নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা : প্রয়োজন অর্থবহ সংলাপের উদ্যোগ

40

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষিত রোডম্যাপে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার ব্যাপারে সন্দিহান ক্ষমতাসীন দল ছাড়া অন্য দলগুলো। কারণ রোডম্যাপে এসব ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। রোডম্যাপে উল্লিখিত সাতটি কর্মপরিকল্পনা হল- আইনি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার চলতি জুলাই থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করা; নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও যুগোপযোগী করতে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে পরামর্শ ৩১ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, সংসদীয় এলাকার নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ জুলাই থেকে ডিসেম্বর, নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও সরবরাহ জুলাই থেকে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত, বিধি অনুসারে ভোট কেন্দ্র স্থাপনের কাজ ২০১৮ সালের জুন থেকে তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরীক্ষা এ বছরের অক্টোবর থেকে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট সবার সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ভোট গ্রহণের এক সপ্তাহ আগে শেষ করা।

তবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে কীভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা হবে সে সম্পর্কে রোডম্যাপে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা বলেছেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার এখতিয়ার ইসির নেই। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, ‘সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে, নির্বাহী বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করবে। এই সহায়তা কেবল তফসিল ঘোষণার পরপরই করতে হবে তা বলা নেই। তফসিল ঘোষণার আগেই নির্বাচন কমিশন অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বাধাগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরতে পারে। এসব বাধাবিপত্তি দূর করতে সরকারের সহায়তা চাইতে পারে।’

আমাদের মনে আছে, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠিত হওয়ার পরপরই এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেয়াই তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। একইসঙ্গে সরকার বা অন্য কোনো পক্ষের প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষ, আপসহীন ও সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। তিনি এ-ও আশ্বাস দিয়েছিলেন, কমিশন বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলকে আস্থায় আনতে কাজ শুরু করবে। তার এসব বক্তব্য আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার বিষয়টির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। বস্তুত বিগত দিনগুলোয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ বেশকিছু স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন এমনভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে যে, কমিশন তার ভাবমূর্তি ধরে রাখতে পারেনি। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও অনেকাংশে নষ্ট হয়েছে। এমন এক পটভূমিতে গঠিত বর্তমান নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত তাদের কর্মকাণ্ড দ্বারা মানুষের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে, এটি একটি ইতিবাচক দিক অবশ্যই। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ঘোষিত রোডম্যাপেও এর প্রতিফলন ঘটা উচিত ছিল। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য বলে দিচ্ছে, ইসি এ ক্ষেত্রে সফল হয়নি।

রোডম্যাপে অবশ্য সংলাপের সুযোগ রাখা হয়েছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী সুশীল সমাজের সঙ্গে ৩১ জুলাই, গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আগস্টে, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষক, নারীনেত্রী ও নির্বাচন পরিচালনাকারী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অক্টোবরে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। সংলাপে পাওয়া সুপারিশগুলো চূড়ান্ত করা হবে ডিসেম্বরে। অতীতে এ ধরনের সংলাপ থেকে উঠে আসা প্রস্তাবগুলো আমলে নেয়া হয়নি। তাই আমরা বলব, এক্ষেত্রে অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটলে ইসির উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে না। সংলাপ অর্থবহ হলেই ফলপ্রসূ হবে ইসির উদ্যোগ।

-সম্পাদক