সগিরা মোর্শেদ হত্যার ছক করেন ভাশুড় ডা. হাসান

এমএনএ রিপোর্ট : সিদ্ধেশ্বরীতে সগিরা মোর্শেদ হত্যার ছক হয়েছিল ডা. হাসান চৌধুরীর চেম্বারে। ৩০ বছর আগে হত্যাকাণ্ডের পাঁচ-ছয় দিন আগে তার ইস্কাটনের চেম্বারে যান মারুফ রেজা। তখন তিনি কোমল পানীয় খেতে দেন তাকে। রেজাকে তারপর ডা. হাসান জানান, তার স্ত্রীর সঙ্গে সগিরা মোর্শেদ নামে এক নারীর ঝামেলা চলছে। সগিরা সম্পর্কে তার ভাইয়ের স্ত্রী। পারিবারিক এ সমস্যার কথা জানিয়ে মারুফকে তিনি বলেন, সগিরাকে ভয়ভীতি দেখাতে হবে। হেনস্তা করতে হবে। প্রয়োজনে যে কোনো ‘বড় ঘটনা’ ঘটাতে হবে। এর বিনিময়ে রেজাকে ২৫ হাজার দেবেন বলে কথা দেন ডা. হাসান। ৩০ বছর পর সগিরা হত্যার মামলায় আদালতে দেওয়া চারজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও পুলিশের তদন্তে এসব তথ্য উঠে আসে। এতে দেখা যায়, এ মামলায় আগের ২৫ তদন্ত কর্মকর্তা প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা পালন করেছেন। অতীতের অভিশপ্ত বিষয় সামনে আসার পর চার আসামি ‘অনুতপ্ত ও ক্ষমা’ প্রকাশ করেছেন তাদের স্বীকারোক্তিতে।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ৩০ বছর আগে বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. হাসান চৌধুরীর একটি চেম্বার ছিল ইস্কাটনে। পূর্বপরিচিত সন্ত্রাসী মারুফ রেজার সঙ্গে ওই চেম্বারে বসেই সগিরা হত্যার ছক করেন তিনি। হত্যার পর শাশুড়িকেও ফোনে জানান, সগিরা আর বেঁচে নেই। এমনকি তদন্তের সময় তৎকালীন ডিবির সদস্যদের ম্যানেজ করে ঘটনাটি আড়াল করেন। ওই সময় তদন্তের এক পর্যায়ে হত্যায় জড়িত ডা. হাসানের শ্যালক আনাস মাহমুদ রেজওয়ানকে ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। তখন সবকিছু ম্যানেজ করে শ্যালককে ছাড়িয়ে নেন তিনি ডিবির কাছ থেকে।

তদন্তের সঙ্গে যুক্ত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, হত্যাকাণ্ডের একদিন আগে রেজা তার বন্ধু হরহর মুন্নার কাছ থেকে একটি অস্ত্র সংগ্রহ করে। ওই অস্ত্র ব্যবহার করে সগিরাকে হত্যা করে অস্ত্রটি ফিরিয়ে দিয়ে আসে আবার। হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিন পর ডা. হাসানের চেম্বারে আবার যান রেজা। সেখানে যাওয়ার পর ১৫ হাজার টাকা ডা. হাসান তুলে দেন তার হাতে। চুক্তির বাকি ১০ হাজার টাকা গত ৩০ বছরে পরিশোধ করেননি ডা. হাসান।

১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই সিদ্ধেশ্বরীতে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে খুন হন সগিরা। ওই ঘটনায় মন্টু মণ্ডলকে আসামি করে চার্জশিট দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এক নারীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই মামলায় ১৯৯১ সালে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। চলতি বছরের ১১ জুলাই মামলার স্থগিতাদেশ তুলে নিয়ে পুনঃতদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন আদালত। চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ছিলেন ডিবির দক্ষিণ বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার শাহাদাত হোসেন। তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন পিবিআইর পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম। ৩০ বছর আগের একটি চাঞ্চল্যকর খুনের মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে পিবিআই। গ্রেপ্তার হয়েছে চার প্রকৃত আসামি। যারা ইতিমধ্যে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে সগিরা হত্যাকাে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হলেন- বারডেম হাসপাতালের ডা. হাসান আলী চৌধুরী, তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিন, হাসানের শ্যালক আনাস মাহমুদ রেজওয়ান ও মূল শুটার মারুফ রেজা।

