লিচুর ফলন বৃদ্ধির আধুনিক পদ্ধতি

603

মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ) ডেস্ক : রসে টইটুম্বর লিচু পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এটি যেমন উপাদেয় ও মজাদার তেমনি সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং উপকারি। আর কিছুদিন পরে ফলটি গাছে ধরতে শুরু করবে। তাই লিচুর ফলন বৃদ্ধির আধুনিক পদ্ধতি নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন রইল পাঠকদের জন্য।

সঙ্গত কারণে এ ফলের জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে। এর আকর্ষণীয় লালচে রঙ এবং মিষ্টি স্বাদের জন্য সবাইকে আকর্ষণ করে। বাংলাদেশের প্রায় সব জেলায় কমবেশি লিচুর চাষ হলেও বৃহত্তর রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও ময়মনসিংহে বেশি পরিমাণে উৎকৃষ্টমানের লিচু উৎপন্ন হয়। বর্তমানে পাবনায় প্রতি বছর প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমি থেকে ২৪ থেকে ২৫ হাজার মেট্রিক টন লিচু উৎপাদন হয়, যার বাজার মূল্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। লিচুর জন্য আর এক বিখ্যাত জেলা হলো দিনাজপুর। দিনাজপুরে ২০১২ সালে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছে। এখানে উৎপাদিত লিচুর মধ্যে চায়না-৩, বেদানা, বোম্বাই ও মাদরাজি উল্লেখযোগ্য।

পুষ্টিগুণ : লিচুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি, সি রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও লৌহসহ নানা খনিজ উপাদান। লিচুর অনেক ঔষধি গুণও আছে। এর পাতার রস বোলতা, বিছা ইত্যাদি কামড়ালে ব্যথা উপশমের কাজে ব্যবহার করা হয়। কাশি, পেটব্যথা, টিউমার ও গ্লান্ডের বৃদ্ধি দমনে লিচু বেশ কার্যকর। চর্মরোগের ব্যথায় এর বীজ ব্যবহার করা হয়। পানিতে সিদ্ধ লিচুর শিকড়, বাকল ও ফুল গলার ঘা সারায়। কচি লিচু শিশুদের বসন্ত রোগ ও বীজ অমস্ন ও স্নায়বিক যন্ত্রণায় ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাকল ও শিকড়ের কাঁথ গরম পানিসহ কুলি করলে গলায় কষ্টের উপশম হয়।

জাত : জাতের ওপর লিচুর ফলন ও স্বাদ বহুলাংশে নির্ভর করে। বাংলাদেশে চাষকৃত লিচুর মধ্যে বেদানা, বোম্বাই, মোজাফফরপুরী, চায়না-১, চায়না-৩, এলাচি, কদমি সবচেয়ে ভালো জাত। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি লিচু-১, বারি লিচু-২, বারি লিচু-৩ নামে তিনটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। বারি লিচু-১ একটি উচ্চফলনশীল আগাম জাত। এর ফল ডিম্বাকার ও লাল। প্রতিটি ফলের ওজন ১৮ থেকে ২০ গ্রাম। শাঁস মাংসল ও রসাল। বারি লিচু-২ উচ্চফলনশীল নাবি জাত। প্রতি বছর নিয়মিত ফল দেয়। বীজ একটু বড়। মধ্য মাঘে ফুল ধরে এবং আষাঢ়ের প্রথম সপ্তাহে পাকে। জাতটি সারা দেশে চাষযোগ্য। বারি লিচু-৩ মধ্য মৌসুমি জাত। নিয়মিত ফল ধরে। প্রতিটি ফলের ওজন ১৮ থেকে ২০ গ্রাম। ফলের শাঁস মাংসল, রসাল ও মিষ্টি। চায়না-১ নাবি জাতের লিচু। এ জাতের লিচুর শাঁস কিছুটা কম মিষ্টি। গাছের আকার মাঝারি। গাছে থোকা থোকা ফল ধরে।

চায়না-৩ একটি ভালো জাতের লিচু এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে বেশি চাষ হয়। প্রতি বছর বা নিয়মিত ফল ধরে না। ফল মোটামুটি গোলাকার এবং গড় ওজন প্রায় ২৫ গ্রাম। বীজ খুব ছোট। শাঁস রসাল ও অত্যন্ত মিষ্টি। এলাচি একটি নাবি জাতের লিচু। এর ফলের আকার ছোট, ওজন ১২ থেকে ১৫ গ্রাম। বীজ খুবই ছোট। শাঁস পুরু ও মিষ্টি। জুনের প্রথম সপ্তাহে ফল পাকে। দিনাজপুর, যশোর, কুষ্টিয়া অঞ্চলে বোম্বাই জাতের বেশি চাষ হয়। ফল মাঝারি আকারের এবং ওজন ১০ থেকে ১৫ গ্রাম। ফলের আকৃতি হৃৎপি-াকৃতি। শাঁস রসাল এবং মৃদু টকস্বাদযুক্ত। মোজাফফরপুরী জাতের লিচু ডিম্বাকার, প্রতিটি ফলের ওজন ২০ গ্রাম। পাকা ফলের রঙ গোলাপি। বেদানাজাতের লিচু খুব সুস্বাদু ও মিষ্টি। এ জাতের লিচু পাওয়া যায় জুন-জুলাইয়ে।

