ভোটারদের ভূমিকা : সফল গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি

176
মীর মোশাররেফ হোসেন পাকবীর : একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক সমাজে এমন একটি সরকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেটি কিনা জনগণকে জোর করে সরকারকে অনুসরণ করতে বাধ্য করার বদলে জনগণের ইচ্ছাকেই অনুসরণ করবে। প্রাক্তন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের ধারণা দিতে খুব সহজ শব্দে বলেছিলেন, “জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য সরকার”। তাই, গণতন্ত্র কিছু মানুষের সরকার নয় এবং এটি সকলের অংশগ্রহণ দাবী করে।
যদিও বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এটি সম্ভব হয় না কিন্তু সকলের অংশগ্রহণের জন্য সম্পূর্ণ প্রচেষ্টা থাকতে হবে। আমরা সরকার অথবা নির্বাচন কমিশনের উপরে নির্বাচনের দায়-দায়িত্ব প্রদান করে থাকি। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সরকার গঠনের সকলক্ষেত্রে আমাদের ভোটারদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী প্রচলিত চর্চা অনুযায়ী, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভোটারের কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের দেশে এটি প্রায়শই দেখা যায় যে, নির্বাচনে ভোট দেবার গুরুত্বের ব্যাপারে জ্ঞান না থাকায়, জনগণ ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হবার উপরে খুব একটা জোর দেয় না।
তদুপরি, অনেকেই এমন নির্বাচনী এলাকা থেকে ভোটার হয় যেখানে তারা আসলে থাকে না। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, তারা তাদের বসবাসরত এলাকার উন্নয়নে অংশগ্রহণ করার অধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করে।
ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার প্রক্রিয়াটা আমাদের দেশে বেশ জটিল। যদিও বর্তমান সরকারের তত্ত্বাবধানে দেশব্যাপী জোরদার ভোটার নিবন্ধন কর্মসূচীর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি অপেক্ষকৃতভাবে সহজতর হয়েছে, কিন্তু এটি এখনও যথেষ্টই জটিল।
যেহেতু আমাদের শিক্ষার হার আশাব্যঞ্জক নয় তাই ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করার প্রক্রিয়াটি এমন করা উচিৎ যেন নূন্যতম শিক্ষিত কোন ব্যক্তিও সহজেই ভোটার হিসেবে কোন জটিলতা ছাড়াই নিবন্ধিত হতে পারে।
নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করাটা একজন ভোটারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অনেক ভোটারই ভোট দেবার পরোয়া করে না অথবা ভোটের ফলাফল নিয়ে চিন্তিত নয় অথবা নির্বাচনে মনোনীত প্রার্থীদের সাথে তারা পরিচিত নয়- এ ধরণের অজুহাত দেখিয়ে নির্বাচনে ভোট প্রদানের দায়িত্ব থেকে দূরে থাকে। কিন্তু ভোটের এই অধিকার প্রয়োগ না করার মাধ্যমে, তারা আসলে অন্যদেরকে তাদের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেবার সুযোগ করে দেয়। যারা ভোট কেন্দ্রে  যাবার কষ্টটুকু বরে না, তাদের আওয়াজও সমাজের উন্নয়নে ধ্বনিত হয় না। এটি নির্বাচনের দিনে একজন ভোটারের, গুরুত্বের সাথে ভোট দেওয়ার পেছনে একটি মৌলিক কারণ।
নির্বাচনের ফলাফল একজন ভোটারের ব্যক্তি স্বাধীনতা, আয়কর এবং অন্যান্য দৈনন্দিন জীবনের অনেকে কিছুকেই প্রভাবিত করতে পারে যদিও আমরা সেটা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারি না। একটি নির্বাচনের ফলাফল যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে সেটি বিবেচনা করে জনগণকে গুরুত্বের সাথে ভোটাধিকার প্রয়োগের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যত গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে।
