বড়হাটে অভিযান শেষ, নারীসহ ৩ জঙ্গি নিহত

80

সিলেট ব্যুরো অফিস : মৌলভীবাজার শহরের বড়হাটে সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানায় চলা ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ শেষ হয়েছে। আস্তানার ভেতরে তিনজনের লাশ পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে দুজন পুরুষ ও একজন নারী।

নিহত পুরুষদের মধ্যে একজন সিলেটে শিববাড়িতে সেনা অভিযান চলাকালে জঙ্গি আস্তানার কাছের হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে নিশ্চিত পুলিশ।

অভিযান শেষে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম আজ শনিবার দুপুরে এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানান। ঘটনাস্থলের কাছে হুসেন কমিউনিটি সেন্টার প্রাঙ্গণে ওই ব্রিফিং হয়।

ব্রিফিংয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, বড়হাটের অভিযান বেশ জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ, তাঁদের কাছে তথ্য ছিল, সিলেটের জঙ্গি আস্তানার কাছের হামলাকারীরা এখানে রয়েছেন। তাঁরা টেকনোলজি পরীক্ষা করে দেখেছেন, বড়হাটের আস্তানা থেকে সিলেটে গিয়ে হামলার পর হামলাকারীরা আবার এখানকার আস্তানায় ফিরে এসেছিলেন।

মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘সেদিন থেকেই আমরা বুঝতে পারছিলাম, এখানে শক্তিশালী বোমাসহ প্রচুর বিস্ফোরক এবং বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ বা এ ধরনের কাজের একজন আপার মিড লেভেলের জঙ্গি রয়েছে। এর আগে আমরা জানতে পেরেছিলাম, এখানে তিনজন জঙ্গি রয়েছেন—দুজন পুরুষ ও একজন নারী। তাঁদের মধ্যে যিনি সিলেটে হামলা করেছেন, তাঁর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পেরেছিলাম।’

ব্রিফিংয়ে মনিরুল জানান, জঙ্গিদের বারবার তাঁরা আত্মসমর্পণ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁরা তাতে সাড়া দেননি। তাঁরা তাঁদের জীবিত ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যখনই সোয়াত ঘটনাস্থলের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তখনই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন।

তিনি বলেন, গতকাল শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযান স্থগিত করার পর সোয়াতের ওপর হামলার উদ্দেশ্যে আরও দুটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এই শক্তিশালী বিস্ফোরণে তাঁরা ভবনে ধোঁয়া উড়তে দেখেছেন। তাঁদের ধারণা ছিল, ভবনে আগুন ধরে গেছে। আজ ভবনে ঢোকার পর তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন, অভিযানে তাঁরা নিহত হয়েছেন। আস্তানায় তাঁরা তিনটি লাশ দেখেছেন। একটি ঘরে আগুন ধরে গিয়েছিল।

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘তিন সাহসী কর্মকর্তাসহ সাতজন হত্যার জন্য যারা দায়ী, তাদের তাৎক্ষণিক বিচার হয়তো “ন্যাচারালি” হয়ে গেছে। আমাদের ইচ্ছা ছিল তাঁদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো। সেটি আমরা পারিনি। কিন্তু আমরা মনে করি, সাতজনের মৃত্যুর পর এই অভিযান সন্ত্রাস দমনের অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ভবিষ্যতে বিবেচিত হবে।’

গতকাল দিনভর বাড়িটি ঘিরে অভিযান চলে। সন্ধ্যায় স্বল্প আলোর কারণে অভিযান স্থগিত করা হয়। আজ শনিবার সকাল সাড়ে নয়টার পর থেকে আবারও অভিযান শুরু হয়।

মৌলভীবাজার পৌরসভার ভেতরে বড়হাট এলাকার আবুশাহ দাখিল মাদ্রাসার গলিতে দোতলা বাড়িটি গত মঙ্গলবার রাত থেকে ঘিরে রাখা হয়। গত বুধবার ওই আস্তানা থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়া হয়। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। ৫৩ ঘণ্টা ঘিরে রাখার পর গতকাল সকাল থেকে শুরু হয় সোয়াতের ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’।