পরিচর্যা : সঠিক সময়ে পরিচর্যা করলে লিচুগাছের যেমন সুষম বৃদ্ধি হয়, তেমনি ফলনও বেশি পাওয়া যায়। লিচুগাছের পরিচর্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো- আগাছা দমন, পানি সেচ, ডাল ছাঁটাই, সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ, রোগ-পোকা ও বাদুড় দমন ইত্যাদি।

আগাছা দমন : ভালো ফলনের জন্য লিচু বাগানে অন্তত বছরে দুইবার অগভীর চাষ দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে।

ডালপালা ছাঁটাই : পূর্ণবয়স্ক গাছে পর্যাপ্ত আলোবাতাস প্রবেশের জন্য অপ্রয়োজনীয় ডালপালা কেটে ফেলতে হবে। গাছের শুকনো ও রোগাক্রান্ত শাখা এবং পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত ডালও ছেঁটে দিতে হবে। পুরনো শাখা ছেঁটে দিলে গাছে নতুন শাখা বের হয়, নতুন শাখায় ফুল আসে। তবে সাধারণত লিচুর ডাল ছাঁটাইয়ের বেশি প্রয়োজন হয় না। কারণ গাছ থেকে ফল সংগ্রহের সময় যেসব ছোট ছোট ডাল ভাঙা হয় তাতেই অনেকটা ডাল ছাঁটাইয়ের কাজ হয়ে যায়।

সার প্রয়োগ : ভালো ফলনের জন্য এক থেকে চার, পাঁচ থেকে ১০, ১১ থেকে ২০ এবং ২০ বছরের বেশি বয়স্ক গাছের জন্য যথাক্রমে পচা গোবর : ১০, ২০, ৩০ ও ৫০ কেজি; ইউরিয়া : ৩০০, ৮০০, ১২০০ ও ২ হাজার গ্রাম; টিএসপি : ৪০০, ১২০০, ২ হাজার ও ৩ হাজার গ্রাম; এমওপি : ৩০০, ৮০০, ১২০০ ও ১৫০০ গ্রাম; জিপসাম : ১০০, ২০০, ২৫০ ও ৩০০ গ্রাম এবং জিঙ্ক সালফেট ১০, ২০, ৩০ ও ৫০ গ্রাম সার দিতে হবে। এসব সার বছরে সমান তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম কিস্তি বর্ষার শুরুতে ফল সংগ্রহের পর, দ্বিতীয় কিস্তি বর্ষার শেষে আশ্বিন-কার্তিকে এবং তৃতীয় কিস্তি গাছে ফুল আসার পর প্রয়োগ করতে হবে।

সেচ প্রদান : চারাগাছ বৃদ্ধির জন্য শুকনো মৌসুমে ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর সেচ দিতে হবে। ফলন্ত গাছের বেলায় সম্পূর্ণ ফুল আসার পর্যায়ে একবার, ফল মটর দানার মতো হলে একবার এবং এর ১৫ দিন পর আরেকবার মোট তিনবার সেচ দিতে হবে। সেই সঙ্গে বর্ষাকালে যাতে গাছের গোড়ায় জল না জমে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

পোকামাকড় : লিচুর পোকামাকড়ের মধ্যে ফল ছিদ্রকারী পোকা ও লিচুর মাকড়ই বেশি ক্ষতি করে থাকে।

ফল ছিদ্রকারী পোকা : ফল পরিপক্ব হওয়ার সময় এ পোকা ফলের বোঁটার কাছ দিয়ে ভেতরে ঢুকে বীজ খেতে থাকে। এরা ফলের শাঁস খায় না তবে বোঁটার কাছে বাদামি রঙের এক ধরনের করাতের গুঁড়ার মতো পদার্থ উৎপন্ন করে। এতে ফলের বাজার মূল্য কমে যায়। এ পোকা দমনের জন্য সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক যেমন- রিপকড ১০ ইসি, সিমবুশ ১০ ইসি, বাসাথ্রিন ১০ ইসি

ইত্যাদি প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে ফলের মার্বেল অবস্থা থেকে শুরু করে ১৫ দিন পর পর দুই থেকে তিনবার স্প্রে করতে হবে। তবে ফল সংগ্রহের অন্তত ১৫ দিন আগে স্প্রে করার কাজ শেষ করতে হবে।

