বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা

94

এমএনএ কিনোদন ডেস্ক : বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের তালিকা করা হয়। শুধু নিজ দেশের নয়, তালিকা করা হয় সমগ্র বিশ্বের ক্ষমতাধরদের নামও। টাইমস, হাফিংটন পোস্ট, ফোর্বসসহ বেশ কিছু পত্রিকা বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি, ক্রীড়াঙ্গন, মিডিয়া এবং শিক্ষা জগত থেকে জরিপ বা গবেষণার মাধ্যমে সবচেয়ে ক্ষমতাধরদের এ তালিকাগুলো করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও বেশ কিছু বছর ধরে এর প্রচলন শুরু হয়েছে। সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকার জরিপে বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ১০০ জন ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে উঠে এসেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বেশ কয়েকজনের নাম-

আলী যাকের
প্রখ্যাত মঞ্চ ও টেলিভিশন অভিনেতা আলী যাকের বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন। দেশীয় বিজ্ঞাপন শিল্পের তিনি একজন পুরোধা ব্যক্তি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইংলিশ প্রোগ্রাম প্রোডিউসার হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৭২ সাল থেকে মঞ্চ কাঁপানো আলী যাকের দীর্ঘদিন যাবত শারীরিক অসুস্থতায় ভুগতে থেকেও মঞ্চ নাটকে নিয়মিত অভিনয় করে যাচ্ছেন। এছাড়াও তিনি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একমাত্র জাদুঘর এবং মুক্তিযুদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্টের অন্যতম সংগঠক। বাংলাদেশের জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন সংস্থা এশিয়াটিক এমসিএলের কর্ণধার আলী যাকের বাংলাদেশের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি।

আসাদুজ্জামান নূর
বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর আছেন ক্ষমতাধরদের এ তালিকায়। মন্ত্রীর চেয়েও তিনি জনপ্রিয় নব্বই দশকের বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকগুলোর জন্য। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর রচিত নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’ দিয়ে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছান। এই নাটকে তার ‘বাকের ভাই’ চরিত্রের জন্য বাংলাদেশের নাটকে তিনি চির স্মরণীয় একটি চরিত্র হয়ে থাকবেন। এক সময় ছাত্র আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে থাকা নূর ২০১৩ সাল থেকে আওয়ামীলীগ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।

রুনা লায়লা
শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী রুনা লায়লা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই রুনা লায়লা চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শুরু করেন। বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত এবং পাকিস্থানেও তিনি সমানভাবে সমাদৃত। এই তিন দেশেই তিনি সঙ্গীতের উপর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে থাকেন। ‘গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে’, ‘কাল তো ছিলাম ভালো’, ‘তুমি আজ কথা দিয়েছো’, ‘বন্ধু তিনদিন’, ‘পান খাইয়া ঠোঁট’সহ অসংখ্য কালজয়ী গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। গুণী এই সঙ্গীতজ্ঞ রয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাধরদের তালিকায়।

রাজ্জাক
বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের তালিকায় নাম উঠে এসেছে নায়ক রাজ রাজ্জাকের নামও। ষাটের দশকের শেষ থেকে পুরো সত্তর দশক রাজ্জাককে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রধান অভিনেতা বলা হতো। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা লাভ করলেও রূপালি জগতে তার অভিষেক ঘটে তৎকালীন পাকিস্থান টেলিভিশনের ঘরোয়া নামের এক ধারাবাহিক নাটকে। চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন আরও পরে সহকারী পরিচালক হিসেবে। কিন্তু সালাউদ্দিনে প্রোডাকশনের ‘তের নাম্বার ফেকু ওস্তাগড় লেন’ এর এক ছোট্ট চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রের মানুষদের নজর কাড়েন তিনি। বেশ কিছু সিনেমায় ছোট ছোট চরিত্র অভিনয় করে ‘বেহুলা’ সিনেমার মাধ্যমে বাংলা চরিত্রের নায়ক রূপে আবির্ভূত হোন।

সাবিনা ইয়াসমিন
বাংলাদেশের আরেকজন প্রখ্যাত শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন চলচ্চিত্রের প্লেব্যাকের সাথে সাথে দেশাত্মকবোধক, লোকজ এবং উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতেও একইভাবে জনপ্রিয়। প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশের সঙ্গীতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র সাবিনা ইয়াসমিন। একমাত্র রুনা লায়লাকে বাংলাদেশের সঙ্গীতে তার সমকক্ষ বলে গণ্য করা হয়। ভারতের বিখ্যাত সুরকার আর.ডি বর্মণের সুরে এবং প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী কিশোর কুমার ও মান্না দে’র সাথে ডুয়েট গান গেয়েছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তার একারই আছে ১২ হাজার গান।

জুয়েল আইচ
বাংলাদেশের প্রখ্যাত যাদুশিল্পী, বংশীবাদক এবং চিত্রশিল্পী জুয়েল আইচ বাংলাদেশের একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তি। খুব ছোটবেলায় বাড়িতে বেদেবহরের যাদু দেখে মুগ্ধ হোন তিনি, একটু বড় হয়ে সার্কাস দলের এক যাদুকরের গলা কাটার যাদু দেখে যাদু শিল্পকে ভালোবেসে ফেলেন। সেই ভালোবাসাই এক সময় উন্মাদনায় পরিণত হলে তিনি নিজেই যাদু শেখা রপ্ত করতে থাকেন। মঞ্চে প্রথম ১৯৭২ সালে যাদু প্রদর্শন করলেও ১৯৭৯ সালেই মিডিয়ায় প্রথম তার আত্মপ্রকাশ ঘটে।

