বর্ষাকাল নার্সারি করার উপযুক্ত সময়

86

মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ) ডেস্ক : গাছ লাগানোর মোক্ষম সময় বর্ষাকাল। বছরজুড়ে নার্সারি ব্যবসা চললেও এ সময় গাছের চারা বিক্রি হয় অনেক বেশি। বাড়ির ছাদেও হতে পারে নার্সারি।

সবার আগে নিবন্ধন

বাণিজ্যিকভাবে নার্সারি করার জন্য প্রথমেই দরকার নিবন্ধন। ২০১০ সালের নার্সারি আইনের আলোকে যে জমিতে নার্সারি করবেন সেই জমির কাগজপত্র অর্থাৎ নিজের হলে দলিল, ইজারা হলে তার পক্ষে কাগজপত্র, ভাড়া হলে সে-সংক্রান্ত চুক্তিনামার ফটোকপিসহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। সঙ্গে যুক্ত করতে হবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অনুকূলে ৫০০ টাকার ট্রেজারি চালান। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যাঁরা রেজিস্ট্রেশন করতে চান, তাঁদের উপজেলা বা জেলা কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে আবেদন করতে হবে।

বর্ষাকাল নার্সারি করার উপযুক্ত সময়। ফুল, ফল, কাঠ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী-সব ধরনের গাছই নার্সারিতে পলিথিন বা টবে উৎপাদন করা যায়।

শুরু করা যায় অল্প পুঁজিতেই

দেড় থেকে দুই বিঘা জমি থাকলেই নার্সারি ব্যবসা শুরু করা যায়। এলাকাভেদে মূলধনের পরিমাণ ভিন্ন হয়। গ্রামাঞ্চলে চাইলে স্বল্প পুঁজিতেও পরিত্যক্ত জমিতে নার্সারি করা যায়। সাভারের রাঙাবন নার্সারির কর্ণধার ও বাংলাদেশ নার্সারিমেন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন জানান, নিজের জমি থাকলে ২৫ হাজার টাকা দিয়েই ছোট আকারের নার্সারি শুরু করা যায়। মাঝারি আকারের নার্সারির জন্য তিন থেকে ১০ লাখ ও বড় আকারের নার্সারির জন্য ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা মূলধন লাগে।

কোথায় হবে নার্সারি

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র গবেষণা কর্মকর্তা ননী গোপাল ভৌমিক জানান, নার্সারির জন্য নির্বাচিত স্থান অবশ্যই উঁচু হতে হবে, যাতে বন্যা কিংবা বৃষ্টির পানি না জমে। প্রচুর আলো-বাতাস, পায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। নার্সারিকে লাভজনক করার জন্য জায়গা নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে এলাকায় প্রচুর পরিমাণে ফল, ফুল ও ভেষজ উদ্ভিদ উৎপাদন হয় সে এলাকায় নার্সারি স্থাপন করার আদর্শ স্থান। প্রচুর পরিমাণে পানি সরবরাহের সুযোগসংবলিত বন্যামুক্ত স্থান নার্সারি স্থাপনের জন্য উপযুক্ত। বেশি চাহিদা আছে-এমন ফলদ, বনজ, ভেষজ ও শোভাবর্ধনকারী গাছের চারা বা কলম উৎপাদন করা ভালো। বাণিজ্যিক নার্সারি শহর বা শহরতলির আশপাশে হলে সহজেই নার্সারিতে উৎপাদিত চারা বা কলম বিপণন ও সরবরাহ করা যায়। পরিবহন ব্যয় কমানোর জন্য মাতৃবীজতলার বা মাতৃবাগানের কাছাকাছি জায়গায় নার্সারি স্থাপন করা ভালো।

উপযুক্ত মাটি ও সেচ

মাতৃবাগান ও সফল নার্সারি তৈরির জন্য মাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাটি অবশ্যই চারা কলম উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত হতে হবে। ঊর্বর বেলে-দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি নার্সারির উপযোগী। নার্সারিতে উৎপাদিত চারা বা কলমের বৃদ্ধির জন্য ঘনঘন পানি দেওয়ার প্রয়োজন হয়। তাই রাখতে হবে সেচ সুবিধা। দরকার হবে অফিস রুম, নার্সারি শেড, কীটনাশক সংরক্ষণাগার, নেট হাউস, মিস্ট হাউস ও প্রপাগেশন হাউস। থাকতে হবে বিদ্যুৎ সুবিধা, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, সেচ ও নিষ্কাশন নালা। আশুলিয়ার লেকভিউ গার্ডেন সেন্টারের কর্ণধার সংগ্রাম কুমার কুন্ডু জানান, নার্সারির কাজে লাগবে বিভিন্ন ধরনের সার ও সিকেচার, গ্রাফটিং নাইফ, বাডিং নাইফ, করাত, নার্সারি স্পেডসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। উদ্ভিদের বংশবিস্তার পদ্ধতি, চারা বা কলমের পরিচর্যা, মাতৃবাগান তৈরি, নার্সারি ব্যবস্থাপনা জেনেই তবে কাজ শুরু করা উচিত।

