বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় সম্পর্ক পহেলা বৈশাখ

40

মীর মোশাররেফ হোসেন : পঞ্জিকার পাতা থেকে ফুরিয়ে গেল আরো একটি বছর। তারই ধারাবাহিকতায় ১৪২৩ সন বিদায় নিয়ে ১৪২৪ সন এখন আমাদের সামনে। পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এ দিনটি বাংলাদেশে নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। এটি বাঙালির একটি সর্বজনীন লোকউৎসব।

বাংলা নববর্ষকে ঘিরে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আকরিক অর্থেই সত্যি। এদিন আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হলো নববর্ষ। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হয় নববর্ষ। এদিন সরকারি বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

সম্প্রতি নববর্ষ উৎসবকে দেশের ঐতিহ্য হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলা নববর্ষ পালন ও ধর্মের মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই। মোগল শাসনামল থেকে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হচ্ছে এবং একই সময়ে মঙ্গল শোভাযাত্রাও শুরু হয়। ‘মঙ্গল’ শব্দটি হিন্দু ধর্ম থেকে উদ্ভূত নয়। এ ছাড়া হালখাতাও মোগল আমল থেকেই পালিত হয়ে আসছে। এ জন্য এ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কোন সুযোগ নেই। পহেলা বৈশাখ একটি সর্বজনীন উৎসব। সকল ধর্মের মানুষ এই উৎসবে যোগ দেয়। এটাই একমাত্র উৎসব, যা সব ধর্মের মানুষ একত্রে পালন করে।

বাঙালির একমাত্র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উৎসব বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা ও আনন্দমুখরতার সঙ্গে উদযাপনের জন্য সরকার বৈশাখী ভাতা চালু করেছে বর্তমান সরকার। সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ এই ভাতা দেয়ার প্রচলন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক ইচ্ছার প্রতিফলন এই বৈশাখী ভাতা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লালন এবং জাতিসত্ত্বার পরিচয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির এমন সার্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব আর দ্বিতীয়টি নেই। বর্ষবরণের এই অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাঙালিকে জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে। সাম্প্রদায়িক ভেদনীতি পরিহার করে সকল বাঙালি একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়। বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে ধরে বিশ্বের বুকে।

এক সময় নববর্ষ পালিত হতো আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। এই কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মুগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তাঁর সিংহাসন-আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়।

বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক
জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে।

অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাঁদের পুরানো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তাঁরা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়।

নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত নববর্ষে তারা বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে, ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করে এবং সকালে স্নানাদি সেরে পূত-পবিত্র হয়। এ দিনটিতে ভালো খাওয়া, ভালো থাকা এবং ভালো পরতে পারাকে তারা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক বলে মনে করে। নববর্ষে ঘরে ঘরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীদের আগমন ঘটে। মিষ্টি-পিঠা-পায়েসসহ নানা রকম লোকজ খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়। একে অপরের সঙ্গে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় চলে। প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার মাধ্যমেও নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, যা শহরাঞ্চলেও এখন বহুল প্রচলিত।

নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সব প্রকার হস্তশিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এই মেলায় পাওয়া যায়। এছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলনা, মহিলাদের সাজ-সজ্জার সামগ্রী এবং বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন: চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা, বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি প্রভৃতির বৈচিত্র্যময় সমারোহ থাকে মেলায়। মেলায় বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিতি থাকে। তাঁরা যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজীর গান, আলকাপ গানসহ বিভিন্ন ধরণের লোকসঙ্গীত, বাউল-মারফতি-মুর্শিদি-ভাটিয়ালি ইত্যাদি আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন। লাইলী-মজনু, ইউসুফ-জুলেখা, রাধা-কৃষ্ণ প্রভৃতি আখ্যানও উপস্থাপিত হয়। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি মেলার বিশেষ আকর্ষণ। এছাড়া শিশু-কিশোরদের আকর্ষণের জন্য থাকে বায়োস্কোপ। শহরাঞ্চলে নগর সংস্কৃতির আমেজেও এখন বৈশাখী মেলা বসে এবং এই মেলা বাঙালিদের কাছে এক অনাবিল মিলন মেলায় পরিণত হয়। বৈশাখী মেলা বাঙালির আনন্দঘন লোকায়ত সংস্কৃতির ধারক।

