মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ১৫ ব্যাংক, শীর্ষে বিকাশ

32

এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : অল্প সময়ের ব্যবধানে আরো ১৫টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করলেও বিকাশের জনপ্রিয়তা ও ব্যবসায়িক কর্মপন্থার সঙ্গে পেরে উঠতে পারেনি কেউই। বিকাশের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে অন্যান্য ব্যাংকও তাই সহযোগী প্রতিষ্ঠান খুলে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইছে।

যদিও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের হাত ধরে ২০১১ সালে দেশে শুরু হয় মোবাইল ব্যাংকিং। ওই বছরই যুক্তরাষ্ট্রের ‘মানি ইন মোশন এলএলসি’র সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এ সেবায় প্রবেশ করে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’।

মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠান আজিয়াটা ডিজিটালের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে সহযোগী প্রতিষ্ঠান খুলে মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালনার চেষ্টা করছে বেসরকারি ট্রাস্ট ব্যাংক। ২০১৫ সাল থেকেই এ চেষ্টা করছে ব্যাংকটি। বিকাশের মতো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবাটি প্রদানে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), মার্কেন্টাইল ও সাউথইস্ট ব্যাংকের পর্ষদ এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আরো বেশকিছু ব্যাংকের পর্ষদেও এ ব্যাপারে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

২০১৫ সালের ২৫ নভেম্বর পর্ষদের বৈঠকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য পৃথক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় বেসরকারি খাতের ট্রাস্ট ব্যাংক। মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠান আজিয়াটা ডিজিটালের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে ‘ট্রাস্ট আজিয়াটা ডিজিটাল লিমিটেড’ নামে মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালনা করতে চায় ব্যাংকটি।

এক্ষেত্রে ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫১ শতাংশ ও আজিয়াটা ডিজিটালের ৪৯ শতাংশ মূলধন জোগান দেয়ার কথা। ২০১৬ সালের শুরুতেই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করে ট্রাস্ট ব্যাংক। কিন্তু বিকাশের পর অন্য কোনো ব্যাংককে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের অনুমোদন দিতে অনাগ্রহের কথা জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর পর দফায় দফায় চেষ্টা ও তদবির করে এক বছরেও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন পায়নি ট্রাস্ট ব্যাংক।

জানতে চাইলে ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ট্রাস্ট দেশের ব্যাংকিং খাতের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ কমপ্লায়েন্ট ব্যাংক। সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ট্রাস্ট ব্যাংককে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সুযোগ দিলে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য আমরা আরো বেশি কাজ করতে পারতাম। এর মধ্যেমে দেশের মোবাইল ব্যাংকিংয়ে আরো বেশি স্বচ্ছতা ও প্রসারতা আসত। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ ব্যাংক শিগগিরই আমাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেবে।

ট্রাস্ট ব্যাংকের মতোই যৌথ বিনিয়োগে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন করতে চায় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। ৫ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের সহযোগী প্রতিষ্ঠানটির ৫১ শতাংশ নিজেদের হাতে রাখতে চায় ব্যাংকটি। ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর ব্যাংকটির পর্ষদের বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তও হয়। যদিও ২০১২ সাল থেকে ব্যাংকের একটি পণ্য হিসেবে ‘ইউ-ক্যাশ’ নামে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা।

২০১৩ সাল থেকে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে বেসরকারি খাতের মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড। কিন্তু গত তিন বছরেও খুব বেশি সফলতা দেখাতে পারেনি ব্যাংকটি। এ পরিস্থিতিতে মার্কেন্টাইল ব্যাংকও চায় বিকাশের আদলে আলাদা সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন করতে। গত ১৯ মার্চ ব্যাংকের পর্ষদ সভায় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস পরিচালনার জন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্তও হয়েছে। সম্পূর্ণ নিজেদের মালিকানায় ‘মাই-ক্যাশ’ নামেই মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালনা করতে চায় মার্কেন্টাইল। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করলেও সহযোগী প্রতিষ্ঠান তৈরির বিষয়ে এখন পর্যন্ত লিখিত আবেদন করেনি মার্কেন্টাইল ব্যাংক।

এ বিষয়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মসিহুর রহমান বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং এত দিন ধরে আমাদের একটি পণ্য হিসেবে ছিল। পর্ষদ সভায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য পৃথক একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। পৃথক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা করলে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসাণ করা সম্ভব হবে। এ প্রতিষ্ঠানের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ লোকবল নিয়োগ দেব। আশা করছি, বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের অনুমোদন দেবে।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মতোই সম্পূর্ণ নিজেদের মালিকানায় ‘টেলিক্যাশ’ নামে পৃথক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনে আগ্রহী বেসরকারি খাতের সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেড। ৪ এপ্রিল ব্যাংকটির পর্ষদ সভায় মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালনায় সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক ও শেয়ারহোল্ডারদের বিশেষ সাধারণ সভায় অনুমোদন চাইবে সাউথইস্ট ব্যাংক।

সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) এম কামাল হোসেইন বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য পৃথক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের বিষয়ে পর্ষদ সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য অনুমোদন নিয়েছে ১৯টি ব্যাংক। এর মধ্যে বিভিন্ন নামে ১৭টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে একমাত্র বিকাশ ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। বাকিরা নিজেদের একটি পণ্য হিসেবে সেবাটি দিচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়নের আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক বিকাশকে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেয়। এর পর নীতিমালা তৈরি হলে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকাশকে বৈধতা দেয়ার জন্য মোবাইল ব্যাংকিং নীতিমালার ৪ নং বিধিতে ব্যাংক ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালনা করতে পারবে বলে উল্লেখ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিকাশের মতো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালিত হলে তা এ খাতের জন্য মঙ্গলজনক হবে। এতে এ খাতের দক্ষ জনবলও তৈরি হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা এ প্রসঙ্গে বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত নীতিমালাটি সংশোধন করা হচ্ছে। এজন্য কোনো ব্যাংক কিংবা সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য নতুন করে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না। সংশোধিত নীতিমালাটি কার্যকর হলে তখন সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি প্রদানের সমস্যা নাও থাকতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৬ হাজার ৭২২। একই সময়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা পৌঁছেছে ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৫৪তে। এর মধ্যে নিয়মিত লেনদেন করে, এমন গ্রাহক রয়েছে ২ কোটি ৩৯ লাখ ৬ হাজার।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফেব্রুয়ারিতে লেনদেন হয়েছে ২২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। মোট ১৩ কোটি ৪০ লাখ ৩৩ হাজার ৯১১টি লেনদেনের মাধ্যমে এ টাকা হস্তান্তর হয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ৪৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯২৫টি লেনদেনে হস্তান্তর হয় ৭৯৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ৬৭ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে বিকাশ। প্রায় ২৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ডাচ্-বাংলার ‘রকেট’। কার্যকমে থাকা বাকি ১৫টি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র ৫ শতাংশ।