নীলফামারীতে চীনা কারখানায় করোনা ভাইরাস নিয়ে হুলস্থূল

এমএনএ রিপোর্ট : হঠাৎ নভেল করোনা ভাইরাস আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে নীলফামারী জেলা শহরে। গতকাল একটি চীনা কারখানার শ্রমিকরা একে একে অসুস্থ হয়ে পড়লে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে নীলফামারী জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে গতকাল বিকাল থেকে মাইকিং করে জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়। রাতেও মাইকিং অব্যাহত ছিল।

ঘটনার সূত্রপাত নীলফামারীর হাড়োয়া গ্রামে অবস্থিত এভারগ্রীন প্রডাক্ট বিডি লিমিটেডের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গোল্ডেন টাইমিং ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের পরচুলা তৈরির একটি কারখানা থেকে। নীলফামারী শহরের উপকণ্ঠে হাড়োয়ার টুপিরমোড়ে কারখানাটি অবস্থিত। গতকাল সকালে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন ওই কারখানার ২৯ নারী শ্রমিক। পরে তাদের নীলফামারী সদর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একই সঙ্গে কারখানার সব শ্রমিককে তাৎক্ষণিক ছুটিও দেয়া হয়। এ খবরে শহরজুড়েই ছড়িয়ে পড়ে করোনা ভাইরাস আতঙ্ক। এমনকি ভাইরাস সংক্রমণের আতঙ্কে সদর আধুনিক হাসপাতালে আগে থেকে ভর্তি থাকা অন্যান্য রোগের রোগীরা হাসপাতাল ছাড়তে শুরু করেন।

কারখানার সংশ্লিষ্টরা জানায়, সকাল ৭টা থেকে শ্রমিকরা ওই কারখানায় কাজ শুরু করেন। সকাল ১০টার দিকে দুজন শ্রমিক অসুস্থ বোধ করেন। দ্রুত তাদের সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই ফ্লোরে প্রায় ৮০০ নারী শ্রমিক কাজ করছিলেন। এরপর একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ হতে থাকেন। অসুস্থদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এতে শ্রমিকরা বিচলিত হলে কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি দেয় সব শ্রমিককে। কারখানার তিনটি ফ্লোরে প্রায় ২ হাজার ৪০০ শ্রমিক কাজ করেন।

কারখানার শ্রমিক হাসি বেগম বলেন, আমরা সকাল ৭টার দিকে কাজে যোগ দিই। সকাল ১০টার দিকে দুজন শ্রমিক বমি করতে করতে মাথা ঘুরে পড়ে যান। এ অবস্থায় একের পর এক অসুস্থ হতে থাকেন। আমরা ভয়ে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসি। পরে কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। অসুস্থ শ্রমিক নীপা রায় বলেন, আমি ভয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেয়ার পর এখন অনেকটা সুস্থ বোধ করছি।

এ ঘটনার পর নীলফামারী শহরজুড়ে করোনা ভাইরাসের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে শহরের বাসিন্দারা, যার পরিপ্রেক্ষিতে নীলফামারী জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে গতকাল বিকাল থেকে মাইকিং করে জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

নীলফামারী জেলার সিভিল সার্জন ডা. রণজিৎ কুমার বর্মণ বলেন, কারখানাটির শ্রমিকরা মূলত গণহিস্টিরিয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক রোগ। একজনের হলে অন্যরাও আতঙ্কে আক্রান্ত হন। শুনেছি প্রথম অজ্ঞান হওয়া দুজন শ্রমিক কোনো কিছু না খেয়ে কাজ করার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন। এরপর একে একে অন্যরা অসুস্থ বোধ করতে থাকেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল বেলা ১১টার দিকে কারখানা শ্রমিকরা দলে দলে হাসপাতালে ভর্তি হতে থাকলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, করোনা ভাইরাসের রোগী আসছে। ফলে হাসপাতালের ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগীরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। তাদের মধ্যে অনেকের হাতে স্যালাইন লাগানো ছিল। মহিলা ওয়ার্ডের কর্তব্যরত নার্সরা জানান, বেলা ১১টা পর্যন্ত ওই ওয়ার্ডে ৭৭ জন রোগী ছিলেন। কারখানার শ্রমিকরা আসতে থাকলে রোগীরা আতঙ্কিত হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে যান।