লিচুর মাকড় : মাকড় লিচুগাছের পাতা, ফুল ও ফল আক্রমণ করে। আক্রান্ত পাতা কুঁকড়ে যায় এবং পাতার নিচের দিক লাল মখমলের মতো হয়। পরে পাতা দুর্বল হয়ে মরে যায় এবং ডালে ফুল, ফল ও নতুন পাতা হয় না।

দমন ব্যবস্থা : ফল সংগ্রহের পর আক্রান্ত অংশ ভেঙে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এছাড়া ক্যালথেন ৪০ এমএফ অথবা নিউরন ৫০০ ইসি বা টর্ক ৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে নতুন পাতায় ১৫ দিন পর পর দুই থেকে তিনবার স্প্রে করতে হবে।

রোগবালাই : লিচুর বেশ কয়েকটি রোগের মধ্যে পাউডার মিলডিউ এবং অ্যানথ্রাকনোজ বা ফল পচা রোগই প্রধান। লিচুর মুকুলে সাদা বা ধূসর বর্ণের পাউডারের আবরণ দেখা যায়। আক্রান্ত মুকুল নষ্ট হয় এবং ঝরে পড়ে। এ রোগ দমনের জন্য গাছে মুকুল আসার পর সালফারজাতীয় কীটনাশক যেমন- থিউভিট/কুমুলাঙ্ ৮০ ডবি্লউপি প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

অ্যানথ্রাকনোজ বা ফল পচা রোগ : এ রোগের আক্রমণে প্রথমে ফলের বোঁটার দিকে পানি ভেজা পচা দাগের সৃষ্টি হয়, যা আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পেয়ে সব ফল পচিয়ে ফেলে এবং একসময় ফল শুকিয়ে ঝরে পড়ে। এ রোগ দমনের জন্য লিচু বাগান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। নিচের মরা পাতা, আক্রান্ত ফল ও আগাছা সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ফল গাছে থাকা অবস্থায় নিয়মিত ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

ফল ঝরা : ফল ঝরা লিচুর একটি প্রধান সমস্যা। পরাগায়ন ও গর্ভধারণে ব্যর্থতা, পুষ্টির অভাব, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, মাটিতে রসের অভাব, বাতাসে কম আর্দ্রতা, ঝড়ো বাতাস, পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ এবং বেশি গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার জন্যও লিচু ঝরে যেতে পারে। লিচু ঝরা রোধে ফল মটর দানা এবং মার্বেল আকার হলে লেবেলে নির্দেশিত মাত্রা অনুযায়ী প্লানোফিঙ্/ মিরাকুলান/ফ্লোরা নামক হরমোন গাছে স্প্রে করতে হবে। গুটি বাঁধার সময় প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ১ গ্রাম লিবরেল জিঙ্ক বা জিঙ্ক সালফেট মিশিয়ে গাছ ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। সেইসঙ্গে নিয়মিত সেচ ও রোগ-পোকা দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

ফেটে যাওয়া : দীর্ঘ খরার পর হঠাৎ বৃষ্টি, শুষ্ক ও গরম হাওয়া, রোগ-পোকার আক্রমণে ফল ফেটে যেতে পারে। এছাড়া মাটিতে বোরন বা ক্যালসিয়ামের অভাব দেখা দিলে এবং আগাম জাতে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রতিকার : মাটিতে জৈবসার ও নিয়মিত সেচ দিতে হবে। বর্ষার শুরুতে ও শেষে গাছের গোড়ায় ক্যালসিয়াম জাতীয় সার যেমন- ডলোচুন গাছপ্রতি ১০০ গ্রাম করে ব্যবহার করতে হবে অথবা ফলের কচি অবস্থায় চক পাউডার ২ গ্রাম ও বোরিক এসিড প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। সেইসঙ্গে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রতিহত করতে হবে।

বাদুড় দমন : বাদুড়ের আক্রমণের কারণেও লিচুর ফলন হ্রাস পেতে পারে। বাদুড় দমনের জন্য ফল পাকার সময় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের দেশে প্রচলিত ও সহজ উপায়গুলোর মধ্যে ঢোল-টিন পেটানো, বাঁশ ফোটানো, পটকা ফোটানো, বাগানের চারপাশে জাল পেতে রাখা, জাল দিয়ে ফল ঢেকে রাখা ইত্যাদি।

লিচু সংগ্রহ : গাছে ফল ধরার দুই মাসের মধ্যেই ফল পুষ্ট হয় ও লালচে রঙ ধারণ করে। তখন কিছু পাতাসহ ডাল ভেঙে লিচু থোকায় থোকায় সংগ্রহ করতে হবে। ঝুড়িতে পাতা বা খড় বিছিয়ে তাতে ফল রাখতে হবে।

ফলন : একটি বয়স্ক গাছে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার লিচু পাওয়া যায়। জাতভেদে হেক্টরপ্রতি ফলন হয় ২.৫ থেকে ২.৭ মেট্রিক টন।