তার উপরে, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি একটি নির্বাচনের ফলাফলের উপরে অনেকটাই নির্ভর করে। তাই, দেশের জন্য সঠিক নেতৃত্ব বের করে আনতে একটি মাত্র ভোটও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা একজন ভোটার হিসেবে হয়তো আমাদের একটি মাত্র ভোটের গুরুত্ব অনুধাবন  করতে পারি না কিন্তু এই একটি ভোট নির্বাচনে সমন্বিত সিদ্ধান্ত বয়ে আনে।
ভোটারদের আরেকটি জরুরি দায়িত্ব হচ্ছে নিজেদের তথ্য হালনাগাদ রাখা। অনেক সময়েই আমাদের আশপাশের এলাকার উন্নয়নে আমাদের ভোটের ভূমিকা রাখার নিমিত্তে একজন ভোটারকে তার বসবাসের এলাকা এক নির্বাচনী এলাকা থেকে আরেক নির্বাচনী এলাকায় পরিবর্তন করতে হয়। এছাড়াও একজন ভোটারের নানা ধরণের তথ্য সময়ে সময়ে পরিবর্তণ হতে পারে যেগুলো একটি নিয়মিত বিরতিতে হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
সরকার সাধারণত নির্বাচনের আগে এই তথ্যগুলো হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়ে থাকে। কিন্তু ভোটারদের নিজ থেকেই এই উদ্যোগ নেয়া উচিৎ। একটি মুক্ত ন্যায্য নির্বাচনের জন্য ভোটারদের হালনাগাদ তথ্যভান্ডার অত্যাবশ্যক। তাই আমাদের ভোটের সঠিক ব্যবহারের জন্য স্বপ্রণোদিতভাবেই আমাদের তথ্য হালনাগাদ করা উচিৎ।
এই মৌলিক দায়িত্বগুলোর পাশাপাশি, বিশেষত আমাদের মতো দেশে ভোটারদের আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হয়। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সঠিক ব্যক্তিকে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করার দায়িত্ব এখানে ভোটারদেরকেই পালন করতে হবে।
মুর্খের মতো একজন ভুল ও অযোগ্য প্রার্থীকে ভোট প্রদানের মাধ্যমে একজন ভোটার তার নিজের, তার পরিবারের, তার সমাজের এবং সর্বোপরি তার রাষ্ট্রের ভবিষ্যতকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচন করার গুরুত্ব ও বৃহত্তর পরিসরে এর প্রভাব বুঝতে পারাটা খুবই গুরুক্বপূর্ণ। একটি দেশে টেকসই গণতন্ত্রের ধারণার সাথে ভোটারদের ভূমিকার মৌলিক সম্পর্ক বিদ্যমান।
আইনের শাসন, তথা কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রের আইনের উর্দ্ধে নয়; সকল মৌলিক অধিকার, যেমন বক্তব্য  ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্ম ও মূল্যবোধের স্বাধীনতা, সমাবেশের এবং নাগরিক স্বাধীনতা ইত্যাদি দেশের সকল নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের অধিকার যেনো কারো দ্বারা লঙ্ঘিত না হয়-এই বিষয়গুলো একটি গণতান্ত্রিক সরকারের মৌলিক নীতিমালার অন্তর্ভূক্ত।
কিন্তু এই মৌলিক নীতিগুলি নিশ্চিত করার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, ভোটাররা যেনো কোন ধরণের প্রভাব, ভীতি বা আর্থিক সুবিধা ছাড়াই পূর্ণ স্বাধীনতার সঙ্গে তাদের ভোট প্রদান করতে পারে যাতে করে শুধুমাত্র যোগ্য প্রার্থীরাই জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়।
আমাদের দেশে দুর্বল প্রকৃত শিক্ষার হারের কারণে ভোটাররা যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে অক্ষম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা কিছু লোক বা গোষ্ঠীর দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং যেভাবে তাদেরকে দিক-নির্দেশনা দেয়া হয় সেমতেই অন্ধভাবে তাদের ভোট প্রদান করে। এর ফলে জঙ্গিবাদী, চরমপন্থী ও দুর্নীতিগ্রস্থ নেতাদের ক্ষমতায় আসার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