বাংলাদেশের যেসব স্থানে বৈশাখী মেলা বসে সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, রংপুরের পায়রাবন্দ, দিনাজপুরের ফুলছড়ি ঘাট এলাকা, মহাস্থানগড়, কুমিল্লার লাঙ্গলকোট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মহেশপুর, খুলনার সাতগাছি, ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল অঞ্চল, সিলেটের জাফলং, মণিপুর, বরিশালের ব্যাসকাঠি-বাটনাতলা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, টুঙ্গিপাড়া ও মুজিবনগর এলাকা। ঢাকার নিকটবর্তী শুভাঢ্যার বৈশাখী মেলা, টঙ্গীর স্নানকাটা মেলা, মিরপুর দিগাঁও মেলা, সোলারটেক মেলা, শ্যামসিদ্ধি মেলা, ভাগ্যকুল মেলা, কুকুটিয়া মেলা এবং রাজনগর মেলা উল্লেখযোগ্য। দিনাজপুরের ফুলতলী, রাণীশংকৈল, রাজশাহীর শিবতলীর বৈশাখী মেলাও বর্তমানে বিরাট উৎসবের রূপ নিয়েছে।

কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরানো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে পুণ্যাহ উৎসবের বিলুপ্তি ঘটে। তখন পহেলা বৈশাখ ছিল জমিদারদের পুণ্যাহের দিন। ঢাকার ঘুড়ি ওড়ানো এবং মুন্সিগঞ্জের গরুর দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল এক সময় অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। কিন্তু এদুটিসহ ঘোড় দৌড়, ষাড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, পায়রা ওড়ানো, নৌকা বাইচ, বহুরূপীর সাজ ইত্যাদি গ্রামবাংলার জনপ্রিয় খেলা বর্তমানে আর তেমন প্রচলিত নেই। বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন আঞ্চলিক অনুষ্ঠানের মধ্যে চট্টগ্রামের বলীখেলা এবং রাজশাহীর গম্ভীরা প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনায় অনুষ্ঠিত হয়।

বর্তমানে নগরজীবনে নগর-সংস্কৃতির আদলে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে নববর্ষ উৎযাপিত হয়। পহেলা বৈশাখের প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। এ সময় নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে উদ্যানের কোনো বৃহৎ বৃক্ষমূলে বা লেকের ধারে অতি প্রত্যূষে নগরবাসীরা সমবেত হয়। নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এদিন সাধারণত সব শ্রেণীর এবং সব বয়সের মানুষ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক পরিধান করে। নববর্ষকে স্বাগত জানাতে তরুণীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরে; আর ছেলেরা পরে পাজামা ও পাঞ্জাবি। কেউ কেউ ধুতি-পাঞ্জাবিও পরে। এদিন সকালবেলা পানতা ভাত খাওয়া একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। সঙ্গে থাকে ইলিশ মাছ ভাজা। এভাবে লোকজ বর্ষবরণ প্রথাগুলির কোনো কোনোটির অনুসরণের মাধ্যমে গ্রামীণ ঐতিহ্য অনেকটা সংরক্ষিত হচ্ছে।

