ত্রিপল সেঞ্চুরি পেরোল পেঁয়াজের কেজি!

এমএনএ রিপোর্ট : কোনো আশ্বাস, অভিযান বা হুঁশিয়ারিতেও এখন আর কোন কাজ হচ্ছে না। পেঁয়াজের দাম হু হু করে বেড়েই চলছে। একদিনের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১০০ টাকারও বেশি। আজ শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ভেদে কোথাও ৩০০ টাকা থেকে ৩২০ টাকা পর্যন্ত পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে। অতিরিক্ত দামের কারণে ক্রেতারা অসহায় হয়ে চাহিদার চেয়ে পরিমানে কম কিনে সংসার চালিয়ে নিচ্ছে। পরিস্থিতি এমন যে ডিমের চেয়ে এখন পেঁয়াজের হালির দাম অনেক বেশি।

গতকাল শুক্রবার গড় দাম ছিল প্রতি কেজি ২৫০ টাকা। গত বৃহস্পতিবার যে পেঁয়াজের কেজি ছিল ২০০ টাকা। রাত পোহাতে কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা। আবার রাত পোহাতে আরও ৫০ টাকা বেড়ে আজ ৩০০ টাকা।

ভারত সফররত বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম ইন্দোর টেস্টে দুই ইনিংসে মিলিয়ে ২২ জন খেলোয়াড়ে ত্রিপল সেঞ্চুরি করতে না পারলেও পেঁয়াজের কেজি আজ ঠিকই ত্রিপল সেঞ্চুরি পেরিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, এবার সরকার নিজেই পেঁয়াজ আমদানি করবে। পাশাপাশি মন্ত্রীদের আশ্বাস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও চলছে। তবুও দাম বেড়েই চলেছে। যদিও রাজধানীর বাজারে পেঁয়াজের অভাব নেই। বিশ্ববাজারের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশেই পেঁয়াজের দাম সবচেয়ে বেশি। নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষও ক্ষুব্ধ।

এই অবস্থায় নিয়ন্ত্রণহীন এই বাজার স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গতকাল শুক্রবার উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে উড়োজাহাজে করে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। গণমাধ্যমকে গতকাল এ তথ্য নিশ্চিত করেন বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। কারণ, সমুদ্রপথে পেঁয়াজ আমদানিতে বেশি সময় লাগে। এ কারণে আকাশপথে আমদানির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি নিশ্চিত করে বলেন, উড়োজাহাজে আসা পেঁয়াজ আগামী সোমবার দেশে আসবে। তিনি বলেন, সরকারের উদ্যোগে কার্গো বিমানে তুরস্ক থেকে আগামী এক মাস ধরে পেঁয়াজ আনবে টিসিবি। এছাড়া মিসর থেকে নিয়মিত এ পণ্যটি আমদানি করবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ। সচিব আরও জানান, রাশিয়াসহ সিআইএস কান্ট্রি, চীন, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, ইউক্রেন ও তাজাকিস্তানের বাজার থেকে সুবিধা মতো অন্য ব্যবসায়ীরাও পেঁয়াজ আমদানি করবেন।

দাম বৃদ্ধিতে দায় কার : গত চার মাস ধরে পেঁয়াজ সংকট চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে বড় ব্যবসায়ীদের অনেক আগেই পেঁয়াজ আমদানির জন্য অনুরোধ করা হয়। আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। তাদের অসহযোগিতায় বাজারে এমন পরিস্থিতি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্নেষকরা। বড় গ্রুপের ব্যবসায়ীরা অজুহাত দিচ্ছেন, সমুদ্রপথে পেঁয়াজ আমদানিতে সময় লাগে। দ্রুত আনা সম্ভব নয়। অন্যান্য পণ্যের মতো পেঁয়াজ সাধারণ কনটেইনারে আনা যায় না। হিমায়িত কনটেইনারে আনার ক্ষেত্রে অনেক জটিলতার কারণে দেরি হয়। সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা গণমাধ্যম কর্মীদেরকে বলেন, হিমায়িত কনটেইনার পেতে সময় লেগেছে। এ কারণে আমদানি করা পেঁয়াজ এখনও আনা সম্ভব হয়নি। তবে এ মাসের মধ্যে দেশে আসবে।

