দুর্নীতিবাজদের বিচার চালিয়ে যাব : প্রধানমন্ত্রী

32
গতকাল মঙ্গলবার রোমে ইতালি শাখা আওয়ামী লীগ আয়োজিত সংবর্ধনায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এমএনএ রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতিবাজদের বিচার চালিয়ে যাব। আমি এটুকু বলতে চাই, দেশের শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতি যারা করবে, সন্ত্রাস যারা করবে এবং জঙ্গিবাদে যারা জড়াবে তাদের অবশ্যই বিচার হতে হবে।
খালেদা জিয়ার দুর্নীতির মামলার রায়ের প্রেক্ষাপটে গতকাল মঙ্গলবার রোমে ইতালি প্রবাসীদের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে একথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, আমরা দেশে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই। আমরা দেশকে উন্নত এবং জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চাই। এটা তখনই সম্ভব হবে যখন আমরা দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ ও স্বজনপ্রীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অপসারণ করতে পারব।
সরকার তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কোনো মামলা প্রত্যাহার করেনি বলেও জানান শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার রাতে ইতালির রোমের পার্কো দি প্রিনসিপি গ্রান্ড হোটেল অ্যান্ড এসপিএতে আওয়ামী লীগের ইতালি শাখা আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে একথা বলেন।
ইতালি সফরে ভ্যাটিকানে পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে বৈঠক এবং আইএফএডির পরিচালনা পর্ষদের সভায় যোগ দেওয়ার পর পারকো দেই প্রিনচিপি গ্র্যান্ড হোটেলে ইতালি আওয়ামী লীগ আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আসেন শেখ হাসিনা।
বক্তব্যে দুর্নীতির মামলায় দণ্ড পেয়ে কারাগারে থাকা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।
অতীতে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি আগেই প্রত্যেক মামলার তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বলেছিলেন।
তিনি বলেন, আমি প্রত্যেকটি মামলার তদন্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছিলাম। মামলাগুলোর প্রকৃত অবস্থা আমরা যাচাই করে দেখতে চেয়েছিলাম।
এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা আরও বলেন, প্রত্যেকটি মামলার তদন্ত হয়েছে এবং এর রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। আমি কোন মামলা প্রত্যাহার করিনি এবং এর অনুমতিও দেইনি, কেন আমি এটা করব! আমি জানতাম, আমিতো কোন দুর্নীতি করিনি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী পদ্মাসেতু নির্মাণ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের কল্পিত দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন।
তিনি বলেন, হিলারি ক্লিনটন সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এবং ড. মুহম্মদ ইউনূস সে সময় পদ্মা সেতু প্রকল্পের ক্রটি খুঁজে বের করতে মুখিয়ে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ওই সময় তিন তিনবার আমার ছেলেকে এ ব্যাপারে হুমকিও দেয়।
শেখ হাসিনা বলেন, এটি কানাডার আদালতেই প্রমাণ হয়েছে যে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোন দুর্নীতি হয়নি।
আমি বলেছিলাম আমি দুর্নীতি করার জন্য ক্ষমতায় আসিনি। আমি জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই ক্ষমতায় এসেছি। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নয়, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশের বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার দুর্নীতির প্রমাণ হয়েছে আদালতে। আদালত যখন দেখেছে বিএনপি নেত্রীর মাধ্যমে এতিমের টাকার সম্পূর্ণ অপব্যবহার হয়েছে তখন আদালত তাকে এই শাস্তির রায় দেয়।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, এক্ষেত্রে আমাকে তিরস্কার ও সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার কি যুুক্তি থাকতে পারে?
