রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে চাপ দিন : প্রধানমন্ত্রী

এমএনএ রিপোর্ট : রাখাইনে নাগরিকদের ওপর নির্যাতন বন্ধ ও বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে চাপ দিতে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজ রবিবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি কনফারেন্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশে তিনি এ কথা বলেন।
কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারির ভাইস প্যাট্রন শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাময়িকভাবে আমরা এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নাগরিককে আশ্রয় দিয়েছি। আপনাদের অনুরোধ জানাবো রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করুন। মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে এবং বাংলাদেশে আসা সেদেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে চাপ প্রয়োগ করুন।’
সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সঙ্কটের প্রসঙ্গ টেনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর অমানবিক নির্যাতন এবং তাদের জোর করে বিতাড়িত করার ঘটনা কেবল এ অঞ্চলে নয়, এর বাইরেও অস্থিরতা তৈরি করছে।
মিয়ানমার সরকারের এমন আচরণের জন্য ২৫ আগষ্ট থেকে ৬ লাখ ২২ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে আসা আরও প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। জাতীয় সংসদ, বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকারসহ আমরা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করেছি। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অতন্দ্র প্রহরী স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়েছে, নিশ্চিত করা হয়েছে তাদের (গণমাধ্যম) অবাধ স্বাধীনতা। মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ দায়িত্ব পালন করছেন। নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ বৈষম্য নিরসনে আমাদের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ভিত শক্তিশালী করার মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সে লক্ষ্যে আমরা রূপকল্প-২০২১ প্রণয়ন করি। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে আমরা আমাদের কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়— এই নীতির ভিত্তিতে আমাদের পররাষ্ট্র নীতি পরিচালিত হয়। বিশেষ করে প্রতিবেশি দেশসমূহের সঙ্গে আমরা সব সময়ই সুসম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। এর ফলে আমরা ভারতের সঙ্গে গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি এবং স্থল সীমানা চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি করতে পেরেছি। একইভাবে মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।’
শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে ১৯৭৫ এর ১৫ অগাস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড এবং পরে নিজের নির্বাসিত জীবনের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে এসে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের কথাও স্মরণ করেন।
বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী ৬৩তম কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি কনফারেন্সের (সিপিসি) উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
সংসদ ভবনে অবস্থিত সিপিএর ঢাকা অফিস জানিয়েছে, পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম সংসদীয় ফোরাম কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের ৫২টি দেশের মধ্যে ৪৪টি দেশ, ১৮০টি শাখার মধ্যে ১১৪টি শাখা এবারের সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে। এসব দেশের জাতীয় ও প্রাদেশিক সংসদের ৫৬ জন স্পিকার, ২৩ জন ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদ সদস্যসহ সাড়ে পাঁচশর মত প্রতিনিধি এ সম্মেলন উপলক্ষে অবস্থান করছেন ঢাকায়। ১ নভেম্বর থেকেই সম্মেলনে অংশ নিতে ইচ্ছুক সদস্য দেশের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও সাংসদরা ঢাকা আসতে শুরু করেন।
এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে ‘কনটিনিউনিং টু এনহ্যান্স হাই স্ট্যান্ডার্ডস অফ পারফরমেন্স অব পার্লামন্টোরিয়ানস’।
আজ রবিবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও এবারের কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি কনফারেন্সের কার্যক্রম শুরু হয়েছে গত ১ নভেম্বর। ঢাকার হোটেল র‌্যাডিসনে ২ থেকে ৪ নভেম্বর সিপিএর বিভিন্ন অঞ্চল, কমনওয়েলথ উইমেন পার্লামেন্টারিয়ানস এবং নির্বাহী কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটির বৈঠক হয়।
আজ রবিবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রেই সম্মেলনের সাধারণ সভা, বিভিন্ন গ্রুপের মিটিং ও আটটি কর্মশালা হবে। কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের নতুন চেয়ারপারসনও নির্বাচিত করা হবে এ সম্মেলনে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিএ-এর চেয়ারপারসন এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী । পরে তিনি এই ফোরামের প্যাট্রন ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান।
শিরীন শারমিন চৌধুরীর স্বাগত বক্তব্যের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবন এবং সিপিএ-এর কার্যক্রম নিয়ে দুটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়। দুই তথ্যচিত্রের মাঝে নাচের দল নৃত্যাঞ্চল দলগত নৃত্য পরিবেশন করে।
সিপিএ মহাসচিব আকবর খান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। এছাড়া কমনওয়েলথ মহাসচিব প্যাট্রেশিয়া স্কটল্যান্ডের একটি ভিডিও বার্তা দেখানো হয়। অষ্টম কমনওয়েলথ ইয়ুথ পার্লামেন্টের যুব প্রতিনিধি আয়মান সাদিকও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সিপিএ-এর কোষাধজ্ঞ ও অস্ট্রেলিয়ার ক্যাপিটাল টেরিটরির লেজিসলেটিড অ্যাসেমব্লির ডেপুটি স্পিকার ভিকি ডান।
গ্রেট ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিপিএর প্যাট্রন। ২০১৭ সালের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিপিএর ভাইস প্যাট্রন। ২০১৪ সাল থেকে সিপিএর বর্তমান চেয়ারপারসন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনিই সিপিএর শতবর্ষের ইতিহাসে এই পদে প্রথম নারী। এবারের সম্মেলনে তিনি বিদায় নিচ্ছেন এবং ৭ নভেম্বর নির্বাহী কমিটির নতুন চেয়ারপারসন পেতে যাচ্ছে সিপিএ।
কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন যাত্রা শুরু করে ১৯১১ সালে। আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, কানাডা, ক্যারিবিয়ান আমেরিকা ও আটলান্টিক, ভারত, প্যাসিফিক ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া- এই নয়টি অঞ্চল নিয়ে সিপিএ গঠিত।
বিশ্বের ২৪০ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন গণতন্ত্রকে সুসংহত করা, আইনের শাসন ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখা, জনগণের ক্ষমতায়ন ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে কাজ করে।
বাংলাদেশ এ ফোরামের সদস্য পদ পায় ১৯৭৩ সালে। সিপিএর ৬২তম সম্মেলন গতবছর সেপ্টেম্বরে ঢাকায় হওয়ার কথা থাকলেও জুলাই মাসে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার কারণে তা আর হয়নি।
x

Check Also

পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের ঢেউ উঠেছে : প্রধানমন্ত্রী

এমএনএ রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম একসময় অশান্ত ছিল। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় ...

Scroll Up