মার্কিন পার্লামেন্টে জাকারবার্গের ক্ষমা প্রার্থনা

28
এমএনএ সাইটেক ডেস্ক : পাঁচ কোটি ব্যবহারকারীর তথ্য চুরির দায় স্বীকার করে মার্কিন পার্লামেন্টে ক্ষমা চেয়েছেন জনপ্রিয় সোশাল মিডিয়া ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ।
ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটরদের মুখোমুখি হয়ে নিরাপত্তায় অবহেলার দায় নিজের কাঁধে নিয়েছেন তিনি। সেখানে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের ৪৪ জন আইনপ্রণেতা জেরা করেন জাকারবার্গকে।
বক্তব্যের শুরুতেই তথ্য কেলেঙ্কারির কথা স্বীকার করে আনুষ্ঠানিভাবে ক্ষমা চান মার্ক জাকারবার্গ। এরপর তিনি বলেন, এটা এখন স্পষ্ট যে ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষায় আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছি। ফলে ভুয়া খবর, নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপ ও তথ্য চুরির মতো ঘটনা ঘটেছে।
মার্ক জাকারবার্গ বলেন, আমরা আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলাম না এবং এটা ছিল বড় ভুল। আমি ফেসবুক প্রতিষ্ঠা করেছি এবং এটি আমি পরিচালনা করি। তাই এখানে যা ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে যা ঘটবে তার দায় আমার। আমি আবারও দুঃখ প্রকাশ করছি।
তিনি বলেন, আমরা আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি নিইনি এবং এটি একটি বড় ভুল ছিল। এটি একটি বড় ভুল ছিল এবং আমি দুঃখিত। আমি ফেসবুকে শুরু করেছিলাম। আমি এটি চালাই এবং এখানে কি ঘটবে তার জন্য আমি দায়ী।
মার্কিন সিনেট জুডিসিয়ারি এবং কর্মাস কমিটি তাকে যৌথভাবে জেরা করেন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার শুনানিতে জাকারবার্গ ফেসবুকের তথ্য সংগ্রহের প্রচেষ্টায় প্রশ্ন তুলেন এবং ইন্টারনেট কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তার মতামত দেন।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়া থেকে ক্রমাগতভাবে ফেসবুকের অপব্যবহারের চেষ্টা চলছে বলে সিনেটরদের জানিয়েছেন জাকারবার্গ।
তিনি বলেছেন, তার প্রতিষ্ঠানকে সর্বক্ষণ এর সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। বিষয়টিতে তিনি তুলনা করেন অস্ত্র প্রতিযোগিতার সঙ্গে।
প্রায় আট কোটি ৭০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য লন্ডনভিত্তিক রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার হাতে যাওয়ার ঘটনা সম্প্রতি প্রকাশ পায়, যা নিয়ে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে তদন্ত চলছে।
এর ধারাবাহিকতায় মার্কিন সিনেটের বাণিজ্য ও বিচারবিভাগীয় কমিটির সামনে জাকারবার্গের ডাক পড়ে।
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারের কৌশল নির্ধারণে ওই ফেসবুক গ্রাহকদের তথ্য ব্যবহার করেছিল কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা।
গতকাল মঙ্গলবার সেই শুনানিতে হাজির হয়ে সিনেটরদের প্রশ্নের জবাবে জাকারবার্গ বলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রচার শিবিরের সঙ্গে রাশিয়ার যোগাযোগের অভিযোগ নিয়ে তদন্তে থাকা স্পেশাল কাউন্সেল রবার্ট মুলার ফেসবুকের কর্মীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন।
মুলারের অফিসে যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে নিজে ছিলেন না জানিয়ে প্রকাশ্য শুনানিতে গোপনীয় ওই বিষয়ের বিস্তারিত বলতেও রাজি হননি তিনি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মুলারের দপ্তর রাশিয়ার ১৩ নাগরিক ও তিনটি কোম্পানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাব হস্তক্ষেপের অভিযোগ আনে। ওই কোম্পানিগুলোর একটি ইন্টারনেট গবেষণা সংস্থাও ছিল, যাকে ‘রাশিয়ার ট্রল ফার্ম’ নামেও ডাকা হয়।
