ভালবাসার তাজমহলে বার বার ফিরে আসা

মোসাম্মৎ সেলিনা হোসেন : সুপ্রাচীন ইতিহাসের ছোঁয়ায় ঐতিহ্যময় শহর, প্রেমের শহর আগ্রা। আগ্রা শহরটা বড় অন্যরকম। সে এক পা বাড়িয়ে আছে আধুনিকতার দিকে, তার আর এক পা আজও স্থির ঐতিহ্যে, পুরাতনে। ঘিঞ্জি গলি, তস্য গলি। কিনারি বাজার জমজমাট। বিদেশিদের ভিড়। রাস্তার পাশে বসে পড়ে দেখছে ছোট ছোট দেবদেবীর মূর্তির সম্ভার। এদের সকালে এক কাপড় পরানো হয়, দুপুরে স্নান করিয়ে ফের পালটানো হয় পোশাক। ভাঙা ইংরেজি আর হিন্দিতে যথাসম্ভব এই প্রথার ইতিহাস বোঝাচ্ছে ফেরিওয়ালা। উজ্জ্বল আলোয় রং বিলোচ্ছে মশলা গলি। ঔরঙ্গজেবের আগ্রা, শাহজাহান, নূরজাহানের আগ্রা। অপরিসর গলির ফাঁকে মাথা চাড়া দেওয়া বহুতল, ঘিঞ্জি মহল্লার পাশে ঝাঁ চকচকে শপিং মল যেখানে একসঙ্গে ইতিহাসের গল্প শোনে।

আগ্রা ফোর্ট

প্রিয়তমা পত্নী মুমতাজ মহলের মৃত্যুর পর শোকাহত সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে তৈরি করেছিলেন তাজমহল। দেশ, কালের অতীত বিশ্ববন্দিত এই কীর্তির বিশালত্ব আর অসাধারণ সৌন্দর্যের সামনে স্তব্ধ হয় হৃদয়। পারসিক আর মুঘল স্থাপত্যের সংমিশ্রণে গড়া হয় তাজ। ২০ হাজার কর্মী ২২ (১৬৩২-১৬৫৪) বছরে শেষ করেন এর নির্মাণ। তাজমহলের এক দিকে গেস্ট প্যাভিলিয়ন আর অন্য দিকে লাল বেলেপাথরে তৈরি মসজিদ। বস্তুত, অধিকাংশ মুঘল স্থাপত্যই লাল বেলেপাথরে তৈরি। তাজমহল এক অনন্য ব্যতিক্রম। ৪০০ মিটার চৌকোনা চারবাগ বা মুঘল গার্ডেন দিয়ে ঘেরা ৬০ ফুট ব্যাসের ৮০ ফুট উঁচু মূল গম্বুজের চারপাশে চারটি ছোট গম্বুজে সাজানো তাজমহল। শুভ্র মার্বেলে সেমি প্রেসাস স্টোন, পেন্টি আর ক্যালাগ্রাফির অনুপম কারুকার্য। বলা হয় আমানত খান শিরাজি তাজমহলের গাত্রে অতি যত্নে উৎকীর্ণ করেছেন পবিত্র কোরান। শাহজাহান আর মুমতাজ মহলের সমাধির প্রতিকৃতি রয়েছে ওপরের এক কক্ষে। বেসমেন্টে রয়েছে আসল সমাধি। মুসলিম রীতি মেনে তুলনায় সাদাসিধে এই সমাধি দু’টি।

সন্ধ্যা নামছে ধীরে। আকাশে সোনা রং ধরছে সবে। অপার্থিব আলোয় ভেসে যাচ্ছে শুভ্রমর্মর সৌধ। লাল বেলেপাথরের মসজিদের পিছনে অস্তগামী সূর্যের রাঙা আভা বিষণ্ণ আলো মাখিয়ে দিচ্ছে শ্বেতমর্মরে। অন্ধকার হয়ে আসছে বহমান যমুনা। তবু দীপ্ত বেদনার ইতিহাস, তবু দীপ্ত প্রেম। সত্যিই ‘এক বিন্দু নয়নের জল, কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল। এ তাজমহল।’

ইদমত উদ দৌলা

আগ্রা ফোর্ট উঁচু প্রাচীর আর বিরাট পরিখার সমাহারে সুরক্ষিত দুর্গ তৈরি করেছিলেন আকবর। প্রথমেই জাহাঙ্গির মহল। দেখার মতো সুন্দর দেওয়ান-ই-আম রয়েছে তার পরেই। ৪০ পিলারের উঁচু দরবারে অতি সুন্দর সিংহাসনে শাহজাহান বসতেন প্রজাদের মাঝে। ব্যক্তিগত দেখাসাক্ষাতের জন্য নির্দিষ্ট ছিল দেওয়ান-ই-খাস। বহুমূল্য ময়ূর সিংহাসন ছিল এখানেই। পরে যেটি লুঠ হয় নাদির শাহের হাতে। তেহখানায় যাওয়ার সিঁড়ি রয়েছে কাছেই। প্রবল গ্রীষ্মে মাটির তলার ঠাণ্ডা ঘরে আশ্রয় নিত রাজপরিবার। বেগমদের স্নানের জায়গা শিশমহল রয়েছে অঙ্গনে। অজস্র কাচ হাজার প্রতিবিম্বে ভেঙে যেত শিশমহলে। সম্রাটের বিশ্রামঘর খাসমহল, মচ্ছি ভবন, নাগিনা মসজিদ, মোতি মসজিদ— সবই রাজকীয় আভিজাত্য আর কারুকার্যে মোড়া। দেওয়ান-ই-খাস-এর পাশে মুমতাজের জন্য শাহজাহান তৈরি করেছিলেন মুসম্মন বুর্জ। অদৃষ্টের এমনই পরিহাস যে প্রিয়তমা পত্নী মুমতাজ আর তার সন্তান ঔরঙ্গজেব জীবনের শেষ আট বছর তাঁকে বন্দি করে রাখে এখানে। বলা হয়, এখানে থেকে তাজমহলের দিকে তাকিয়েই যন্ত্রণাময় শেষ দিনগুলি কাটান শাহজাহান।

শাহজাহান ও মুমতাজের সমাধি

আগ্রা-দিল্লি সড়কপথে মুঘল বাদশাহ আকবরের সমাধি সিকান্দ্রা। প্রবেশপথে সুবিশাল বুলন্দ দরওয়াজা। সমাধির ওপর পাঁচতলা সৌধ ফতেপুর সিক্রির আদলে। প্রথম তিনটি তলা লাল বেলেপাথরের। চতুর্থ তলা শ্বেতমর্মরের। হিন্দু ও মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর অনবদ্য নিদর্শন সিকান্দ্রা। এ ছাড়াও চিনি কা রৌজা, দয়ালবাগ, জামি মসজিদ দেখা যেতে পারে আগ্রায়।

ভালবাসা বাঙ্ময় এই শহরে। শুধু তাজমহলই তো নয়, এ যে মির্জা গালিবেরও শহর। এই অনন্য অভিজ্ঞতার সামনে নতজানু হয় হৃদয়। বার বার ফিরে আসা যায় আগ্রায়। বার বার আবিষ্ট হওয়া যায় মুগ্ধতায়, প্রেমে।

x

Check Also

আজ বুধবারের দিনটি আপনার কেমন যাবে?

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : আজ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বুধবার। নতুন সূর্যালোকে আজ বুধবারের দিনটি আপনার ...

Scroll Up