বন্ধ করো এ বর্বরোচিত গণহত্যা

44

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : সু চি, বন্ধ করো এ বর্বরোচিত গণহত্যা- এমন আহ্বান এখন সবারই। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর এ বর্বরোচিত গণহত্যা চালিয়ে তাদের বিতাড়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত সোচ্চার হয়ে উঠছে। জাতিসংঘ প্রথম থেকেই এই মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সাড়া ধীর।

গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে মানবাধিকার লংঘনজনিত রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অংসখ্য রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশ কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে বলেও সেখানে মন্তব্য করা হয়েছে।

ডেসমন্ড টুটু, মালালা ইউসুফজাই প্রমুখ নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব জোরালো আওয়াজ তুলেছেন এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পাশাপাশি দেশে দেশে নাগরিকদের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাতে ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া-তুরস্কের পর ইউরোপের নগরগুলো যুক্ত হয়েছে। মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দাঁড় করাতে আহ্বান জানিয়েছে আরব পার্লামেন্ট।

মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে সাধ্যের অতীত সাড়া দিয়ে লাখ লাখ উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়ে এই সংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের রাজপথে ধ্বনিত প্রতিবাদ ও ধিক্কার অন্যত্র প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করেছে। মিয়ানমারের প্রতি সবারই এক আহ্বান- এখনই বন্ধ করো এই গণহত্যা।

এদিকে গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাখাইন রাজ্যে আরও ৮টি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স।

বাংলাদেশে শুরু থেকেই চলছে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ সমাবেশ করে যাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মমতায় অং সান সু চির অব্যাহত নীরবতায়ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিক্ষোভকারীরা। গতকাল শুক্রবার শাহবাগে প্রতিবাদ জানায় গণজাগরণ মঞ্চ। জুমার নামাজ শেষে প্রতিবাদ সমাবেশ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। নির্যাতন বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও।

রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান গণহত্যার প্রতিবাদে শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর চাপ দিয়ে আসছে সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, পাকিস্তান। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ রাশিয়ার সচেতন মানুষও ধিক্কার জানিয়েছে মিয়ানমারকে। মস্কোর পাশাপাশি চেচনিয়ার জনগোষ্ঠীও গণহত্যা বন্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে। এই সভ্যতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এসেছে আমাদের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী প্রতিবেশী ভারতের নাগরিকরাও।

গত বৃহস্পতিবার ইন্দোনেশিয়ার বালিতে ওয়ার্ল্ড পার্লামেন্ট ফোরামের রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঘোষণাপত্রে ভারত স্বাক্ষর না করলেও দেশটির রাজধানী দিলি্লসহ পশ্চিমবঙ্গের প্রধান শহর কলকাতা এবং পাঞ্জাব রাজ্যেও ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতেও এই বিনাশী তৎপরতা এখনই বন্ধ করার ডাক উঠেছে।

রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে স্রোতের মতো বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে অসহায় রোহিঙ্গারা। জাতিসংঘ ধারণা করছে, গত ২৫ আগস্টে নতুন করে সেনা সহিংসতা শুরু হওয়ার পর ১৫ দিনে ২ লাখ ৭০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। শুধু গত দুই দিনেই এসেছে ১ লাখের বেশি শরণার্থী।

সর্বশেষ সেনা সহিংসতার আগেই বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে এত বেশি সংখ্যক রোহিঙ্গার জায়গা দেওয়া ও এর বিশাল ব্যয় ভার বহন করা অসম্ভব। এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান নির্বিচার হত্যা বন্ধের পাশাপাশি দেশের এসব শরণার্থীকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। তবে এ আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে না মিয়ানমার।

রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা ডেসমন্ড টুটু। নোবেলজয়ী সাবেক এই ধর্মযাজক গত বৃহস্পতিবার এক খোলা চিঠিতে সু চির উদ্দেশে বলেন, ‘এখন আমি জরাগ্রস্ত, সবকিছু থেকে অবসর নিয়েছি। ঠিক করেছিলাম সার্বজনীন বিষয়ে আর কথা বলব না। কিন্তু তোমার দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানরা সংকটে। তাই নীরবতা ভাঙতে বাধ্য হলাম।’