এভাবে ভোট দিয়ে তারা যদিও মনে করে তারা স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে কিন্তু আসলে তা নয়। এ ধরণের প্রভাব একজন প্রার্থীর সম্পদ, প্রার্থীর ত্রাস এবং অন্ধভাবে একটি বিশেষ দলকে অনুসরণ করার মাধ্যমে উৎপন্ন হতে পারে। এর উপরে, ভাল কাজ করার পরেও আমাদের নাগরিকেরা নির্বাচনে সরকারে যেই দল থাকে, তাকে প্রত্যাখ্যান করার একটা মনোভাব পোষণ করে।
আমাদের অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত নাগরিকদের জন্য দেশের উন্নয়নের প্রেক্ষাপটটা বুঝাটাই যেখানে অত্যন্ত কঠিন, যেখানে টেকসই গণতন্ত্রের ধারণাটা বোঝা প্রায় অসম্ভব। এই অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হলে ইউনেস্কোর মান অনুযায়ী দেশের প্রকৃত শিক্ষার হারের উন্নতি করার উপরে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা আবশ্যক।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার শিক্ষার উপরে অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করে আসছে। কিন্তু দেশের শতভাগ জনগণকে প্রকৃত শিক্ষার আওতায় আনতে হলে আরও বেশি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন।
বিশ্বাসযোগ্য ও সৎ লোক বা প্রার্থীকে ভোট প্রদান করাটা সর্বদাই যুক্তিযুক্ত। ভোট কোন রাজনৈতিক দলকে নয় বরং প্রার্থীকে দিতে হবে কারণ এটি দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে। অন্যথায় ফলাফল হবে অর্থহীন কারণ দুর্নীতিগ্রস্থ নেতা ও রাজনীতিবিদরাই ক্ষমতায় আসবে। তাই আমাদের উচিৎ এমন কাউকে ভোট দেবার উদ্যোগ নেয়া, যার মাধ্যমে আমাদের সামগ্রিক মতামত প্রতিফলিত হবে।
ভোটাররাই পরিবর্তনের ধারক ও বাহক। পরিবর্তন যা উন্নততর উন্নয়ন কর্মকান্ড ও গঠনমূলক নেতৃত্বের সাপেক্ষে হবে। নাগরিকেরা এমনকি নির্বাচনে সরকার বা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নীতির প্রতি তাদের অসন্তোষও প্রকাশ করতে পারে।
দুঃখজনকভাবে, আমাদের জনগণ এখনও তাদের বিকল্পগুলো বিচারের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেনি এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা আবেগ দ্বারা চালিত হয়। পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য একটি খারাপ সরকার নির্বাচন করাকে এড়াবার জন্য অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। এই সচেতনতা তৈরিতে এখনই প্রচার চালানো শুরু করা উচিৎ কারণ আগামী জাতীয় নির্বাচন আর খুব বেশী দূরে নয়।
আমরা প্রায়ই এটা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই যে,  ভোটের অধিকার একটি বিশেষ সম্মান যা আমাদেরকে সরকার গঠনে সরাসরি অংশ নেবার সুযোগ করে দেয়। আমাদেরকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অবশ্যই সৎ, দুর্নীতিমুক্ত, স্বপ্নদর্শী, চিন্তাশীল  এবং দৃঢ় জাতীয়তাবোধের অনুভূতিসম্পন্ন প্রার্থী দাবি করতে হবে।
যদি আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে একটি শক্ত বার্তা পৌঁছাতে পারি যে, আমরা ভোটার হিসেবে আর অন্ধভাবে আমাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করবো না, তাহলে তারা ভালো রাজনৈতিক নেতা গড়ে তোলায় ও নির্বাচনে তাদের প্রার্থী করায় বাধ্য হবে। যদি আমরা এটি করতে সক্ষম হই, তবে সুযোগ্য নেতাদের হাত ধরেই দেশের সুন্দর ও উন্নত ভবিষ্যত নিশ্চিত হবে।
এজন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোটারদের তাদের দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করা। তাহলেই শুধুমাত্র আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলার দিকে আমরা অগ্রসর হতে পারবো, যা প্রতিটি বাংলাদেশী নাগরিকের আজন্ম প্রত্যাশা।
লেখক : প্রধান সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ) এবং
ভাইস চেয়ারম্যান, ডেমোক্রেসী রিসার্চ সেন্টার (ডিআরসি)।