তুঘলকি কারবার : বাজেট পাসের আগেই কার্যকর!

এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : প্রস্তাবিত বাজেট এখনও সংসদে পাস হয়নি। অথচ অর্থমন্ত্রী সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার পরপরই কিছু অংশ কার্যকর করা হয়েছে। যাকে অনেকেই তুঘলকি কারবার হিসেবে সমালোচনা করছেন।

এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন সংসদ সদস্যদের অনেকে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরাও দীর্ঘদিন থেকে এই অন্যায় প্রক্রিয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ বলেন, বাজেট পাস হওয়ার আগে এভাবে প্রস্তাব কার্যকর করার আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। এটি সংবিধানপরিপন্থী।

প্রসঙ্গত ২ জুন সংসদে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। নিয়মানুযায়ী চলতি মাসের বাকি সময়ে এই প্রস্তাবনা নিয়ে সংসদে আলোচনা হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সংশোধন বিয়োজন হয়ে এ বাজেট পাস হবে ৩০ Budget-Newsজুন। এরপর ১ জুলাই থেকে বাজেট কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু প্রথাগতভাবে ২ জুন থেকেই শুল্কের এবং সম্পূরক শুল্কের বাজেট কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ সংসদে বাজেট পাসের আগেই কার্যকর! তাই অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই শুল্ক বাজেট কার্যকর করার আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে?

সংসদ সদস্যদের মতে, শুল্ক বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হলে সংসদে অনুমোদনের জন্য উত্থাপনের দরকার কী? অর্থমন্ত্রী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডই (এনবিআর) এক্ষেত্রে সর্বেসর্বা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুল্ক বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করার ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বঞ্চিত হচ্ছেন বাজেট পাস হওয়ার আগেই বিদ্যমান সুবিধা পাওয়া থেকে। আয়কর ও ভ্যাটের বাজেট পর্যালোচনা করে ব্যবসার কর্মপরিকল্পনা নিতে পারলেও শুল্কের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না।

সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক আলী আশরাফ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট এখনও পাস হয়নি। ২ জুন অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করেছেন মাত্র। আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে এটি পাস হবে আগামী ৩০ জুন। কিন্তু এর আগেই যারা বাজেট বাস্তবায়ন করার কাজটি শুরু করে তারা অন্যায় করেছেন। এটি আইন ও সংবিধানবিরোধী।

জানা গেছে, প্রতি বছর অর্থবিলের মাধ্যমে বাজেট ঘোষণার সময় আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট আইনের পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন Budget-2016আনা হয়। এই অর্থবিলের ঘোষণা অংশে বলা থাকে অর্থবিলের কোন কোন দফা অবিলম্বে অর্থাৎ তৎক্ষণাৎ কার্যকর হবে। প্রভিশনাল কালেকশন অব ট্যাক্সেস অ্যাক্ট, ১৯৩১-এর ধারা ৩-এর ক্ষমতাবলে অর্থবিলের দফাগুলো কার্যকর এবং প্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা দেয়া হয়। আর কোন দফা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে তাও উল্লেখ থাকে। রেওয়াজ অনুযায়ী, প্রতি বছরই এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইর সাবেক প্রথম সহসভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শুল্ক বাজেট কার্যকরের ফলে ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। কর্মপরিকল্পনা নিয়ে ব্যবসায়ীদের পুরো জুন মাস অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় দেখা গেছে, বাজেট ঘোষণার পর অতিরিক্ত শুল্ক দিয়ে পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। কিন্তু বাজেট পাসের আগে সেটিকে কমিয়ে আনা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যবসার ক্ষতি হয় এবং অতিরিক্ত কর ফেরত পাওয়া যায় না। আয়কর ও ভ্যাটের মতো শুল্কে বাজেট ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।

রফতানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বাজেট ঘোষণার পর পণ্য আমদানি-রফতানি কার্যক্রম স্থবির থাকে। কারণ শুল্কের বাজেট ঘোষণা পর কার্যকর হয়। এ সময় আমদানি করলে বাজেট পাসের আগে পণ্যের শুল্ক কমে গেলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে- এই শংকায় জুন মাসজুড়ে আমদানি- রফতানিকারকরা এ সংক্রান্ত কার্যক্রম এক রকম বন্ধ রাখে। Personal-Taxএই সংকট নিরসনে তিনিও শুল্ক বাজেট ১ জুলাই থেকে কার্যকরের দাবি জানান।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের একাংশের সভাপতি ও সংসদ সদস্য মাঈনুদ্দিন খান বাদল বলেন, বাজেট পাস না হওয়া পর্যন্ত এটি একটি প্রস্তাবনা। পাস হওয়ার পর এটি আইনে পরিণত হয়। কিন্তু পাস হওয়ার আগেই কেউ যদি বাজেট বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন তাহলে যে কেউ এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। কারণ এটি আইনসম্মত নয়। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে আমরা এ ইস্যুতে অর্থমন্ত্রীর কাছে ব্যাখ্যা চাইব।

জাসদের এই অংশের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, পাস হওয়ার আগেই বাজেট বাস্তবায়ন ঠিক নয়। একটি অসাধু সংঘবদ্ধ চক্র প্রতি বছরই এই সুযোগটি নেয়, যা অন্যায়।

ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, পাস হওয়ার আগেই বাজেট বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ বেআইনি। এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে আমরা অর্থমন্ত্রীকে বলব, যারা এটি করছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।

তিনি আরও বলেন, ২ জুন অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশ করেছেন। ৩০ জুন এটি পাস হবে। এর আগে সংসদ সদস্যরা এ বাজেট নিয়ে আলোচনা করবেন। সবাই যার যার অবস্থান থেকে মতামত দেবেন। পরে কিছু সংযোজন সংশোধন করে সংসদে অর্থমন্ত্রী বাজেট Budgetপাসের প্রস্তাব দেবেন। এরপর সংসদ সদস্যদের ভোটে বাজেট পাস হবে। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পাস হবে অর্থবিল, যা একটি আইনে পরিণত হবে। যার আলোকে সরকার আয়-ব্যয় নির্বাহ করবে একটি বছর।

ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, যদি পাস হওয়ার আগেই কেউ বাজেট বাস্তবায়ন শুরু করেন-তাহলে এই আলোচনার প্রয়োজন কি? এতকিছুরই বা দরকার কি?

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, পাস হওয়ার আগে বাজেট বাস্তবায়নের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই, যা সম্পূর্ণ অন্যায়, অনৈতিক এবং সংবিধানপরিপন্থী।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ডা. রুস্তুম আলী ফরাজি বলেন, সংসদে পাসই হয়নি যে বাজেট তা কিভাবে বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যায়- আমার কাছে বোধগম্য নয়। অর্থমন্ত্রী কি করছেন? তিনি কি এসব দেখেন না? পাস হওয়ার আগেই যদি বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যায়, তাহলে এ নিয়ে জাতীয় সংসদে আর আলোচনার প্রয়োজন কি?

x

Check Also

টাকার অবমূল্যায়ন শুরু করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

এমএনএ রিপোর্ট : দীর্ঘদিন বিনিময়মূল্য ধরে রাখার পর মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন শুরু করেছে ...

Scroll Up