সরকার ঘোষিত প্রণোদনা থেকে সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছেন কি বর্গাচাষীরা?

এমএন এ অর্থনীতি রিপোর্ট : বৈশ্বিক মহামারী নভেল করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) পরিস্থিতিতে কৃষিখাতের উৎপাদন ধরে রাখতে এ খাতের কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা স্কিম। কিন্তু এ প্রণোদনা প্রদানসংক্রান্ত সার্কুলারে যেসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তাতে বঞ্চিতই হতে যাচ্ছেন দেশের ভূমিহীন কৃষক ও বর্গাচাষীরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে ৩ কোটি ৫৫ লাখ কৃষির খানার ১৯ শতাংশই বর্গাচাষী। সে হিসাবে দেশে বর্গাচাষী পরিবারের সংখ্যা ৬৫ লাখেরও বেশি।

অন্যদিকে দেশে এখনো প্রায় ২৩ লাখ ২৩ হাজার ২৭০টি ভূমিহীন কৃষক পরিবার রয়েছে, যা মোট খানার ১১ শতাংশ। এসব পরিবার সরাসরি কৃষিকাজে নিয়োজিত, যদিও অন্যের জমি ভাড়া বা লিজ নিয়ে আবাদ হয় তাদের। মূলত তারা শস্য ও বিভিন্ন ফসল ফলিয়ে উপার্জন করেন। কিন্তু সরকার ঘোষিত প্রণোদনা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে তাদের বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকেছে।

গত ১৩ এপ্রিল জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সার্কুলারের তথ্যমতে, যেসব উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান কৃষক কর্তৃক উৎপাদিত কৃষিপণ্য কিনে সরাসরি বিক্রি করে থাকে, তারা এই ঋণ প্যাকেজের আওতায় আসবে। এসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা ঋণ পাবে।

আবার সরকারের বিদ্যমান কৃষিঋণ নীতিমালা অনুযায়ী, ৫ একর বা ১৫ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিক সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। সেজন্য তাদের জমির দলিল বন্ধক রাখতে হবে। যাদের জমি নেই তারাও এ ঋণ পাবেন, তবে সে ক্ষেত্রে কৃষক যার জমি ভাড়া নিয়ে চাষ করেন, সেই ভাড়ার চুক্তিপত্র জমা দিতে হবে।

তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষক চুক্তি করে জমি লিজ নিতে পারেন না। মালিক লিখিত চুক্তির মাধ্যমে কোনো চাষীকে জমি বর্গা দেন না। কারণ লিখিত চুক্তির মাধ্যমে জমি বর্গা দিলে জমির মালিককে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ফি সরকারকে দিতে হয়। সেটি দিতে চান না বলে বেশির ভাগ জমির মালিক চুক্তিতে জমি বর্গা দেন না। যেহেতু চুক্তিপত্র নেই, সেহেতু প্রণোদনা প্যাকেজের কোনো সুবিধা পাবেন না এসব কৃষক।

ড. কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, শর্তের বেড়াজালে প্রান্তিক কৃষক ও বর্গাচাষীদের ঋণ ও প্রনোদনা পাওয়া নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্গা ও ভূমিহীন চাষীরা আগেই সুবিধাবঞ্চিত। অথচ তারাই দেশের কৃষি খাতকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আবার সার্কুলারে সরাসরি কৃষকদের ঋণ না দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের তুলনামূলক বেশি ঋণ সুবিধা প্রদানের বিষয়টি অন্যায্য। এটি অসমতাকে আরো বাড়িয়ে দেবে। তাই প্রান্তিক কৃষক ও বর্গাচাষীদের ‘লিখিত চুক্তিপত্র’-এর বদলে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও সক্ষমতার ভিত্তিতে ঋণসহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি প্রণোদনায় শস্য ও ফসল আবাদের সব ধরনের কৃষকদের প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক ক্ষতির মুখে পড়লে, পুরো দেশ আর দেশের মানুষকে তা ভোগাবে। কারণ এ মহামারীর কারণে দুনিয়ার অর্থনীতি বিপর্যস্ত। যদি কৃষি উৎপাদন বিশেষ করে ধানের উৎপাদন কমে যায় তাহলে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে সহায়তা পাওয়া কঠিন হবে। তাই এ খাতে সঠিক মানুষদের হাতে প্রণোদনা পৌঁছতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে প্রান্তিক কৃষক ও বর্গাচাষীর পাশাপাশি শস্য খাতকেও অবহেলা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এ প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ পাবেন মৌসুমভিত্তিক ফুল ও ফল চাষ, মৎস্য চাষ, পোলট্রি, ডেইরি ও প্রাণিসম্পদ খাতের উদ্যোক্তা ও কৃষকরা। কোনো খাতে ৩০ শতাংশের বেশি ঋণ দেয়া যাবে না। অর্থাৎ যদি কোনো একটা এলাকার ফুলচাষীদের ৩০ শতাংশ ঋণ দেয়া হয়, তবে ওই এলাকার আর কোনো চাষী ঋণ পাবেন না। যেসব উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান কৃষক কর্তৃক উৎপাদিত কৃৃষিপণ্য ক্রয় করে সরাসরি বিক্রি করে, তারা তহবিল থেকে ঋণ পাবে। তবে শস্য ও ফসল উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কৃষক ঋণ পাবেন না।

সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে করোনা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকে তাহলে চাল-ডাল দিয়েই অনেক দিন খাদ্য চাহিদা চালিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। আর সেই চাল-ডাল উৎপাদনকারী কোনো কৃষককেই দেয়া হবে না প্রণোদনা। এখন রবি শস্যের মৌসুম চলমান রয়েছে। তাদের ঋণ বিশেষ করে প্রণোদনা সুবিধা প্রয়োজন। এ ধরনের সংকটময় মুহূর্তে কী উদ্দেশ্যে কীভাবে এসব নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, সেটি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। যৌক্তিক ব্যাখ্যা না দিতে পারলে এ নীতিমালা সংশোধন করে পুনরায় জারি করতে হবে। সেখানে ফসল ও শস্য আবাদে কৃষকদের ঋণের ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

উল্লেখ্য, নভেল করোনা ভাইরাসের কারণে চলমান লকডাউনে পণ্য বিপণন ব্যাহত হওয়ায় বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন দেশের কৃষকরা। করোনার প্রভাবের আগ পর্যন্ত চলতি মৌসুমে প্রায় প্রতিটি সবজিপণ্য কেজিপ্রতি ১০-১৫ টাকার নিচে বিক্রি হয়নি। কিন্তু পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে পাইকারি ব্যবসায়ীরা পণ্য না কেনায় কৃষক পর্যায়ে ২-১০ টাকায় সবজি বিক্রি করতে দেখা গেছে। ক্ষেতের টমেটো পচছে ক্ষেতে। অন্যান্য সবজির মধ্যে প্রতি কেজি বেগুন ৪-৫ টাকা, কাঁচামরিচ ৬-৮, মিষ্টি আলু ৭, মিষ্টি কুমড়া ৫, মুলা ১-২, লাউ প্রতিটি ২-৫, বাঁধাকপি প্রতিটি ২-৩ ও আলু বিক্রি হয়েছে ১০-১৫ টাকার মধ্যে।

x

Check Also

করোনাভাইরাস

দেশে করোনাভাইরাসে ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ১৩৫৬, মৃত্যু ৩০

এমএনএ জাতীয় রিপোর্টঃ দেশে কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের ১৪৯তম দিনে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৫৬ জনের দেহে করোনাভাইরাস ...

Scroll Up
%d bloggers like this: