রংপুরে ছাত্রলীগ-ব্যবসায়ী সংঘর্ষে আহত ৪০

এমএনএ রিপোর্ট : রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সামনে পার্কের মোড়ে আজ শনিবার সকালে চাঁদা না পেয়ে একটি কনফেকশনারিতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ঘটনার জের ধরে সন্ধ্যার পর থেকে এলাকাবাসী-ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও সাধারণ ছাত্রদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে সাংবাদিকসহ কমপক্ষে ৪০ জন আহত হয়েছেন।

আজ শনিবার সন্ধ্যায় ওই সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এসময় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে।

এদিকে ওই হামলায় রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটি।

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের মালিক সূত্র জানায়, আজ শনিবার সকাল আটটার দিকে পার্কের মোড় এলাকায় লিফা ফার্স্ট ফুড অ্যান্ড কনফেকশনারি খোলার পর ১০-১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। দোকানের পক্ষ থেকে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হামলা চালিয়ে দোকানের ফ্রিজসহ খাবারের কাচের আসবাবপত্র ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে সকাল নয়টার দিকে সেখানকার ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ রেখে রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরে পুলিশের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীরা অবরোধ তুলে নিলে বেলা ১১টা থেকে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এদিকে ব্যবসায়ীদের অবরোধের প্রতিবাদে সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মিছিলটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে ফটকের বাইরে গেলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় একটি চায়ের দোকানে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। থেমে থেমে চলে ইটপাটকেল নিক্ষেপ।

এ ঘটনার খবর ও সংগ্রহ আর ছবি তুলতে গিয়ে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ফটো সাংবাদিক উদয় চন্দ্র বর্মণ, চ্যানেল নাইনের ক্যামেরাপারসন মুকুলসহ পাঁচজন আহত হন। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনগণ রংপুর-কুড়িগ্রাম সড়ক অবরোধ করায় কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের সঙ্গে ঢাকাসহ দূরপাল্লার সকল ধরনের যানবাহন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।

পার্কের মোড় দোকান মালিক সমিতির আহ্বায়ক এ কে এম মাসুদ রানা জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ প্রশাসন পার্কের মোড়ে হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেওয়ায় সকালের অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাস থেকে ছাত্ররা মিছিল বের করলে এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীরা এক জোট হলে ধাওয়া-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

লিফা ফার্স্ট ফুড অ্যান্ড-কনফেকশনারির মালিক মাজেদুল ইসলাম লাবলু অভিযোগ করেন, সকাল আটটায় ১০-১২ জন ছাত্র এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। এই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে দোকানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। দোকানের দুটি ফ্রিজ, শোকেসসহ প্রায় অনেক টাকার মালপত্র ক্ষতি হয় বলে দাবি করেন তিনি।

এনিয়ে তাদের সঙ্গে দোকান কর্মচারীদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান শিশিরের নেতৃত্বে একদল ছাত্র সেখানে হামলা চালায়। এতে দুপক্ষের মাঝে সংঘর্ষ শুরু হয়।

তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, এ হামলার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জড়িত। তাদের অভিযোগ, দাবিকৃত এক লাখ টাকা চাঁদা না দেয়ায় আজ শনিবার সকালে বেরোবি ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান শিশিরের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের একাংশ এ হামলা ও ভাংচুর চালায়।

এলাকাবাসী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পার্ক মোড়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সন্ধ্যা ৬টায় সমাবেশ করে। ওই সমাবেশ থেকে হঠাৎ করে একদল যুবক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার চেষ্টা করে। তারা সশস্ত্র অবস্থায় হামলা চালায়।

এ খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাসহ সাধারণ ছাত্ররা সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে পাল্টা হামলা চালায়। তবে বহিরাগত হামলাকারীরা বিশ্ববিদ্যালয় গেটসহ আশপাশ এলাকায় ব্যাপক ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।

এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সকল ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও কর্মচারীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

এদিকে সকালের ঘটনায় দুপুরে বেরোবি ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান শিশিরের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৪/৫ জনকে আসামি করে কোতয়ালী থানায় মামলা করেছেন স্থানীয় দোকান মালিক সমিতির আহ্বায়ক মাজেদুল ইসলাম লাবলু।

তিনি জানান, তার কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা চাওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় শিশির ক্ষিপ্ত হয়ে তার অনুসারীদের নিয়ে সকাল ৯টার দিকে দোকানে গিয়ে ভাংচুর চালায়।

মাজেদুল ইসলাম লাবলু জানান, এ ঘটনার প্রতিবাদে পার্কের মোড়ের দোকানদাররা একজোট হয়ে রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলে অবরোধ তুলে নেন বিক্ষুব্ধ দোকান মালিকরা। তবে পার্কের মোড় এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন তারা। এটা রাত ৯টা পর্যন্ত চলতে থাকে।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ জানান, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সকল কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। রাতেই একটি তদন্ত টিম রংপুরের উদ্দেশে রওনা দেবে। তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবে।

বেরোবি ছাত্রলীগের সভাপতি শিশির বলেন, ‘ষড়যন্ত্র করে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। ঘটনার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম। ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে একজন সাধারণ ছাত্রের কথাকাটি হয়েছে। এর জের ধরে ওই ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এখানে ছাত্রলীগের কোনো প্রকার সম্পৃক্ততা নেই।’

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ বি এম জাহিদুল ইসলাম জানান, সকালের ঘটনায় খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আনা হলেও সন্ধ্যার পর আবারও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ বাধে। সেখানকার পরিস্থিতি অনুকূলে আনতে চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

x

Check Also

বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে পঙ্গপাল

এমএনএ রিপোর্ট : করোনা সংকটের মাঝেই আরও একটি দুর্যোগর মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ; আফ্রিকা মহাদেশের ...

Scroll Up