বর্ষবরণের চমকপ্রদ ও জমজমাট আয়োজন ঘটে রাজধানী ঢাকায়। এখানে বৈশাখী উৎসবের অনুষ্ঠানমালা এক মিলন মেলার সৃষ্টি করে। নববর্ষের প্রথম প্রভাতে রমনা উদ্যান ও এর চারপাশের এলাকায় উচ্ছল জনস্রোতে সৃষ্টি হয় জাতীয় বন্ধন। ছায়ানটের উদ্যোগে জনাকীর্ণ রমনার বটমূলে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’-এর মাধ্যমে নতুন বর্ষকে বরণ করা হয়। ১৩৭২ বঙ্গাব্দে (১৯৬৫) ছায়ানট প্রথম এ উৎসব শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলার প্রভাতী অনুষ্ঠানেও নববর্ষকে সম্ভাষণ জানানো হয়। এখানকার চারুশিল্পীদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নববর্ষের আহবানকে করে তোলে নয়নমনোহর এবং গভীর আবেদনময়। এ শোভাযাত্রা উপভোগ করে সব শ্রেণীর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। এদিন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ, টি.এস.সি এবং চারুকলাসহ সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।

বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে বাংলা একাডেমী, নজরুল ইনন্সিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, ছায়ানট, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বি.এস.সি.আই.সি), নজরুল একাডেমী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনন্সিটিউশন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলি বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। সেসব কর্মসূচিতে থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, বর্ণাঢ্য মিছিল, বৈশাখী মেলা ইত্যাদি।বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশন পহেলা বৈশাখের ওপর বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে। এছাড়া সংবাদপত্রগুলিতে বঙ্গাব্দ, নববর্ষ ও বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধসহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়।

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলনেও পহেলা বৈশাখ এক নতুন মাত্রা যোগ করে। তৎকালীন আইয়ুব সরকারের আমলে রবীন্দ্রসঙ্গীত তথা বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার বিরোধিতার প্রতিবাদস্বরূপই বৈশাখের প্রথম দিনে
ছায়ানট রমনার বটমূলে নববর্ষ পালনের আয়োজন করে। পরে ক্রমশই এ অনুষ্ঠান বিপুল জনসমর্থন লাভ করে এবং স্বাধীকার আন্দোলনের চেতনায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নীতির বিরুদ্ধে ও বাঙালি আদর্শের লালনে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় বাংলা নববর্ষ পালিত হতে থাকে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে সংস্কৃতি অঙ্গনে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়। বর্তমানে বাংলা নববর্ষ জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।

বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। বৈসাবি হলো পাহাড়ীদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরারা বৈসুক বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা বৈসাবি নামেই পরিচিত। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু এই নামগুলির আদ্যক্ষর নিয়ে বৈসাবি শব্দের উৎপত্তি।
বছরের শেষ দুদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন এ তিনদিন মিলেই মূলত বর্ষবরণ উৎসব ‘বিজু’ পালিত হয়। পুরানো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ উপলক্ষে পাহাড়ীরা তিনদিন ব্যাপী এ বর্ষবরণ উৎসব সেই আদিকাল থেকে পালন করে আসছে। এ উৎসব উপলক্ষে পাহাড়ীদের বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আদিবাসী মেলার আয়োজন করা হয়।

নববর্ষের দিন মারমা উপজাতীয়রা আয়োজন করে ঐতিহ্যবাহী ওয়াটার ফেস্টিবল বা পানি খেলা। পানিকে পবিত্রতার প্রতীক ধরে নিয়ে মারমারা তরুণ-তরুণীদের পানি ছিটিয়ে পবিত্র ও শুদ্ধ করে নেয়। পাহাড়ীদের মধ্যে পানি উৎসবটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীরা বৈসাবি উৎসবকে তিনটি ভাগে পালন করে। প্রথম দিনটির নাম ফুলবিজু। এ দিন শিশুকিশোররা ফুল তুলে ঘর সাজায়। দ্বিতীয় দিনটি হচ্ছে মুরুবিজু। এদিনে হয় মূল অনুষ্ঠান। এদিন নানারকম সব্জির সমন্বয়ে এক ধরনের নিরামিষ রান্না করা হয়, যার নাম পাজন। এটি বৈসাবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের ঐতিহ্যবাহী পিঠা ও মিষ্টান্নও তৈরি করা হয়। অতিথিদের জন্য এদিন সবার ঘরের দরজা খোলা থাকে।

