বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে বিশ্ববাসীর প্রতি পোপের আহবান

এমএনএ রিপোর্ট : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করে এই শরণার্থী সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে থাকতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানিয়েছেন বিশ্বে ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস।
মিয়ানমার সফর করে বাংলাদেশে এসে সফরের প্রথম দিনে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে তিনি এ আহ্বান জানান।
তবে বঙ্গভবনের অনুষ্ঠানে পোপ তাঁর বক্তব্যে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি এড়িয়ে যান। মিয়ানমার সফরেও রোহিঙ্গা নামটি উচ্চারণ না করায় তার সমালোচনা হচ্ছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন থেকে।
গত ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নিরাপত্তা অভিযানের নামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নৃশংসতা শুরু করে। এ অভিযানকে এরই মধ্যে জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ। রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬ লাখের মতো রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এ ছাড়া আগে থেকেই পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারে অবস্থান করছে। এতে মোট রোহিঙ্গা সংখ্যা সাড়ে ১১ লাখ ছাড়িয়েছে।
ভাষণের শুরুতেই সফরের আমন্ত্রণ জানানোয় রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানান পোপ ফ্রান্সিস। দুই পূর্বসূরি পোপ ষষ্ঠ পল, পোপ দ্বিতীয় জন পলের বাংলাদেশ সফরের কথাও স্মরণ করেন তিনি।
বাংলাদেশকে ‘নবীন’ রাষ্ট্র উল্লেখ করে পোপ ফ্রান্সিস বলেন, “তারপরও পোপদের হৃদয়ে এই দেশের জন্য সবসময়ই বিশেষ স্থান রয়েছে।”
“আমি মনে করি, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই আপনাদের বিশেষ পরিচয়ের ধারক। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে বিভিন্ন ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির জাতি-গোষ্ঠির মধ্যে ঐক্য রয়েছে।”
বাংলাদেশের জাতির জনকের কথা উল্লেখ করে পোপ বলেন, “প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন এবং এই আদর্শ সংবিধানে যুক্ত করার কথা বলেছিলেন। তিনি আধুনিক, বহুত্ববাদী এবং অংশগ্রহণমূলক একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে প্রতিটি মানুষ এবং জাতি মুক্ত, শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করতে পারবে, যেখানে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সমান অধিকার থাকবে।”
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের প্রশংসা করেন পোপ। তবে বিভক্তি তৈরি করতে কখনও কখনও ধর্মকে ব্যবহার করা হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গত বছর গুলশানে জঙ্গি হামলার কথাও তিনি স্মরণ করেন।
বাংলাদেশে ক্যাথলিকরা সংখ্যায় কম হলেও স্কুল, ক্লিনিক এবং স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার মধ্যে দিয়ে এই দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ রেখে চলেছে মন্তব্য করে ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন পোপ।
পোপ ফ্রান্সিস তার বক্তব্যে বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন থেকে আসা বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে এবং তাদের মৌলিক প্রয়োজন মিটিয়ে বাংলাদেশ উদার মন ও অসাধারণ ঐক্যের পরিচয় দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এটা ছোট কোনো বিষয় নয়, পুরো বিশ্বের সামনেই এটি ঘটেছে। পুরো পরিস্থিতি, মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা আমাদের ভাই-বোন, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু, তাদের ঝুঁকির গুরুত্ব বুঝতে আমরা কেউই ব্যর্থ হইনি।’
এই সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসাটা অপরিহার্য বলেও এ সময় মন্তব্য করেন পোপ ফ্রান্সিস।
তিনদিনের সফরে আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান পোপ ফ্রান্সিস। বিমানবন্দরে পোপ ফ্রান্সিসকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। পরে সেখানে পোপ ফ্রান্সিসকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
বিমানবন্দর থেকে পোপ সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পর রাজধানীর ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে যান তিনি। পরে সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে যান পোপ।
সেখানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পর দরবার হলে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে দরবার হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তিনি। স্পেনিশ ভাষায় তিনি বক্তব্য দেওয়ার সময় তা পাশে থাকা পর্দায় ইংরেজিতে দেখানো হচ্ছিল।
রাতে বঙ্গভবনে তার সম্মানে রাষ্ট্রপতির দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি।
বাংলাদেশ সফরের দ্বিতীয় দিনে আগামীকাল শুক্রবার সকাল ১০টায় পোপ ফ্রান্সিস রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খ্রিষ্টধর্মীয় উপাসনা এবং যাজক অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। ওই দিন দুপুর সোয়া ২টায় তিনি ভ্যাটিকান দূতাবাসে যাবেন। সেখানেই তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। দূতাবাস থেকে ফিরে বিকেল ৪টায় রমনার প্রবীণ যাজক ভবনে বাংলাদেশের বিশপদের বিশেষ সভায় বক্তব্য দেবেন পোপ। বিকেল ৫টায় আর্চবিশপ হাউসের মাঠে শান্তির জন্য আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃমাণ্ডলিক সমাবেশেও বক্তব্য দেবেন তিনি।
সফরের তৃতীয় দিনে আগামী শনিবার পোপ ফ্রান্সিস তেজগাঁও মাদার তেরেসা ভবন, তেজগাঁও কবরস্থান, পুরাতন গির্জা পরিদর্শন এবং সবশেষে নটর ডেম কলেজে যুব সমাবেশে বক্তব্য দেবেন। তিনদিনের সফর শেষে শনিবার বিকেল ৫টায় রোমের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন পোপ ফ্রান্সিস।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রীদের মধ্যে আবুল মাল আবদুল মুহিত, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আনিসুল হক, হাসানুল হক ইনু, এ এইচ মাহমুদ আলী, আসাদুজ্জামান নূর, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী, মসিউর রহমান ছিলেন। ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়াও ছিলেন অনুষ্ঠানে।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হাসান ইমাম, সারাহ বেগম কবরী, রামেন্দু মজুমদার প্রমুখ।
তিন বাহিনী প্রধান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন এই অনুষ্ঠানে। ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা।
বাংলাদেশের কার্ডিনাল প্যাট্রিক রোজারিও, ভ্যাটিকানের দূত জর্জ কোচেরি তাদের প্রধান ধর্মগুরুর সঙ্গে ছিলেন।
x

Check Also

বরেণ্য অধ্যাপক অজয় রায়ের জীবনাবসান

এমএনএ রিপোর্ট : একুশে পদকপ্রাপ্ত পদার্থ বিজ্ঞানের বরেণ্য অধ্যাপক অজয় রায় (৮৫) রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে ...

Scroll Up