বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে, এটাই আজ ১৬ কোটি বাঙালির প্রত্যাশা। আমাদের রাজনীতিও যেন সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়।

সরকারের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। কারণ দেশের উন্নতি হলে দলমত নির্বিশেষে সব মানুষই এর সুফল ভোগ করবে। কাজেই উন্নয়ন কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয় সেদিকে সবারই দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজন দায়িত্বশীল আচরণের।

বিএনপির পক্ষ থেকে এই ভাষণকে গতানুগতিক আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে জাতি হতাশ হয়েছে। এই ভাষণে নাকি কোনো দিকনির্দেশনা নেই। যেকোনো কথা বা কাজেরই পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য থাকবে, গণতান্ত্রিক সমাজের এটাই রীতি। তবে এমন কিছু সর্বজনীন সত্য আছে, তা যিনিই বলুন না কেন, সত্য হিসেবে মেনে নেওয়াটাই কাম্য। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণেও এমন কিছু সত্য উঠে এসেছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সবারই ভেবে দেখা প্রয়োজন।

PM Speech National 2

বাংলাদেশ নানা দিক থেকে এগিয়ে চলেছে, এটা কোনো ব্যক্তিবিশেষের দাবি নয়, সারা বিশ্বই আজ তা স্বীকার করছে। বৈশ্বিক নানা সূচকেও তার প্রতিফলন ঘটছে। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, ‘বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক ঐতিহাসিক দিকসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আসুন, দলমত ও বিভক্তির ঊর্ধ্বে উঠে এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখি।’ রাজনীতির উদ্দেশ্য যদি হয় জনকল্যাণ, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানকে স্বাগত জানাতেই হবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতেও রাজনীতির প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা তা স্বীকারও করেন। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন কমই দেখতে পাই। আমরা দেখি, যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন তাঁরা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে চান। আর যাঁরা বিরোধী শিবিরে থাকেন তাঁরা ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর জন্য ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাতে দ্বিধা করেন না। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে প্রধান উদ্যোগটি তাঁদেরই নিতে হবে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। দমনপীড়নের পথ থেকে সরে আসতে হবে এবং সবাইকেই সহনশীল রাজনীতির চর্চা করতে হবে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশে পরিণত করার যে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, এ জন্য আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই। কাঙ্খিত সময়ের মধ্যে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে দেশের উন্নয়নের পথ মসৃণ রাখার কোনো বিকল্প নেই।

বস্তুত দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত হলেও এক ধরনের অস্বস্তি এখনও বিরাজমান। এর কারণ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়া। জাতীয় সংসদে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। সেই সঙ্গে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি পালনে বাধা প্রদান এবং নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলায় রাজনীতি একরকম ঝিমিয়ে পড়েছে। সরকারবিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার বেশির ভাগই রাজনৈতিক বলে তাদের অভিযোগ। এ পরিপ্রেক্ষিতে গণতন্ত্র ও সহনশীলতার জায়গাটিতে সরকারের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে দিকনির্দেশনা থাকলে ভালো হতো। বছরের শেষদিকে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং এ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এক্ষেত্রে যে সুযোগটি তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে হবে। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের কাছেই আমরা সহনশীল আচরণ প্রত্যাশা করি।

PM-National Speech to People

২০১৪ ও ২০১৫ সালে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল, এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হলে কেবল যে দেশের অর্থনীতির চাকা স্থবির হবে তা-ই নয়, বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হবে। এতে উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হবেন।

বর্তমান সরকারের গত দু’বছরে দেশের অর্থনীতিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির লক্ষণ স্পষ্ট হয়েছে। স্বল্প আয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে শুরু হয়েছে পদ্মা সেতুর মূল নির্মাণকাজ, যা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। তবে বিনিয়োগে স্থবিরতা এখনও কাটেনি। গ্যাস-বিদ্যুৎ-অবকাঠামোর সংকট, ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদের হার অব্যাহত থাকা এর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল থাকার ব্যাপারে উদ্যোক্তাদের আস্থার অভাবকেও বিনিয়োগ-স্থবিরতার কারণ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। সরকারকে এসব দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়ে যে দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন, তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা মনে করি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্কের সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা সর্বদা সমুন্নত রাখতে হবে। সারা দেশের মানুষ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম যাতে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আমাদের শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে পরিচিত করানো না হলে তারা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে না।

-সম্পাদক

x

Check Also

জাকাতের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে এগিয়ে আসুন

ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হচ্ছে জাকাত। প্রত্যেক স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক মুসলমান নর-নারীকে প্রতিবছর স্বীয় আয় ...

Scroll Up