এমন শুভক্ষণে ঘটনাবহুল বিদায়ী ১৪২৩ সনের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি, বিষাদ ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় স্বাগত জানাই ১৪২৪ সনকে। সু-স্বাগতম ১৪২৪।

বিদায়ী বাংলা ১৪২৩ সনটিতে নানান পদক্ষেপ আর সফলতায় সারাবিশ্বে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জল হয়েছে। কোন কোনে  ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রশংসাও কুড়িয়েছে। ফেলে আসা বছরটিতে দেশ জুড়ে ঘটেছে বেশ কিছু স্মরনীয় ঘটনা। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণ থেকে ক্রীড়াঙ্গণ পর্যন্ত সর্বত্রই ছিল সফলতায় ভরা। যদিও কয়েকটি দুর্ঘটনা জনমনে কিছুটা নাড়া দিলেও এসবক্ষেত্রে সরকারের যথাযথ সাহসী উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়। যে কারণে এসব ঘটনা সরকারের উন্নয়ন ও সফলতাকে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারেনি।

মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ)-এর পাঠক-পাঠিকাদের জন্য তারই কিছু অংশ তুলে ধরা হল:

এসব প্রতিটি ঘটনাই এ বছর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার জন্ম দেয়। তবে বছরের মাঝামাঝি ও শেষ সময়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সফলভাবে জঙ্গিদের মোকাবেলা সকলের প্রসংশা কুড়িয়েছে সরকার। এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক সফল অভিযানে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর মদদে দেশের জঙ্গি নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।

হলি আর্টিসান শোয়ালাকিয়া হামলা : চলতি বছরের ১৭ আষাঢ় রাতে হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় হামলা চালায়। হামলায় দেশি-বিদেশি ২০ জন এবং পুলিশের দুই কর্মকর্তা নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৯ ইতালীয়, ৭ জাপানি ও একজন ভারতের নাগরিক। নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তা হলেন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দিন। এ ঘটনায় রাতেই ইসলামিক স্টেট (আইএস) হামলার দায় স্বীকার করে। ঘটনার পরদিন সকালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’ পরিচালনা করে সেনা কমান্ডোর একটি দল। কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। তারা হলো- রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সাবিহ মোবাশ্বের, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল।

গুলশান হামলার রেশ না কাটতেই ঈদুল ফিতরের দিন সকালে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ওপর বোমা হামলা এবং গুলিতে দুই কনস্টেবলসহ চারজন নিহত হন। আট পুলিশ সদস্যসহ আহত হন আরো ১৫ জন। তবে এ ঘটনায় জড়িত আটজনকে তাৎক্ষনিকভাবে আটক করা হয়। হামলার দিনই বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় আবীর রহমান নামে নব্য জেএমবির এক সদস্য। আহত অবস্থায় গ্রেফতার হয় শফিউল নামে আরেক জঙ্গি। এরপর দেশব্যাপী শুরু হয় জঙ্গিবিরোধী অভিযান।

খাদিজার অলৌকিক ফিরে আসা : চলতি বছরের ১৮ আশ্বিন সিলেটের এমসি কলেজে বিএ (পাস) পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার সময় হামলার শিকার হন খাদিজা। সিলেট থেকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে এনে প্রথমেই লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাকে। কয়েকদিন পর লাইফ সাপোর্ট খুলে দুদফা অস্ত্রোপচারের পর ৫৩ দিন পর চলতি বছরের ১২ অগ্রহায়ণ আশঙ্কামুক্ত হন খাদিজা। হাসিমুখে সাংবাদিকদের সামনে আসেন, দেশবাসীর কাছে দোয়া চান। এ ঘটনায় তার হত্যাচেষ্টাকারী ছাত্রলীগ নেতা বদরুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানন্দি দেয় বদরুল। দেশজুড়ে এই বর্বর হত্যাচেষ্টার ঘটনায় ব্যাপক আন্দোলন ও আলোচনা হয়।