নীলফামারী জেলার উত্তরা ইপিজেডের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে বর্তমানে ১৮টি শিল্প-কারখানা রয়েছে। সেখানে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ কাজ করছে। একই সঙ্গে কারখানাগুলোর কাঁচামাল সরবরাহকে কেন্দ্র করে আশপাশ এলাকায় গড়ে উঠেছে বড় বড় বাজারও। শিল্প-কারখানাগুলোর প্রায় সবই গার্মেন্ট ও গার্মেন্ট অ্যাকসেসরিজের। এর মধ্যে চীনা বিনিয়োগে স্থাপিত কারখানার সংখ্যা সাতটি। এসব চীনা কারখানায় প্রায় সাড়ে ৪০০ চীনা নাগরিক কাজ করছেন। হঠাৎ করেই উত্তরা ইপিজেড ঘিয়ে নভেল করোনা ভাইরাস আতঙ্ক ছড়াতে শুরু করে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের পাশাপাশি এলাকাবাসীর মধ্যেও। যদিও কারো মধ্যে এখনো ভাইরাস সংক্রমণের নমুনা পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।

উত্তরা ইপিজেডের চীনা কারখানায় কাজ করছেন এমন একজন গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, ইপিজেডের ভেতরে প্রতিটি আটতলাবিশিষ্ট চারটি ডরমিটরি আছে, যেগুলোর পুরোটাতেই প্রায় ৫০০ জন চীনা কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা থাকেন। চীনে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই চীনা নাগরিকরা শহরে চলাফেরা করছেন না। ইপিজেড কর্তৃপক্ষই চীনা নাগরিকদের চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আর ইপিজেডের আশপাশ এলাকায়ও আতঙ্ক আছে। সবাই চীনাদের এড়িয়ে চলছেন। শহরের লোকজন মাস্ক ব্যবহার করছে।

তবে চীনা নাগরিকদের নিয়ে কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক নেই বলে জানান ভেনচুরা লেদারওয়্যার লিমিটেডের সুপারভাইজার রিপন রায়। গতকাল তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমার কারখানায় ৯৬ জন চীনা নাগরিক কাজ করছেন। কারখানায় কাজের পর তারা মূলত ডরমিটরিতেই থাকছেন। কারখানায় বাংলাদেশী যারা কাজ করছেন, তারা করোনা নিয়ে খুব একটা আতঙ্কে নেই। গতকালের ঘটনায় হঠাৎ করেই সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তবে বিকালের দিকে পরিস্থিতি আবার শান্ত হয়ে যায়। মানুষের মধ্যে ভয় কাটতে শুরু করেছে।

উত্তরা ইপিজেডের ইনচার্জ মো. এনামুল হক বলেন, ঘটনাটি ইপিজেডের ভেতরে ঘটেনি। তাই শ্রমিকরা বিষয়টি জানেন না। এজন্য ভেতরে স্বাভাবিক অবস্থা বিদ্যমান। বর্তমানে দেশী-বিদেশী মিলে মোট ৩৫ হাজার শ্রমিক বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত।

এর আগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি উত্তরা ইপিজেডে কর্মরত এক চীনা নাগরিক অসুস্থ হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। যিনি গত ৪ ফেব্রুয়ারি চীন থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। সেখান থেকে সরাসরি তার কর্মস্থল উত্তরা ইপিজেডে যান। পরে সর্দি, জ্বর ও বুকে ব্যথা অনুভব হলে স্থানীয় চিকিৎসকরা তার চিকিৎসা দেন। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন না হওয়ায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই ঘটনার সময়ও পুরো ইপিজেডে করোনা ভাইরাস আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, ওই চীনা নাগরিক করোনা ভাইরাস আক্রান্ত নন।

x

Check Also

মৃতের সংখ্যা ২১ হাজার ছাড়াল, আক্রান্ত পৌঁনে ৫ লাখ 

এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে নভেল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। এই ...

Scroll Up