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বৈরী আবহাওয়ায় ওই অভিযান বন্ধ ঘোষণা করা হলেও এর কিছুক্ষণ পর বিস্ফোরণের শব্দের পর গুলির শব্দও শোনা যায়।

পরে আজ শনিবার সকাল ৮টার দিকে স্থগিত করা সোয়াতের ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ আবার শুরু হয়। সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটি) প্রধান মনিরুল ইসলাম।

এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গুলির শব্দ পাওয়া যায়। আজ শনিবার অভিযান শুরুর আগে সাংবাদিকসহ সবাইকে সতর্ক থাকার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়।

মহাসড়কের আধা কিলোমিটারের মধ্যে বড়হাট আবুশাহ দাখিল মাদ্রাসা গলির ওই ডুপ্লেক্স বাড়ি ঘিরে সকাল সোয়া ৯টার দিকে সোয়াত, পুলিশ, র‌্যাবকে প্রস্তুত থাকতে দেখা যায়। সেখানে দমকল বাহিনীর পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্সও রাখা হয়।

গতকাল শুক্রবার অভিযান চলাকালে পুলিশের এক সদস্য আহত হন। সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, জঙ্গি আস্তানার ভিতরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটলে ‘স্প্লিন্টারের’ আঘাতে ওই পুলিশ সদস্য আহত হয়। তবে পরে তারা জানায়, জানালার কাচ ভেঙ্গে তিনি আঘাত পেয়েছেন, তবে তা গুরুতর নয়।

গত ২৫ মার্চ সিলেটে সেনা অভিযান চলাকালে জঙ্গি আস্তানা ‘আতিয়া মহলের’ কাছে হামলা হয়। দুই দফা বিস্ফোরণে নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ছয়জন।

গুরুতর আহত হন র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ। গত বুধবার তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এই হামলার দায় স্বীকার করে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)।

গত মঙ্গলবার রাতে মৌলভীবাজার পৌরসভার ভেতরে বড়হাট এলাকার আবুশাহ দাখিল মাদ্রাসার গলিতে দোতলা এই বাড়ি জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ঘিরে রাখেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এই ‘জঙ্গি আস্তানার’ পাশাপাশি প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে নাসিরপুরে আরেকটি বাড়িও ঘিরে রাখা হয়।

গত বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজার শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের নাসিরপুর গ্রামে জঙ্গি আস্তানায় ‘অপারেশন হিট ব্যাক’ শেষ হয়। ওই বাড়ি থেকে চার শিশু, দুই নারীসহ সাতজনের ছিন্নভিন্ন লাশ উদ্ধারের খবর জানায় পুলিশ।

পরে বৃহস্পতিবার ভোরে নাসিরপুরের ওই অভিযান শেষে সাতজনের নিহত হওয়ার কথা জানানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। নাসিরপুরে জঙ্গি আস্তানায় উদ্ধার হওয়া সাতটি লাশের মধ্যে চারটিই শিশু। এর মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী শিশুর বয়স কয়েক মাস বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকেরা।

নাসিরপুরে অভিযান শেষে গতকাল শুক্রবার সকালে বড়হাটে ওই ডুপ্লেক্স বাড়িটিতে ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ শুরু হয়।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, মৌলভীবাজারের নাসিরপুরে জঙ্গি আস্তানায় শিশুদের মাঝখানে রেখে তিন পাশে তিনজন সুইসাইডাল ভেস্টের বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে শিশুদেরও মৃত্যু হয়।

মনিরুল ইসলাম বলেন, যারা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, তাদের পেট ও কোমরের অংশ নেই। তাদের মাংসে তার জড়িয়ে আছে। তাদের আমরা ইসলামবিরোধী, দেশবিরোধী, মানবতাবিরোধী বলব এ জন্যই যে এরা নিজেদের শিশুদেরও রেহাই দেয়নি। এরা এতটা জঘন্য। এরা আসলে দৈত্য। দানবশ্রেণির। মানুষ নয়।