে ডেকে আনে। শিবিরের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন অভিযোগে তাকে মানসিকভাবে চাপ দিতে থাকে। স্বীকার না করায় মারধর করা হয়। এ সময় তার মোবাইল ম্যাসেঞ্জারে আরও তিন বন্ধু আফসার, সানওয়ার, মিনহাজের সঙ্গে ‘যোগাযোগ তালিকায়’ নাম থাকায় তাদেরও ডেকে গেস্টরুমে আনা হয়।

এক পর্যায়ে তাদেরকে হলের বর্ধিত ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় হল শাখা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমির হামজা, হল সংসদের সহ-সভাপতি সাইফুল্লাহ আব্বাসী অনন্তসহ বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা এসে রড, লাঠি দিয়ে মারধর করে। মারধরে গুরুতর আহত হন ওই চার শিক্ষার্থী।

ভুক্তোভুগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে, রাত ১১টার দিকে জহুরুল হক হলের গেস্টরুমে ছাত্রলীগের নিয়মিত গেস্টরুম চলছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মুকিম চৌধুরীকে শিবির সন্দেহে গেস্টরুমে ডাকা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তাদের জহুরুল হক হল সংসদের সহ-সভাপতি সাইফুল্লাহ আব্বাসী অনন্ত ও হল শাখা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন আলম চড় থাপ্পড় মারতে থাকেন। এ সময় লাঠি, রড, স্টাম্প দিয়ে বেধড়ক মারধর করতে থাকেন এবং কিল-ঘুষি মারেন হল সাবেক সহ-সভাপতি কামাল উদ্দিন রানা ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমির হামজা।

পরে তার ফোন কললিস্ট দেখে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সানওয়ার হোসেনকে গেস্টরুমে আনা হয়। সেখানে তাকেও বেধড়ক মারধর করেন ছাত্রলীগের নেতারা। মারধর সহ্য করতে না পেরে উভয়ই মেঝেতে শুয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজ উদ্দীন এবং একই বর্ষের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী আফসার উদ্দীনকে ধরে গেস্টরুমে আনা হয়। সেখানে রাত ২টা পর্যন্ত তাদের ওপর নির্যাতন করেন ছাত্রলীগ নেতারা। মারধর শেষে রাত ২টার পর তাদের হলের আবাসিক শিক্ষক বিল্লাল আহমেদের মাধ্যমে রাত ১১টার দিকে প্রক্টরিয়াল টিম ও পুলিশের হাতে ওই শিক্ষার্থীদের তুলে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ আহত অবস্থায় তাদের শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়।

এর মধ্যে গুরুতর আহত হওয়ায় মুকিম ও সানওয়ারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে ঘটনার বিষয়ে হল সংসদের সহ-সভাপতি অভিযুক্ত সাইফুল্লাহ আব্বাসী অনন্ত বলেন, তাদের শিবিরের প্রমাণ পেয়ে প্রক্টরিয়াল টিমের মাধ্যমে পুলিশে দেওয়া হয়েছে। মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

তার দাবি, ওই চার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে শিবিরের দুইটি বই উদ্ধার করেছি। যা পুলিশকে দেওয়া হয়েছে।

তবে শিবিরের কী বই? এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কোনো বইয়ের নাম বলতে পারেননি ছাত্রলীগ নেতা অনন্ত।

এদিকে জিজ্ঞাসাবাদে ওই চার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় আজ বুধবার (২২ জানুয়ারি) দুপুর দেড়টার দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রাব্বানী বলেন, পুলিশকে বলে দেওয়া হয়েছে যে, কোনো প্রমাণ না পেলে শিক্ষার্থীদের থানায় না রাখতে।

নির্যাতনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা হলের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে যদি কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করে তবে আমরাও বিষয়টি দেখবো।’

অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন ও আমির হামজা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের অনুসারী।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জয় বলেন, যে চারজন শিক্ষার্থীর কথা বলা হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে শিবির করার অভিযোগ রয়েছে। এজন্য পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

‘তবে আমি যতটুকু জানি তাদের মারধর করা হয়নি। যদি কেউ মারধর করে তবে এটা সমর্থনযোগ্য নয়,’ যোগ করেন তিনি।

x

Check Also

জেনে নিন চলতি সপ্তাহটি আপনার কি রকম যাবে?

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : চলতি সপ্তাহের ফেব্রুয়ারি ২০২০ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত এই সাত দিনের রাশিফল ...

Scroll Up