মাতৃগাছ থেকে চারা উৎপাদন

মাতৃগাছ থেকে গ্রাফটিং, কাটিং, লেয়ারিং করে কিংবা বীজ থেকে চারা উৎপাদন করা হয়। ফুল, ফল ও কিছু শোভাবর্ধনকারী গাছ উৎপাদন করা হয় কলম ও গ্রাফটিং পদ্ধতিতে। কাটিং পদ্ধতিতেও উৎপাদন করা হয় কিছু ফুলগাছের চারা। ঔষধি গাছ উৎপাদনে বীজ ও শিকড় ব্যবহার করা হয়। সাধারণত বর্ষাকালে গ্রাফটিং ও কলম পদ্ধতি এবং শীতের ঠিক আগে ও পরে কাটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে চারাগাছ উৎপাদন করা হয়। আর বীজ থেকে চারা উৎপাদন করা হয় বীজ পরিপক্ব হওয়ার মৌসুম অনুযায়ী। চারা উত্তোলনের জন্য মাতৃবাগান থাকতে হবে। মানসম্মত চারা উত্তোলনের ক্ষেত্রে চারার বয়স অন্তত এক বছর হতে হবে। শেকড়ের চেয়ে কাণ্ডের দৈর্ঘ্য হতে হবে চার গুণ বেশি।

পরিচর্যাতেই সাফল্য

সাভারের বরিশাল নার্সারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইব্রাহিম জানান, নার্সারি ব্যবসায় সফলতার প্রধান উপায় গাছের পরিচর্যা। ঠিকমতো গাছের দেখভাল করলে সুফল আসবেই। এ জন্য স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে উদ্যোক্তার কিংবা নিয়োগ দিতে হবে দক্ষ কর্মী। গাছের চারার যত্ন নেওয়ার বিষয়টি খুব জটিল কিছু নয়। শীতকালে এক দিন পর পর এবং বর্ষাকালে প্রয়োজনমতো পানি দিলেই চলে। যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সূর্যের আলো পায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। প্রতি মাসে একবার চারাগাছের গোড়ার মাটি আলগা করে দিতে হয়। তিন মাস পর পর মাটিতে প্রয়োজনমতো সার ও খৈল দিতে হয়। পোকা বা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে ব্যবহার করতে হয় কীটনাশক। আর কোনো গাছের চারা আক্রান্ত হলে সেটি পুড়িয়ে ফেলতে হবে, যাতে অন্যগুলোতে পোকা বা ভাইরাসের সংক্রমণ না ঘটে।

নিতে হবে প্রশিক্ষণ

ননী গোপাল ভৌমিক জানান, সারা বছরই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিএডিসি, বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা হর্টিকালচার সেন্টার, ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সারা বছর গ্রাফটিং, কাটিং, লেয়ারিং, ফলগাছ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করে।

যে কেউ চাইলেই তিন দিন, সাত দিন, ২১ দিন, এক মাস বা তিন মাস মেয়াদি এসব প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করতে পারেন নার্সারি তৈরির কাজ। এ ছাড়া সুইস ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের আর্থিক সহযোগিতায় সম্মিলিত কৃষি বনায়ন উন্নয়ন কার্যক্রম (এএফআইপি) নামে একটি প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে নার্সারি উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। চারা উৎপাদন, বিপণন, সংরক্ষণের বিষয়ে দরকারি সহযোগিতা দেয় তারা।

বাড়ির ছাদেও হতে পারে নার্সারি

নার্সারির জন্য যে বিশাল জায়গা থাকতে হবে, এমন নয়। কেউ চাইলে বাড়ির ছাদেও করতে পারেন চমৎকার একটি নার্সারি। প্রায় সব ধরনের গাছই ছাদে টবে উৎপাদন করা যায়। এ ক্ষেত্রে পানি দেওয়া ও শেডের ব্যবস্থা করতে হবে। বিএডিসির যুগ্ম পরিচালক (উদ্যান) মোফাজ্জল হোসেন জানান, দেড় হাজার বর্গফুটের ছাদে পূর্ণাঙ্গ একটা নার্সারি করা সম্ভব। সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে বাড়ির ছাদে বাগান করেও লাভবান হওয়া সম্ভব। বাড়ির ছাদে নার্সারির প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে। দুই-তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন বিনা মূল্যে, উপরন্তু মিলবে কিছু সম্মানীও।

বাজারজাত

নার্সারি ব্যবসার উপযুক্ত মৌসুম বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস। তবে ব্যবসা মূলত বর্ষাকালেই বেশি জমে। তবে নার্সারিতে সব মৌসুমের গাছ থাকে। গ্রামগঞ্জে বর্ষাকালে নার্সারি থেকে চারাগাছ তুলে বাজারে বিক্রি করা হয়। এ সময় গ্রামাঞ্চলে কাঠের গাছের ও ফলের গাছের চাহিদা আর শহরে টবের আম, কুল, সফেদা, পেয়ারা এবং বিভিন্ন রকমের ফুলের গাছের চাহিদা বেশি থাকে। নার্সারি থেকে চারা বিক্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। নার্সারি থেকে পাইকারি কিনে পিকআপ ও ভ্যানে করেও গাছের চারা ও শোভাবর্ধনকারী গাছ বিক্রি করেন অনেকে।

লাভের হিসাব

বাংলাদেশ নার্সারিমেন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন জানান, বিনিয়োগের জন্য নার্সারি একটি লাভজনক ক্ষেত্র। এটি এমন একটি ব্যবসা, যেখানে কখনো লোকসান হয় না। বিভিন্ন উন্নত ও বিদেশি জাতের ফল, ফুল, ভেষজ উদ্ভিদের চারা এবং শোভাবর্ধনকারী গাছের কালেকশন রাখলে বেশ লাভবান হওয়া যায়। এ ব্যবসায় সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে ছোট নার্সারি হলে সাধারণত এক থেকে দুই লাখ, মাঝারি আকারের হলে পাঁচ থেকে ১০ লাখ ও বড় নার্সারি হলে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হতে পারে।

* নিজের জমি থাকলে ২৫ হাজার টাকা দিয়েই ছোট আকারের নার্সারি শুরু করা যায়।

* খরচ বাদ দিয়ে বছরে ৫০ হাজার থেকে শুরু করে এক কোটি টাকা পর্যন্ত লাভ হতে পারে।