শাহনাজ রহমতুল্লাহ
বাংলাদেশে অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ, দেশাত্মবোধক গানের জন্য তিনি অধিক সমাদৃত। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’, ‘এক তারা তুই দেশের কথা’, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’ কিংবা ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়ে’র মতো অজস্র দেশাত্মবোধক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। মাত্র ১১ বছর বয়সে রেডিও এবং চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করা শাহনাজ রহমতুল্লাহ সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তার পঞ্চাশ বছর পার করেছেন বেশ কয়েক বছর আগেই। বাংলাদেশের অন্যতম ক্ষমতাধরদের একজন হিসেবে তিনিও আছেন তালিকায়।

ফেরদৌসী রহমান
প্রথিতযশা সঙ্গীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমান পল্লীসম্রাট আব্বাস উদ্দিনের সুযোগ্য সন্তান। গত পঞ্চাশ বছর ধরে পল্লীগীতি, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, আধুনিক এবং প্লেব্যাকসহ সঙ্গীতের সব কয়টা মাধ্যমে তার পদচারণা চলে আসছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘এসো গান শিখি’ অনুষ্ঠানের খালামণির মাধ্যমে তিনি শিশুদের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। সম্প্রতি তাকে বাংলাদেশের ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের মধ্যে একজন বলে গণ্য করা হয়েছে।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় চলচ্চিত্রকার তিনি। ‘ব্যাচেলর’ সিনেমা দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে অভিষেক ঘটান ফারুকী। অন্যান্য নির্মাতার থেকে আলাদা এক স্বতন্ত্র ধারায় নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণে ‘ছবিয়াল’ নামে বিশাল এক সংগঠন তৈরি করেন তিনি। তার এক সময়ের সহকারীর প্রায় সকলেই আজ এক একজন সফল নির্মাতা। বাংলাদেশের এই তরুণ নির্মাতা রয়েছেন ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের তালিকায়।

জেমস
বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে জেমস নামে পরিচিত হলেও, তার আসল নাম ফারুক মাহফুজ আনাম। বাংলাদেশের রক সঙ্গীতে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় এক নাম। প্রথমে ফিলিংস এবং পরবর্তীতে নগরবাউল নামের ব্যান্ডের মাধ্যমে দেশের রক মিউজিকে তিনি চমৎকার সব গান উপহার দিয়েছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বলিউডেও প্লেব্যাক করেছেন। ভক্তরা তাকে ‘গুরু’ বলে ডাকতে ভালোবাসেন।

শাকিব খান
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কিং খান নামে পরিচিত শাকিব খানের প্রকৃত নাম মাসুদ রানা। ঢালিউডে সবচেয়ে সফল ও সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া হিরো হিসেবে তার নাম বারবারই আলোচনার শীর্ষে থেকেছে। সম্প্রতি বিবাহ সংক্রান্ত জটিলতায় এবং পরিচালক সমিতির সাথে ঝামেলার কারণে মিডিয়ায় বহু আলোচিত একটি নাম তিনি। বাংলাদেশের ক্ষমতাধরদের মধ্যে তাই নিঃসন্দেহেই আসতে পারে তার নামটাও।

মৌসুমী
আরিফা পারভিন জামান মৌসুমী বাংলাদেশের একজন সফল এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী। প্রায় দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করা মৌসুমী ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন। এছাড়া তিনি প্রযোজক এবং পরিচালকের ভূমিকাতেও থেকেছেন। ২০০৩ সালে নির্মাণ করেছেন তার প্রথম ছবি ‘কখনো মেঘ, কখনো বৃষ্টি’।

কুমার বিশ্বজিৎ
কুমার বিশ্বজিৎ বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য সঙ্গীত শিল্পী। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক এবং গায়ক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সেরা প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে চারবার জাতীয় পুরস্কার পান এই গুণী শিল্পী।

আইয়ুব বাচ্চু
বাংলাদেশের সঙ্গীত অঙ্গনে আইয়ুব বাচ্চু একটি জনপ্রিয় নাম। তার ব্যান্ড এলআরবি নব্বই দশক থেকে তরুণ সমাজে ব্যাপক সমাদৃত। তিনি মূলত রক সঙ্গীত করেন কিন্তু সঙ্গীতের অন্যান্য সেক্টরেও তার অবাধ পদচারণা রয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও বাচ্চু তার কণ্ঠের যাদু দেখিয়েছেন।

হানিফ সংকেত
বিনোদন অঙ্গনের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত। প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমে দর্শক জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছেন। বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করা হানিফ সংকেত একাধারে প্রযোজক, পরিচালক, লেখক এবং উপস্থাপক।

জাহিদ হাসান
জাহিদ হাসান বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন প্রথম সারির অভিনেতা। নব্বই দশক থেকেই টেলিভিশন নাটক অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতাদের একজন তিনি। শুধু নাটক নয়, চলচ্চিত্রেও তিনি নিজের দ্যুতি ছড়িয়েছেন।

মোশাররফ করিম
জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম তার অসাধারণ অভিনয় এবং উচ্চারণ দক্ষতার মাধ্যমে বাংলাদেশের অভিনয় জগতে নিজের স্বতন্ত্র স্থান বানিয়ে নিয়েছেন। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ব্যস্ততম অভিনয় শিল্পীদের মধ্যে তিনি একজন। নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও নিয়মিত অভিনয় করেছেন তিনি।