পাঠ্যবই ছাপায় স্তরে স্তরে অনিয়ম–দুর্নীতি : টিআইবি

20
এমএনএ রিপোর্ট : প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি তৈরি, ছাপা ও বিতরণ পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হয় বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে। আজ সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই গবেষণা তত্ত্ব তুলে ধরা হয়। তত্ত্বগুলো তুলে ধরেন গবেষক মোরশেদা আক্তার।
এতে বলা হয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তারাও এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।দরপত্র প্রকাশ থেকে শুরু করে কার্যাদেশ পাওয়া পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের ক্ষেত্রে এনসিটিবির চেয়ারম্যান থেকে এমএলএস পর্যন্ত সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এর ভাগ পাচ্ছেন। তবে এর কোনো ডকুমেন্ট রাখে না এনসিটিবি।
টিআইবি বলছে, এনসিটিবির স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার কথা। কিন্তু এনসিটিবি অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এর কোনো বিধিমালা নেই। নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনার কারণে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা বিদ্যমান। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যবহার করা হয় এনসিটিবিকে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বর্তমান আইনে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) এবং শিক্ষাক্রম কমিটির (কারিকুলাম কমিটি) উল্লেখ করা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী আদেশে গঠন করা হয়। আইনের বিভিন্ন ধারার সুযোগ নিয়ে এনসিটিবির উপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি রয়েছে।
প্রতিবেদনে পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রণয়নের প্রক্রিয়া চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, এসব কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে কাউকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেখা নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের প্রভাব দেখা যায়। আবার সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের কোনো কোনো বিষয় এবং শব্দ পরিবর্তন করা হয়। গবেষণায় বলা হয়, শিক্ষাক্রম অনুসরণ না করেই অনেক সময় অনিয়মতান্ত্রিকভাবে লেখা পরিবর্তন করা হয়। বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকে না। লেখকদের সম্মানী দেয়া হলেও অনেক লেখকের অবদান প্রত্যাশিত পর্যায়ের নয়, আবার অনেক লেখকের অবদান সম্পর্কে অন্যদের ধারণা থাকে না।
পাঠ্যবই ছাপার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরা বলা হয়, প্রকাশনা প্রক্রিয়ায় এনসিটিবির কর্মকর্তাদের একাংশ পাঠ্যবই ছাপার দরপত্র আহ্বানের আগেই প্রস্তাব অনুযায়ী প্রাক্কলিত দর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দেয়। এর মধ্যে সরকার দলীয় অনেকের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পরে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে দরপত্র দাখিল করে। বিতরণ পর্যায়েও নানা ধরনের অনিয়ম হয় বলে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়। এ বিষয়ে বলা হয়, কয়েকটি জেলায় নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যবই সরবরাহ করা না হলেও পরে সঠিক সময়ে প্রাপ্তি প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
দাপ্তরিক বা সরকারি আদেশ না থাকা সত্ত্বেও পাঠ্যপুস্তক উৎপাদন ও বিতরণ সংক্রান্ত কাজের জন্য এনসিটিবি’র বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারি সম্মানী গ্রহণ করছেন।
গবেষণা প্রতিবেদনের সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এনসিটিবির পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন–প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ, সঠিকভাবে পাণ্ডুলিপি রেখা হচ্ছে না, দলীয় রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত প্রভাব বিদ্যমান দেখা যায়। পাঠ্যবই ছাপায় দুই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়। প্রথমত, ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা আদায় এবং কার্যাদেশ প্রদানে দুর্নীতি। প্রতিবেদনে এসব সমস্যার সমাধানে বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়।
এ ব্যাপারে প্রশ্নের জবাবে মোরশেদা আক্তার বলেন, দরপত্র নির্দেশিকা তৈরি, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, সিএস তৈরি, কার্যাদেশ প্রদান, প্রতি লটের কাগজের হিসাব, কাগজের বরাদ্দপত্র জারি, কার্যাদেশ অনুযায়ী উপজেলায় বই সরবাহ বাবদ গত ৩ বছরে ৫০ লাখ ৯৬ হাজার ৭শ টাকা বিধি বহির্ভূতভাবে সম্মানী নিয়েছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান থেকে এমএলএস পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এ ছাড়া প্রকাশনায় সাব-কন্ট্রাক্টে, কাগজ ক্রয়ে ও কাগজের মান নিয়ন্ত্রণ ও পাঠ্যপুস্তক সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা ও ব্যর্থতা লক্ষ্যণীয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এখানে অনিয়মের ব্যাপক চিত্র উঠে এসেছে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- গবেষণা উপদেষ্টা ও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনার) ড. সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক (গবেষণা ও পলিসি) মোহাম্মদ রফিকুল হাসান ও গবেষণা তত্বাবধায়ক শাহজাদা এম আকরাম।