তবুও বিনিয়োগের পালে হাওয়া লাগছে না

এমএনএ বিজন্সে ডেস্ক : টানা এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল। এ সময়ে বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন হয়নি। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের সুদহারও ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বেড়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরকারি বিনিয়োগও ইতিবাচক। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যও কমেছে। এদিকে সম্প্রতি সরকার ফার্নেস অয়েলের দাম কমিয়েছে। ডিজেল, কেরোসিনসহ জ্বালানি তেলের দাম ধাপে ধাপে কমানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। অর্থনীতির ভাষায় বিনিয়োগের জন্য এসব বিষয় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে থাকে। অনুঘটকগুলো ইতিবাচক হলেও বিনিয়োগের পালে হাওয়া লাগছে না।

ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য কমছে না। এখনও ব্যাংকিং খাতে এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে।

এরমধ্যে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা অলস তারল্য। যদিও উদ্বৃত্ত ও অলস তারল্যের প্রকৃতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আলাদা ব্যাখ্যা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদে ও স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৩০ কোটি ডলারের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করলেও সেখানে আবেদন তেমন একটা পড়ছে না।

অগ্রণী ব্যাংকের কাছে উৎপাদনে যেতে প্রস্তুত এরকম ১০টি শিল্প কারখানার আবেদন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় ব্যাংক ঋণ ছাড় করতে পারছে না বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান জায়েদ বখত।

তিনি বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুদই একমাত্র নিয়ামক নয়। বিনিয়োগের পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও জমির সংকট রয়েছে। এসব বিষয় উদ্যোক্তার অনুকূলে হলেই বিনিয়োগ চাহিদা বাড়বে।

Invest

একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, সুদহার কমানোর পরও শিল্প খাতে নতুন ঋণের আবেদন বাড়েনি।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান বলেন, সুদহার কমলেও ঋণের চাহিদা বাড়েনি। বিনিয়োগ পরিবেশের অভাবে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে যাচ্ছে না।

গত ফেব্রুয়ারির শুরুতে একযোগে ঋণের সুদ হার কমায় সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিকসহ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। শিল্প ও মেয়াদি ঋণের ২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ হার কমায় এই ব্যাংকগুলো।

এসব ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের মোট আমানত ও ঋণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা তার বেশি সংগ্রহ ও বিতরণ হয়ে থাকে। এর পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোও সুদহার কমিয়েছে। ফেব্রুয়ারি শেষে ব্যাংকিং খাতে ঋণের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ।

যা গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১২ দশমিক ২৩ শতাংশ। এতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধিতে তার কোনো প্রভাব পড়েনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলো চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ৩০ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা শিল্পে মেয়াদি ঋণ বিতরণ করেছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩১ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। এদিকে কৃষি ঋণও কমেছে। তবে এ সময়ে এসএমই খাতে ঋণ বেড়েছে।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি হোসেন খালেদ বলেন, সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে এটা ঠিক, কিন্তু নতুন সংযোগ পাওয়া এখনও কঠিন। আবার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহেও সমস্যা রয়েছে। এদিকে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে। নতুন গ্যাস সংযোগ বলতে গেলে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সুদহার কমলেও ঋণ চাহিদা বাড়ছে না।

বিবিএস সম্প্রতি চলতি অর্থবছরের জিডিপির যে হিসাব প্রকাশ করেছে, সেখানে জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের অংশ কমেছে বলে উল্লেখ করেছে।

সরকারের পরিসংখ্যান বিষয়ক এ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ হয়েছে জিডিপির ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। যা আগের ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ২২ দশমিক ০৭ শতাংশ। তবে সরকারি বিনিয়োগ গত অর্থবছরের চেয়ে বেড়েছে।

বিনিয়োগ কম হওয়ার কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, ২০১২ সালের পর থেকে বেসরকারি বিনিয়োগে একটি স্থবিরতা রয়েছে।

Invest-2

এ সময়ে সামাজিক উন্নয়ন বা ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থানের বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাব, অবকাঠামো দুর্বলতা রয়ে গেছে। যে কারণে সুদহার কমলেও তা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারছে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, বিনিয়োগ না বাড়ার মূল কারণ হচ্ছে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ খুব একটা অনুকূল না। এটা শুধু এই বছরে নয়, গত কয়েক বছর ধরেই চলছে। যে কথা বিবিএসও তাদের জিডিপির রিপোর্টে বলেছে।

এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক ও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্টেও এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অবকাঠামো দুর্বলতা, জমির স্বল্পতা, প্রশাসনের অদক্ষতা, দুর্নীতি, পরিবহন, গ্যাসের সমস্যা রয়েই গেছে। বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়লেও তার কোয়ালিটি সাপ্লাই নেই। রাজনৈতিক অঙ্গনেও চাপা অস্থিরতা আছে। এগুলোর সুরাহা না হলে বিনিয়োগ চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, শুধু ঋণের সুদহার কমলে বিনিয়োগ বাড়বে বিষয়টি ঠিক না। বিনিয়োগের জন্য অবকাঠামো, জ্বালানি, সড়ক, আইন-শৃঙ্খলাসহ সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের বিষয় রয়েছে। সেই বিবেচনায় সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ ব্যবসাবান্ধব নয় বলে বিভিন্ন সংস্থা বলছে।

এর পাশাপাশি বিনিয়োগ চাহিদাও থাকতে হবে। ব্যাংকগুলো গতানুগতিক ঋণ দেয়। তারা বড় ঋণগ্রহিতা খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু নতুন বিনিয়োগকারী তৈরি করার উদ্যোগ বিশেষ দেখা যায় না।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ঢাকা চেম্বার বলেছে, কারখানাগুলো মানসম্মত বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাচ্ছে না। গ্যাসের প্রেশার (চাপ) ১৫ পিএসআই হওয়ার কথা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে ২ থেকে ৪ পিএসআই। অনুষ্ঠানে জানানো হয় তিতাস, বাখরাবাদ, কর্ণফুলী, পিডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে দুই হাজারের বেশি শিল্প কারখানার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের আবেদন পড়ে রয়েছে।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ নীতিমালা, সংযোগের বর্তমান পরিস্থিতি ও অনিষ্পন্ন আবেদনের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবেদন করে সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে ২ হাজার ২২৩ শিল্প কারখানা।

x

Check Also

প্রাইজ বন্ডের প্রথম পুরস্কার ০৬১৭৮৯৮

এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : ১০০ টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ডের সর্বশেষ ৯৬তম ‘ড্র’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ছয় লাখ ...

Scroll Up