পিবিআই জানায়, এত বছর পর মামলাটির তদন্তভার পাওয়ার পর পরই তারা এর রহস্য উদ্‌ঘাটনের বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। প্রথমেই ডিবির কাছ থেকে মামলার সব নথিপত্র সংগ্রহ করে। এরপর তারা দেখে, এ মামলায় একজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী রয়েছেন। তৎকালীন সময়ে ওই সাক্ষী পেশায় ছিলেন রিকশাচালক। নথিপত্রে আব্দুস সালাম নামে ওই রিকশাচালকের ঠিকানা দেওয়া ছিল জামালপুরে। পিবিআই জামালপুরে তার ঠিকানায় খোঁজ নেয়। তখন তারা জানতে পারে, সালাম ওই ঠিকানায় থাকেন না। এরপর তারা সিদ্ধেশ্বরী ও আশপাশ এলাকার সব রিকশা গ্যারেজে পুলিশ পাঠায়। সেখানে খোঁজ নেন আব্দুস সালাম নামে কোনো চালক রয়েছেন কি-না। এতেও সালামের খোঁজ পেতে ব্যর্থ হয় পিবিআই। পরে তারা ওই এলাকার সব গ্যারেজের বয়স্ক রিকশাওয়ালাদের কাছে সালাম নামে কাউকে চিনতেন কি-না জানতে চায়। তখন একজন বয়োজ্যেষ্ঠ রিকশাওয়ালা জানান, আব্দুস সালাম নামে একজন রিকশাওয়ালাকে তিনি চিনতেন। যিনি বর্তমানে খিলগাঁও এলাকায় থাকেন। সেখানকার একটি মুদি দোকানে আব্দুস সালামের যাতায়াত রয়েছে। ওই মুদি দোকানির মোবাইল নম্বর পুলিশকে দেন রিকশাওয়ালা। নম্বর পেয়েই মুদি দোকানিকে ফোন দেন পিবিআইর সদস্যরা। আব্দুস সালাম তখন ওই মুদি দোকানে অবস্থান করছিলেন। দ্রুত সেই দোকানে গিয়ে আব্দুস সালামের সঙ্গে কথা বলে পিবিআই। ৩০ বছর আগে তার রিকশার এক যাত্রীকে কীভাবে হত্যা করা হলো সেই বর্ণনা দেন সালাম।

এরপর রিকশাচালকের বর্ণনা অনুযায়ী ডা. হাসানের শ্যালক আনাস মাহমুদ রেজওয়ানকে শনাক্ত করে পিবিআই। বসুন্ধরা এলাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে আনাস হত্যার সঙ্গে তার জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় ডা. হাসান ও তার স্ত্রীকে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় শুটার মারুফ রেজাকেও।

পিবিআইর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মাস দুয়েকের মধ্যে এই মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে। এর মধ্যে সাক্ষী হিসেবে আরও কয়েকজনের জবানবন্দি নেওয়া হবে।

সগিরার পারিবারিক সূত্র জানায়, যখন সগিরাকে খুন করা হয়, তখন তিনি বিআইডিএসে চাকরি করতেন। তার তিন মেয়ের বয়স ছিল যথাক্রমে ৮, ৫ ও ২। মাকে হারানোর পর বাবা তাদের লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করেছেন। সগিরার বড় মেয়ে সারাহাত সালমা চৌধুরী অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নে শিক্ষকতা করছেন। মেজ মেয়ে সামিয়া সারওয়াত চৌধুরী অ্যাকাউন্টিং ও হিউম্যান রিসোর্সের ওপর ডিগ্রিধারী। তিনি বাবার সঙ্গে বাংলাদেশে থাকেন। ছোট মেয়ে সিফাত আদিয়া চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করছেন।

x

Check Also

কোটি টাকারও বেশি মূল্যের পাঁচটি মোবাইল ফোন!

এমএনএ সাইটেক ডেস্ক : আধুনিক যুগে মুঠোফোন ছাড়া মানুষ প্রায় অচল।কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই মুঠোফোন হয়ে ...

Scroll Up