ইতালি শাখা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী মোহাম্মদ ইদ্রিসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী এসময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অপকর্মের কারণেই সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেই দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে।
তিনি বলেন, বিএনপি দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে, দুর্নীতি ও বাংলা ভাই সৃষ্টি করে এবং এই প্রেক্ষাপটেই আমরা জরুরি অবস্থা দেখেছি।
তিনি বলেন, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে নির্বাচন প্রতিরোধ ও সরকার পতনের নামে এই বিএনপি জ্বালাও পোড়াও ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। ২০১৩ সালে ঠিক একইভাবে তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করে দেয়।
এই সময়ে সমানে তারা আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়েছে। প্রায় তিন হাজারের উপরে মানুষকে তারা আগুন দিয়ে ঝলসে দিয়েছে। ওই তিন বছরে প্রায় পাঁচশর কাছাকাছি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। পুলিশ, বিজিবি, সেনা সদস্যকে পুড়িয়ে মেরেছে।
কত অন্যায় তারা করেছে চিন্তা করেন। সারা বাংলাদেশে এই ধরনের তাণ্ডব তারা করেছে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে বলেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, আজকে যে মামলায় খালেদা জিয়ার শাস্তি হয়েছে সে মামলা কে দিয়েছে? খালেদা জিয়ার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। সেনাবাহিনীর ৯ জন জেনারেলকে ডিঙিয়ে মইন উদ্দিনকে সে সেনাপ্রধান করেছিলে। আর বিশ্ব ব্যাংকে চাকরি করত ফখরুদ্দীন সাহেব, তাকে নিয়ে এসে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর করেছিল। তাদের দলীয় লোক ইয়াজউদ্দীন সাহেবকে বানালো রাষ্ট্রপতি।
শেখ হাসিনা বলেন, আজকে যে মামলায় খালেদা জিয়ার শাস্তি হয়েছে—সে মামলা কে দিয়েছে? খালেদা জিয়ার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। ফখরুদ্দীন, মইন উদ্দিন, ইয়াজ উদ্দীন—এই তিনজনই তো তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দিল। এ মামলা তো আওয়ামী লীগ দেয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৭ সালে এই মামলা হয় এবং পরের বছরই এর বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। এই মামলা ১০ বছর ধরে চলে এবং মামলার শুনানির জন্য ২৩৬ কার্যদিবস ধার্য হয়। কিন্তু খালেদা জিয়া আদালতে গেছেন মাত্র ৪০ দিন।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, খালেদা জিয়ার আপত্তির কারণে এই মামলায় তিনবার আদালত পরিবর্তন করা হয় এবং তিনি এর বিরুদ্ধে ২২টি থেকে ২৪টি রিট করেন।
তিনবার আদালত পরিবর্তন করে মামলাকে দীর্ঘায়িত করার পরেও যখন আদালত খালেদা জিয়াকে শাস্তি দিল তখন বিএনপি এই স্বল্প পরিমাণ টাকার জন্য খালেদা জিয়াকে শান্তি দেয়ার যৌক্তিকতার প্রশ্ন তুলছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, যে টাকা খালেদা জিয়া এবং সংশ্লিষ্টরা অপব্যবহার করেছেন সে টাকা এতিমদের জন্য এসেছিল। কিন্তু এতিমদের পরিবর্তে সে টাকা তাদের নিজেদের তহবিলে চলে যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেতারা বলেন, সেই টাকা তাদের তহবিলে রাখার ফলে দুই কোটি থেকে বেড়ে তিন কোটি হয়েছে। কিন্তু এতিমরা এ থেকে কি লাভটা পেল?
তিনি আরও বলেন, যদি খালেদা জিয়া বলতেন, সেই টাকা তিনি তার এতিম দুই পুত্রের জন্য রেখেছেন, তারও না হয় একটি যৌক্তিকতা ছিল।
শেখ হাসিনা বলেন, যখন মামলাটি করা হয় (ব্যারিস্টার) রফিকুল হক সে সময় বলেছিলেন খালেদা জিয়া ওই পরিমাণ টাকা জমা করে দিলেই মামলাটি প্রত্যাহার হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি (খালেদা জিয়া) টাকার মায়া ছাড়তে পারেননি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তখন টাকার যে মূল্য ছিল তা থেকে দুই কোটি টাকা দিয়ে তিনি চারটি ফ্ল্যাট ক্রয় করতে পারতেন, এটিই হচ্ছে বাস্তবতা। কাজেই তিনি (খালেদা জিয়া) টাকার মায়া ত্যাগ করতে পারেননি বলেই আজকে এতিমের টাকা আত্মসাতের কারণে তিনি কারাগারে।
শেখ হাসিনা বলেন, আজকে যারা বিএনপি দরদি, আঁতেলরা আছে তারা বলে দুই কোটি টাকার জন্য কেন এই মামলা? তাহলে আমার এখানে একটা প্রশ্ন আছে, দুর্নীতির করার জন্য কি একটা সিলিং থাকবে যে এত কোটি পর্যন্ত দুর্নীতি করা জায়েজ, তারা কি সেটা বলতে চায়!
তিনি আরও বলেন, বিএনপি তাহলে একটা দাবি করুক যে এত কোটি পর্যন্ত তারা দুর্নীতি করতে পারবে। সেটা নিয়ে একটা রিট করুক।