মুলারের দপ্তরের অভিযোগ, রাশিয়ার ওই কোম্পানি মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ‘বিবাদের বীজ বপনের’ কৌশল নিয়েছিল।
শুনানিতে জাকারবার্গ বলেন, তার প্রতিষ্ঠান এখন ভুয়া অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করার জন্য নতুন কিছু টুলস নিয়ে কাজ করছে।
রাশিয়ায় কিছু মানুষ আছে যাদের কাজ হচ্ছে আমাদের কার্যক্রম, অন্যান্য ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ও অন্যান্য ব্যবস্থাকে নিজেদের কাজে লাগানোর চেষ্টা করা। এটা ঠেকাতে আমাদের চেষ্টা বাড়াতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে আরও বিধিনিষেধের মধ্যে না আনার বিষয়ে প্রথমদিকে খানিকটা অনড থাকলেও পরে চাপের মুখে ‘সঠিক বিধিনিষেধকে’ স্বাগত জানানোর কথাও বলেছেন ৩৩ বছর বয়সী এ বিলিয়নেয়ার টেক টাইটান।
হাতিয়ে নেওয়া তথ্য ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা সরিয়ে ফেলেছে, বিস্তৃত পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই এ ধরনের কথায় বিশ্বাস করা ‘ভুল হবে’ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ফেসবুকে ‘একচেটিয়া’ ব্যবসা করছে, এ অভিযোগও উড়িয়ে দেন।
শুনানির প্রথম বিরতি পর্যন্ত ফেসবুক নির্বাহীর এ অবস্থান এবং সিনেটরদের প্রশ্নের জবাবে দেওয়া উত্তর মার্কিন শেয়ার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ফেসবুকের শেয়ার মূল্য প্রায় ৫ শতাংশ বাড়ায় প্রধান নির্বাহী হিসেবে জাকারবার্গের মোট সম্পদও বেড়ে গেছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।
ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশ হওয়ার পর প্রথম সপ্তাহেই ফেসবুকের শেয়ার মূল্য প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলার কমেছিল।
গত মাসে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার সাবেক কর্মী ক্রিস্টোফার উইলি ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য হাতানোর ঘটনা ফাঁস করে দিলে বড় ধরনের ধাক্কা খায় ফেসবুক।
তীব্র সমালোচনার মুখে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের প্রাইভেসি সেটিংসে পরিবর্তন আনে। বিজ্ঞাপনদাতাদের পরামর্শক হিসেবে কাজ করে- এমন কয়েকটি ডেটা ব্রোকার ফার্মের সঙ্গে ব্যবসাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা ওই তথ্য কিনেছিল ‘দিস ইজ ইওর ডিজিটাল লাইফ’ নামের একটি কুইজভিত্তিক ফেসবুক অ্যাপের মালিকের কাছ থেকে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের তৈরি করা ওই অ্যাপের মাধ্যমে চালানো ওই কুইজে অংশ নিয়েছিলেন ৩ লাখ ৫ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী। আর তাদের বন্ধুতালিকা থেকে আরও কয়েক কোটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টধারীর ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল ওই অ্যাপের মাধ্যমে।
গ্রাহকদের ওই ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করেছিল কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা। ফেসবুক কর্তৃপক্ষও তাদের ওই কথায় ভরসা রেখিছিল। কিন্তু চ্যানেল ফোর এক প্রতিবেদনে দেখিয়ে দেয়, ট্রাম্পের ভোটের প্রচারে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার ব্যবহার করা তথ্যের একটি অংশ এখনও বাইরে রয়ে গেছে।
জাকারবার্গ সম্প্রতি বলেন, তিনি আগে ভাবতেন, ফেসবুকের সুবিধা কে কীভাবে ব্যবহার করল, সেই দায় ব্যবহারকারীর ওপরই বর্তাবে। কিন্তু এখন ফেসবুক প্রধানের ধারণা হয়েছে, তার সেই চিন্তায় সীমাবদ্ধতা ছিল। তিনি এখন বুঝতে পারছেন, ফেসবুককেও আরও দায়িত্ব নিতে হবে।