শ্যামবাজারের পপুলার বাণিজ্যালয়ের পাইকারি ব্যবসায়ী রতন সাহা গণমাধ্যম কর্মীদেরকে বলেন, বড় গ্রুপের আমদানির খবরে নিয়মিত আমদানিকারকরা আমদানি থেকে বিরত থাকেন। কারণ লোকসানে পড়ার শঙ্কা ছিল। এদিকে বড় শিল্প গ্রুপও বাজারে পেঁয়াজ আনতে পারেনি। ফলে এই সংকট এখন মহাসংকটে রূপ নিয়েছে। এদিকে দু’সপ্তাহ পর দেশীয় ক্ষেতের পেঁয়াজ বাজারে ওঠার কথা। ভারতও যে কোনো সময় রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে পারে। তখন দাম অবশ্যই কমবে। এটাও মাথায় রাখছেন আমদানিকারকরা। পেঁয়াজ নিয়ে লোকসানে পড়বেন না- এমন কোনো নিশ্চিত আশ্বাসও পাননি বড় আমদানিকারকরা। এসব দ্বিধা-সংশয়ও এ সংকটকে দীর্ঘায়িত করেছে।

চড়া দামে ভোক্তার ক্ষোভ : মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে ক্রেতা মো. মাহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজারে পেঁয়াজ থাকতে এমন দুর্দিন দেখতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছে মতো দামে বিক্রি করছেন। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রতিদিনই এখন ৫০ টাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ষাটোর্ধ্ব এই ক্রেতা আরও বলেন, জীবনেও এমন দামে পেঁয়াজ কেনেননি তিনি। উত্তর পীররেরবাগ কাঁচাবাজারে পেঁয়াজ কিনতে এসেছিলেন রিকশাচালক মিলন মিয়া। তিনি পেঁয়াজের দাম শুনে না কিনে ফিরে যান। তিনি বলেন, এক কেজি পেঁয়াজের দামে ৬ কেজির বেশি চিকন চাল কেনা সম্ভব।

নিয়ন্ত্রণহীন বাজার : রাজধানীর খুচরা বাজারে গতকাল দেশি ভালোমানের পেঁয়াজ ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায় বিক্রি হয়। সেই পেঁয়াজ আজ ৩০০ টাকা থেকে ৩২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি কিং ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ ২৮০ টাকা। আমদানি করা চীন, মিসর ও তুরস্কের পেঁয়াজ ২৫০ থেকে ২৭০ টাকা। পেঁয়াজের এই চড়া দাম এখন সারাদেশে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, গতকাল নারায়ণগঞ্জের বাজারে দাম ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। দিনাজপুরে আড়াইশ’ থেকে ২৬০ টাকা। হিলিতে গতকাল পেঁয়াজের কলি বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। বগুড়ার আদমদীঘি ও গাইবান্ধায় পেঁয়াজের কেজি ২৫০ থেকে ২৭০ টাকা।

পাইকারি আড়তে ভারতের পেঁয়াজ না থাকলেও দেশি ও আমদানি করা মিয়ানমার, মিসর ও তুরস্কের পেঁয়াজের পর্যাপ্ত সরবরাহ দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর বড় বড় পাইকারি আড়ত পুরান ঢাকার শ্যামবাজার, কারওয়ান বাজারসহ অন্যান্য বাজারে আড়তে আজ সকালে দেশি পেঁয়াজ ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা এবং আমদানি করা বড় পেঁয়াজ ২২০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি। এমনকি আজ দুপুরে পাইকারি আড়তে এই দর ২৮০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পরে বিকেলে তা ২৫০ টাকায় নেমে আসে। গত তিন দিনে পেঁয়াজের কেজিতে দাম বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। দেশে পেঁয়াজের বড় মোকাম ফরিদপুর ও পাবনার আড়তেও পেঁয়াজের দাম হু হু করে বেড়েই চলেছে।

চালান আসছে : বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আফগানিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জরুরিভিত্তিতে কার্গো উড়োজাহাজে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ বাজারে সরবরাহ হবে। এছাড়া সমুদ্রপথে আমদানি করা পেঁয়াজও আসছে। শিগগিরই পেঁয়াজের বড় চালান দেশে এসে পৌঁছাবে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে তৎপরতা : দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে তৎপর রয়েছে। কেউ পেঁয়াজ অবৈধ মজুদ করলে, কারসাজি করে অতি মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পেঁয়াজ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছে। নিয়মিত আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পেঁয়াজ আমদানি বৃদ্ধি এবং নৈতিকতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার অনুরোধ করা হয়েছে। প্রতিদিনই অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পেঁয়াজ আমদানি সহজ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