সু চির উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘হে আমার ভগিনী, মিয়ানমারের রাজনৈতিক শিখরে পৌঁছানোই যদি তোমার নীরবতার কারণ হয়ে থাকে, তার জন্য সত্যিই বড় বেশি দাম দিতে হচ্ছে। আমরা চাই, তুমি ন্যায় বিচারের পক্ষে, মানবতার পক্ষে কথা বলো।’

রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশ যে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে, গত বৃহস্পতিবার এ কথা স্বীকার করে নিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র হিদার নোয়ার্ট। মিয়ানমারের সহিংস পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ‘আমি জানি, অন্য যে কোনো দেশের মতোই শরণার্থীদের ভার বাংলাদেশকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে।’

যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে জানিয়ে নোয়ার্ট আরও বলেন, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সেখানে মানবাধিকারের লংঘন হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে এবং সহিংসতা বন্ধ করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিও আহ্বান জানান যুক্তরাষ্ট্রের মুখপাত্র।

রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর সহিংস অভিযান ও মানবাধিকার লংঘনের মতো ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড এখনই বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার গোষ্ঠী অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচও একই আহ্বান জানিয়েছে।

রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রতিবাদে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় গত বুধবার বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা সু চির পোস্টার বহন করে তার ভূমিকার নিন্দা জানায়। জাকার্তায় মিয়ানমার দূতাবাসের বাইরেও বিক্ষোভ হয়েছে। এদিকে বিক্ষোভ হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সুরাবায়াতেও।

এর আগের দিন প্রায় ১১ লাখ মানুষের বিক্ষোভ হয়েছে রাশিয়ার মস্কোতে। বিক্ষোভ হয়েছে মালয়েশিয়া, ভারতে। আর বুধবার চেচনিয়ায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ক্ষুব্ধ মানুষ। এ ছাড়া পাকিস্তানের করাচি, পাঞ্জাব শহরেও চলছে বিক্ষোভ। জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়ায় মিয়ানমার দূতাবাসের বাইরেও বিক্ষোভ হয়। এর আগে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে কিরগিজস্তান মিয়ানমারের সঙ্গে এশিয়া কাপের বাছাইপর্বের একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ বাতিল করে দেয়।

এদিকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অথবা বৈধভাবে বসবাসের অনুমতি দিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। সে সঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন মহাসচিব। নিন্দা জানানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের কাছে লেখা চিঠিতে গুতেরেস আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ সহিংসতা মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।

গত আট মাসে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বরাবরই সোচ্চার ছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি সরাসরি বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালানো হচ্ছে। গত মঙ্গলবার সরাসরি মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সু চিকে ফোন করেছেন তিনি। টেকনাফে গিয়ে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিজ চোখে দেখেছেন তুরস্কের ফার্স্ট লেডি আমিনে এরদোয়ান।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা-নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়ে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের শীর্ষস্থানীয় আলেম গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ নাসের মাকারেম শিরাজি। মিয়ানমারের বৌদ্ধরা মিয়ানমারকে মুসলিমশূন্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

এদিকে আগামী সোমবার বিকেলে মিয়ানমার দূতাবাস ঘেরাওয়ের ঘোষণা দিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। একই দাবিতে গতকাল বিকেলে এক বিক্ষোভ মিছিল শেষে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে সমাবেশে মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ওই দিন বিকেল ৩টার দিকে গুলশান ২ নম্বর গোলচত্বরে জমায়েত হয়ে মিছিলসহ মিয়ানমার দূতাবাস অভিমুখে ঘেরাও কর্মসূচি শুরু হবে। ইমরান বলেন, তিন দিনের মধ্যে মিয়ানমার সরকার গণহত্যা বন্ধ না করলে এবং তার নাগরিকদের ফেরত না নিলে দূতাবাস ঘেরাও করা হবে।

এদিকে গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাজধানীতে প্রায় ১৫ হাজার সমর্থক নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল করে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। তারাও ঢাকার মিয়ানমার দূতাবাস ঘেরাওয়ের ঘোষণা দিয়েছে।

২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা দমন অভিযানে নামে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে সেনা ও বেসামরিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চরমপন্থিদের হাতে এ পর্যন্ত চার শতাধিক রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশে প্রবেশ করতে গিয়ে নদী ও সমুদ্রে নৌকাডুবির ঘটনায় ৮৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।