চট্টগ্রাম, সিলেট ও মৌলভীবাজারে জঙ্গি অভিযান : মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, সিলেট, মৌলভীবাজার ও কুমিল্লায় সাতটি জঙ্গি আস্তানায় অত্যন্ত সফলতার সাথে অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

চলতি বছরের ২ চৈত্র চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের প্রেমতলায় ‘ছায়ানীড়’ ও  ‘সাধনকুটি’ নামের কাছাকাছি দুটি বাড়িতে দুটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় পুলিশ। পরে পুলিশের বিশেষায়িত টিমের অভিযানে চার জঙ্গি নিহত হয়।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ৯ চৈত্র সিলেটের শিববাড়ির আতিয়া মহলে আরও একটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় পুলিশ। এই আস্তানায় জঙ্গিরা বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডোদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। প্যারা-কমান্ডোরা চার দিনের অভিযানে তাদের পরাস্ত করে। গত ১৩ চৈত্র সেনাবাহিনী অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে। এখানে একজন নারীসহ চারজন জঙ্গি নিহত হয়।

এরপর ১৬ চৈত্র মৌলভীবাজারের নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানা ঘিরে পরিচালিত অপারেশন হিটব্যাক সমাপ্ত ঘোষণা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। এ অভিযানে শিশুসহ সাত থেকে আটজন জঙ্গি নিহত হয়।

১৩৬তম আইপিইউ সম্মেলন : চলতি বছরের একবারে শেষ প্রান্তে ১৮ চৈত্র স্বাগতিক দেশ হিসেবে ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) ১৩৬তম সম্মেলন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, আইপিইউর সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী ও সেক্রেটারি জেনারেল মার্টিন চুংগং।

১৯ চৈত্র থেকে ২২ চৈত্র আইপিইউ সম্মেলনের বিভিন্ন সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে।

বিশ্বের ১৩১টি দেশের ৬৫০ জন সংসদ সদস্য, ৫৩ জন স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং ২০৯ জন নারী পার্লামেন্টারিয়ানসহ মোট ১ হাজার ৩৪৮ জন প্রতিনিধি এই বৃহৎ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। তারা বৈষম্য নিরসন, নারীর ক্ষমতায়নে সংসদের ভূমিকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর : চলতি বছরের ২৪ চৈত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারদিনের ভারত সফরে যান। এরপর চারদিনের সফর শেষে গত ২৭ চৈত্র অর্থাৎ ১০ এপ্রিল’২০১৭ তিনি দেশে ফিরে আসেন। ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারীর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। এ সময় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে হায়দরাবাদ হাউসের বলরুমে বৈঠক শেষে ঢাকা ও নয়াদিল্লীর মধ্যে ৩৬টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

এরমধ্যে ১২টি চুক্তি ও ২৪টি সমঝোতা স্মারক। দুদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত ৯ বিলিয়ন (নয়শ’ কোটি) ডলারের ১৩টি চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারকও এগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

মুফতি আবদুল হান্নানের ফাঁসি কার্যকর : বহুল আলোচিত হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ তিনজনের ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে বাংলা সনটি শেষ হয়েছে।

২০০৪ সালের ২১ মে বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের ফটকে গ্রেনেড হামলায় তিনিসহ ৭০ জন আহত হন এবং তিনজন নিহত হন। ওই ঘটনায় করা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন নাকচ হওয়ার পর মুফতি হান্নানসহ তিন আসামি শেষ সুযোগ হিসেবে গত ২৭ মার্চ কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন।

হুজি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান, বিপুলের ও দেলোয়ার হোসেন রিপনের প্রাণ ভিক্ষার আবেদন নাকচ রাষ্ট্রপতি করলে ৩০ চৈত্র বুধবার কাশিমপুর কারাগারে দু’জন ও সিলেটে একজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট, সমাজসেবক ও শিশু সংগঠক। Email : pakbir@mohammadi-group.com