আগামী সপ্তাহে দেশজুড়ে টিসিবির বিক্রি শুরু : দেশে পেঁয়াজের দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে ট্রাকে বিক্রি করছে। রাজধানী ঢাকার ৩৫টি স্থানে ট্রাক থেকে প্রত্যেক ক্রেতা প্রতি দিন ১ কেজি পেঁয়াজ ৪৫ টাকায় কিনতে পারছেন। এই স্বল্প মূল্যের পেঁয়াজ সারাদেশে বিক্রি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে টিসিবি। উড়োজাহাজে আগামীকাল পেঁয়াজ এলে সোমবার থেকে বিক্রি হতে পারে বলে জানান টিসিবির কর্মকর্তারা।

অভিযানেও দাম বাড়ছে : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ৪টি টিম প্রতিদিন ঢাকা শহরের বাজারগুলো মনিটর অব্যাহত রেখেছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর ও প্রতিটি জেলা প্রশাসন জেলার বাজারগুলোতে মনিটর জোরদার করেছে। ঢাকার শ্যামবাজার ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মতো বড় পাইকারি বাজারগুলোতে অভিযান চলমান। মন্ত্রণালয়ের ১০টি টিম সারাদেশের পাইকারি মোকামে মনিটর করছে। এ অভিযানে নিয়মিত জরিমানা করা হচ্ছে। এরপরেও পেঁয়াজের দর বৃদ্ধি থেমে নেই।

গতকাল রাজধানীর শ্যামবাজার, মিরপুর-১ ও ২নং বাজার, কাঁঠালবাগান, মোহাম্মদপুর টাউনহল ও কৃষি মার্কেটে অভিযান হয়। এই অভিযানে কেনা দামের চেয়ে অস্বাভাবিক দাম বাড়িয়ে বিক্রির অপরাধে ১৫ ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়।

এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার সমকালকে বলেন, শ্যামবাজারে মন্ত্রণালয়ের টিমের সঙ্গে যৌথভাবে নিয়মিত অভিযান চলছে। গত বৃহস্পতিবার অভিযানে কয়েক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়। গতকাল তাদের যৌক্তিক দামে বিক্রির জন্য সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য বাজারে অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধির জন্য জরিমানা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এই কারসাজি রোধে সব বাজারে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে। রাজধানীর বাইরেও চলছে অভিযান। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুস সালাম চৌধুরীর নেতৃত্বে অভিযানে মিহির চন্দ নামের এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়।

আব্দুস সালাম বলেন, বাজারে নিয়মিত মূল্য প্রদর্শন করে পণ্য বিক্রি করতে হবে।

বিশ্ববাজারের শীর্ষ দাম বাংলাদেশে : বিশ্ববাজারে এখন সবচেয়ে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশে। সারা বিশ্বেই পণ্যটির দাম ঊর্ধ্বমুখী। গত বৃহস্পতিবারের পেঁয়াজের বাজারের সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেস ট্রিজ।

ট্রিজের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন প্রতি কেজি পেঁয়াজের গড় পাইকারি মূল্য ছিল ৬৮ সেন্ট বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৮ টাকা। পেঁয়াজ উৎপাদন ও ব্যবহারকারী শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর বাজারের তথ্য মতে, দাম বৃদ্ধিতে সেরা ১০টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম এখন বাংলাদেশে। পাইকারিতে প্রতি কেজি পেঁয়াজের গড় দর ২৫০ টাকা, যা গড়ে ৩ ডলারের বেশি। এর পরে প্রতি কেজি পেঁয়াজের পাইকারি গড় দর সর্বোচ্চ দর ইন্দোনেশিয়ায় ১ ডলার ৬৩ সেন্ট, মেক্সিকোতে ১ ডলার ২১ সেন্ট, ভারতে ৬২ সেন্ট, চীনে ২৮ সেন্ট, পাকিস্তানে ৩৯ সেন্ট ও তুরস্কে ১৪ সেন্ট। এর বাইরে ব্রাজিলে ৪০, মিসরে ১৭ ও স্পেনে ৩১ সেন্ট কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। গত এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে গড়ে সাড়ে ১১ শতাংশ, এক মাসে বেড়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ ও এক সপ্তাহে আড়াই শতাংশের মতো। বাংলাদেশে এই দর বৃদ্ধি অনেক বেশি। গত এক বছরে আটগুণ ও এক মাসে চারগুণ বেড়েছে।

x

Check Also

আজ বুধবারের দিনটি আপনার কেমন যাবে?

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : আজ ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, বুধবার। নতুন সূর্যালোকে আজ বুধবারের দিনটি আপনার ...

Scroll Up