মিন্নির জবানবন্দির বিষয়ে জানতে চান হাইকোর্ট

এমএনএ রিপোর্ট : রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার আগে নাকি পরে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির দোষ স্বীকার-সংক্রান্ত বিষয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার (এসপি) প্রেস-কনফারেন্স করেছিলেন তার সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়েছেন হাইকোর্ট।

মিন্নিকে কবে পুলিশ লাইনসে নেয়া হয়, কবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়, কবে ১৬৪ ধারায় দায় স্বীকার করে জবানবন্দি নেয়া হয়, কবে পুলিশ সুপার সংবাদ সম্মেলনে মিন্নি জড়িত বলে বক্তব্য দেন- মিন্নির আইনজীবীকে তা আদালতে আগামীকাল উপস্থাপনের নির্দেশ দেন আদালত এবং জামিন শুনানি কাল পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।

এসব তথ্য যুক্ত করে আগামীকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টে সম্পূরুক আবেদন দাখিল করতে মিন্নির আইনজীবীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আজ সোমবার জামিন আবেদনের শুনানিতে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন। আদালত বলেন, সম্পূরুক আবেদন দাখিল করুন। আগামীকাল মঙ্গলবার বেলা ২ টায় শুনানি হবে। জামিন আবেদনের শুনানিতে মিন্নির আইনজীবী জেডআই খান পান্না বলেন, মিন্নি ১৯ বছরের একটি মেয়ে। সে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। হত্যাকাণ্ডের ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ ১১ টি ক্লিপে বিভক্ত করে পুলিশ দাবি করছে মিন্নি এতে জড়িত।

মিন্নির পক্ষে জামিন আবেদনটি উপস্থাপন করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। তাঁকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী মাক্কিয়া ফাতেমা ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারোয়ার হোসাইন বাপ্পী।

এর আগে ৮ আগস্ট বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের অবকাশকালীন বেঞ্চে শুনানির পর জামিন পাওয়ার আশা না দেখে মিন্নির আইনজীবী জেডআই খান পান্না আবেদনটি ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। ওই আবেদনটিই রোববার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চে দাখিল করা হয়েছে।

মিন্নির এক আইনজীবী জানান, জামিন আবেদন করা হয়েছে। আজ সোমবার এটি কার্যতালিকায় উঠবে।

আদালতে ১৬৪ ধারায় মিন্নিসহ আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না আনতে পারলে জামিন হবে না, হাইকোর্টের এমন শর্তের পর ৮ আগস্ট আবেদনটি ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে আইনজীবী জেডআই খান পান্না বলেন, ‘আমরা ১৬৪ ধারা পাইনি। আর এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে, ১৬৪ নিয়ে আমাকে জামিন আবেদন করতে হবে। চার্জশিট না হলে আমাকে ১৬৪ দেবে কেন পুলিশ। চার্জশিট হওয়ার আগে ১৬৪ দেয়ার বিধান নেই।’

জেড আই খান পান্না বলেন, ডিআইজি মিজানকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আর মিন্নিকে ৫ দিনের রিমান্ডে পুলিশ লাইনে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মিন্নি আদালতে বলেছে তাকে পুরুষ পুলিশ কর্তৃক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করেছে। ইতোমধ্যে ওই জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন তিনি।

আদালত বলেন, রিমান্ডে নেওয়ার আগেই কি তাকে পুলিশ লাইনে নেয়া হয়েছে? আইনজীবী বলেন, প্রথমে তাকে পুলিশ লাইনে নেয়া হয়। পরে রিমান্ডে নেয়া হয়। যা সংবিধান পরিপন্থী।

আদালত বলেন, পত্রিকায় এসেছে মিন্নিকে প্রথমে পুলিশ লাইনে নিয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ওইদিন রাতেই তাকে আসামি করা হয়েছে। পরদিন রিমান্ডে নেয়া এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পূর্বেই বরগুনার পুলিশ সুপার প্রেস-কনফারেন্স করে বলেছে মিন্নি দোষ স্বীকার করেছে। এগুলো কি জামিন আবেদনে উল্লেখ করেছেন।

আইনজীবী বলেন, আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তখন আদালত বলেন, আবেদনের কোথাও তো তা দেখতে পাচ্ছি না। এরপরই হাইকোর্ট এসব তথ্য যুক্ত করে সম্পূরুক আবেদন দাখিলের জন্য মিন্নির আইনজীবীকে নির্দেশ দেয়।

গত ৮ আগস্ট হাইকোর্টের একটি অবকাশকালীন ডিভিশন বেঞ্চ মিন্নিকে জামিন দেয়নি। এ অবস্থায় তার আইনজীবী আবেদনটি ফেরত দেওয়ার আবেদন জানালে হাইকোর্ট তা মঞ্জুর করে। এরপর রবিবার হাইকোর্টের নিয়মিত বেঞ্চে জামিন আবেদনটি শুনানির জন্য পেশ করা হয়।

রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গত জুলাই মাসে ম্যাজিস্ট্রেট এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালত মিন্নির জামিন আবেদন খারিজ করে দেয়। পরে ওই খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে তিনি জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন।

২৬ জুন রিফাতকে বরগুনার রাস্তায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সে সময় স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নির চেষ্টার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে আলোচনার সৃষ্টি হয়।

পর দিন রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরিফ ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন, তাতে প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল মিন্নিকে। পরে মিন্নির শ্বশুর ছেলে হত্যায় পুত্রবধূ মিন্নির জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করলে ঘটনা নতুন দিকে মোড় নেয়।

১৬ জুলাই মিন্নিকে বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মিন্নি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানায়। পরে মিন্নি জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেন আদালতে। মিন্নির বাবার অভিযোগ, ‘নির্যাতন করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে মিন্নিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে পুলিশ।’

গত ৩০ জুলাই মিন্নির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত।

এর আগে ২২ জুলাই বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে প্রথমবার মিন্নির জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী মো. মাহবুবুল বারী আসলাম। ওই দিনই শুনানি শেষে আদালতের বিচারক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজী মিন্নির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।

পরে ২৩ জুলাই ‘মিস কেস’ দাখিল করে বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আসাদুজ্জামানের আদালতে ফের জামিনের আবেদন করেন মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম। পরে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের নথি তলব করে ৩০ জুলাই জামিন শুনানির দিন ধার্য করেন।

সেদিন তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে উভয়পক্ষের শুনানি হয়। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেন আদালত। তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির আদালতে উপস্থিত হলে এ হত্যাকাণ্ডে মিন্নির সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হয়। সবার উপস্থিতিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ল্যাপটপে হত্যাকাণ্ডের আগের ও পরের ভিডিও ফুটেজ দেখান। এ ছাড়া মিন্নির ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিসহ হত্যার আগে ও পরে প্রধান আসামি কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়ন বন্ডসহ অন্যান্য আসামির সঙ্গে মিন্নির কললিস্টের তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন। শুনানি শেষে মিন্নির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন জেলা ও দায়রা জজ আদালত।

x

Check Also

ছাত্রলীগের নতুন দুই কাণ্ডারির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এমএনএ রিপোর্ট : ছাত্রলীগের নতুন দুই কাণ্ডারি হিসেবে আল-নাহিয়ান খান জয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং লেখক ...

Scroll Up