রাখাইনে সেনা অভিযান বন্ধ ঘোষণা

41

এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চার মাস আগে সহিংস অভিযান শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে মিয়ানমার।

বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার পর বুধবার অং সান সু চির কার্যালয় থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে বলে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।

জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের মতে, গত চার মাস ধরে সেনা অভিযানে এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়েছেন।

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো অভিযানকে সম্ভাব্য জাতিগত নিধন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল বলে বর্ণনা করে আসছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর সমালোচনা ও চাপের মধ্যে মিয়ানমার সরকারের কাছ থেকে রাখাইনে সেনা অভিযান শেষ করার ঘোষণা এল।

বিবৃতিতে মিয়ানমারের নতুন নিয়োগ পাওয়া নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাং টুনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, “উত্তর রাখাইনের পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল হয়েছে। সামরিক বাহিনীর শুরু করা ক্লিয়ারেন্স অপারেশন শেষ হয়েছে, সান্ধ্য আইন শিথিল করা হয়েছে এবং শান্তি বজায় রাখার জন্য সেখানে শুধু পুলিশ উপস্থিত আছে।”

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট দপ্তরের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয়ও উত্তর রাখাইনে সামরিক অভিযান শেষ হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে, কিন্তু ওই এলাকার ‘শান্তি ও নিরাপত্তা’ বজায় রাখার স্বার্থে সামরিক বাহিনী অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে তারা।

বিবৃতিতে জানানো হয়, অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ফৌজদারি অপরাধের ব্যাপারে কোনো কৈফিয়ত থাকতে পারে না। কোথাও নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকার ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত, তা প্রমাণিত হয়েছে।

রাখাইনে সেনা অভিযান বন্ধের তথ্যের সত্যতা দেশটির প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা বলেছেন, শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে এলাকাটিতে সেনাবাহিনী রয়েছে।

এই তথ্যের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হলেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

গত বছরের ৯ অক্টোবর রাখাইন সীমান্তে একাধিক পুলিশ ফাঁড়িতে সন্ত্রাসী হামলা হয়। এতে পুলিশের ৯ সদস্যসহ ১৪ জন নিহত হন। হামলার পর রাখাইনে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। এরপর থেকে প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বলে জাতিসংঘের হিসাব।

কথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে দেশটির সেনারা রাখাইনে জাতিগত নিধন শুরু করে বলে অভিযোগ ওঠে।

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো নির্যাতন, হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের বিস্তর অভিযোগ সামনে আসতে থাকে।

সামরিক অভিযানের চলার সময় সহিংসতার খবর প্রকাশ পেলে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঢেউ বয়ে যায়। বলা হয়, উত্তর রাখাইনের মুসলিম সংখ্যালঘুদের সহায়তার জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী মিয়ানমারের নেত্রী অং সাঙ সুচি তেমন কিছুই করেননি।

রাখাইনে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, রোহিঙ্গাদের দলগত ধর্ষণসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ উঠলেও সব অস্বীকার করে সুচির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমার সরকার। বিদ্রোহ দমনে আইন মেনেই অভিযান চালানো হচ্ছে বলে দাবি করে তারা।

কিন্তু জাতিসংঘ একটি মন্তব্যের পর বিষয়টি আমলে নিতে বাধ্য হন সুচি। চার মাসের এ অভিযানে সম্ভাব্য মানবতাবিরোধী অপরাধ ও জাতিগত নির্মূলের মতো ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে অভিযোগ করে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের অভিযোগ তদন্ত করে দেখার প্রতিশ্রুতি দেন সুচি।

এরপর অভিযোগগুলো তদন্ত করতে দেশটির সামরিক বাহিনী ও পুলিশ দুটি পৃথক তদন্ত দল গঠন করে।

এর প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাং টুন জাতিসংঘের প্রতিনিধগণ ও এক দল কূটনীতিকের উপস্থিতিতে বলেছেন, ফৌজদারি অপরাধ, মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন ও অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো অজুহাত থাকতে পারে না। যেখানেই লঙ্ঘনের পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যাবে, আমরা ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত, এটি আমরা দেখিয়েছি।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়ে নিযুক্ত জাতিসংঘের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, সম্ভবত উত্তর রাখাইনের ওই সামরিক অভিযানে এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়েছেন।