সিঙ্গাপুরে ঐতিহাসিক বৈঠকে ট্রাম্প-কিম

এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : সব জল্পনা-কল্পনা ও উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে সিঙ্গাপুরে বৈঠকে বসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার প্রধান নেতা কিম জং উন।
সিঙ্গাপুরের সেন্তোসা দ্বীপের ক্যাপেলায় হোটেলে স্থানীয় সময় আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় এই বৈঠক শুরু হয়। খবর বিবিসি, রয়টার্স ও আল জাজিরার।
যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতার এই প্রথম কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
স্থানীয় সময় আজ মঙ্গলবার সকালে পরস্পরের দিকে সতর্কভাবে হেসে করমর্দন করে ঐতিহাসিক বৈঠক শুরু করেন তারা। এসময়ে তারা প্রায় ১২ সেকেন্ড করমর্দন করেন। করমর্দন শেষে কিম জং উনের ডান কাঁধ আলতোভাবে স্পর্শ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তাদের এ বৈঠক সফল হলে তা উত্তর-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তার চিত্রে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে।
এটা অনেকটা ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের চীন সফরের মতো হতে পারে, যার পর থেকে চীনের রূপান্তর ঘটেছিল।
বিবিসি জানিয়েছে, ঐতিহাসিক সাক্ষাতের শুরুর পর্বে কাপেলা হোটেলের দুই পাশ থেকে দুই নেতা হেঁটে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার পতাকা দিয়ে সজ্জিত একটি দৃশ্যপটের সামনে প্রথমবারের মতো পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে দৃঢ়ভাবে করমর্দন করেন।
গণমাধ্যমের সামনে সংক্ষিপ্ত ওই পর্বে দুই নেতা প্রাথমিক মন্তব্য বিনিময় করেন।
কিম বলেন, আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে খুশি হলাম মিস্টার প্রেসিডেন্ট।
উত্তরে ট্রাম্প বলেন, আমি সত্যি গর্ব অনুভব করছি। আমরা মহৎ একটি আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছি এবং তা ব্যাপকভাবে সফল হবে বলে আশা করছি। আমার ধারণা এটি সত্যিই সফল হতে যাচ্ছে এবং আমাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক হবে, আমার কোনো সন্দেহ নেই।
এদিকে কিম বলেন, এই বৈঠকে বসা আমাদের জন্য সহজ ছিল না। অতীতে আমাদের পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা বসানো ছিল, কিন্তু আমরা সেগুলো সব অতিক্রম করেছি এবং আজ আমরা এখানে।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জন উনের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আমরা চমৎকার একটি দিন পার করেছি। আমরা পরস্পরের সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি।
এ সময়ে এক প্রতিবেদক জিজ্ঞেস করেন, কিম সম্পর্কে আপনি কী জেনেছেন?
ট্রাম্প বলেন, আমি জানালাম, কিম একজন মেধাবী মানুষ। এছাড়াও আমি জানলাম, তিনি তার দেশকে অনেক বেশি ভালোবাসেন। এর পর তারা আবারো দুই হাত প্রসারিত করে করমর্দন করেন। তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে আরও বহু সাক্ষাৎ হবে।
এর আগে কিমের সঙ্গে বৈঠক শেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, সবাই যা কল্পনা করেছেন, তার চেয়ে ভালো আলোচনা হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, তিনি ও কিম জং উন কিছু একটা সই করার পথে রয়েছেন। তবে কি সই করবেন, সে বিষয়ে কিছু বলেননি।
এ সময়ে এক প্রতিবেদক ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেন, কি সই করছেন, স্যার? তখন ট্রাম্প বলেন, কয়েক মিনিট পরেই আমরা তা ঘোষণা করতে যাচ্ছি।
সিঙ্গাপুরের সান্তোসা দ্বীপের কাপেলা হোটেলে কিম জং উনের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠক শেষে নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে খাবার খেতে বের হওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। তারা প্রায় ৪০ মিনিট আলোচনা করেন।
উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ে বহু প্রতীক্ষিত এ ঐতিহাসিক বৈঠক উপলক্ষে সিঙ্গাপুরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বৈঠকের মূল বিষয়- যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র সংবরণ এবং উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে নিজেদের পূর্ণ নিরাপত্তা।
এই বৈঠককে শান্তির লক্ষ্যে ‘একটি সুযোগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম থেকে আশা করা হয়েছে, এর মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন সম্পর্কের সূচনা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বৈঠক ইতিবাচক হলে উত্তর কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
গরুর পাঁজরের মাংসের সঙ্গে টক-মিষ্টি শূকরের মাংস- সিঙ্গাপুরের ঐতিহাসিক বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের আপ্যায়ন তালিকায় এভাবেই মিশে ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের স্বাদ।
চিংড়ির ককটেল ও অ্যাভোকেডো সালাদ দিয়ে দুই নেতার ভোজনপর্ব শুরু হয় বলে হোয়াইট হাউজের প্রকাশ করা মেন্যুতে দেখা গেছে। সঙ্গে ছিল মধুর ছটা দেওয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাঁচা আমের সালাদ ও তাজা অক্টোপাস। ছিল স্টাফ করা শসার কোরীয় ডিস- ‘ওইজেন’।
মধ্যাহ্ন ভোজের মূল পর্বে ছিল ভাজা ব্রোকলি ও আলুর দোপিনোর সঙ্গে পরিবেশিত চর্বির আঁচে রান্না গরুর পাঁজরের মাংস। টক-মিষ্টি মচমচে শূকরের মাংস, ফ্রাইড রাইস, ‘জো’ চিলি সসের সঙ্গে আরও ছিল লালচে এশীয় শাকসব্জি দিয়ে অল্প আঁচে রান্না কড মাছের কোরিয়ান পদ ‘দায়েগু জরিম’।
ট্রাম্প-কিম এবং তাদের প্রতিনিধিদের জন্য শেষ পর্বের মিষ্টান্নে ছিল কালো চকোলেটের টার্টলেট গানাচে, হাগেন-দাজস ভ্যানিলা আইসক্রিমের সঙ্গে চেরি কুলিস ও ক্রিমমাখানো পেস্ট্রি ট্রপিজিয়েনে।
৩০ একর জায়গার ওপর নির্মিত ক্যাপেলা হোটেলটি মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ভবনেই গড়ে উঠেছে। এই ভবনগুলো সংস্কার করে বানানো হয়েছে হোটেলটি। সেখানে এক সময় ছিল ব্রিটিশ সেনাদের অফিসার্স মেস। মোট ১১২টি রুম ও কয়েকটি ভিলা রয়েছে হোটেলটিতে।
সেন্তোসা দ্বীপটিকে বৈঠকের ভেন্যু হিসেবে বাছাই করার সবচেয়ে বড় কারণ নিরাপত্তা। সিঙ্গাপুরের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপটিতে চারদিক থেকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা অনেকটাই সহজ।
এখন অত্যন্ত চকচকে আর আলো ঝলমল একটি জায়গা হলেও সেন্তোসা দ্বীপের রয়েছে অন্ধকার এক অতীত। ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় রচিত হয়েছে এখানে। সে অধ্যায়ের পাতাজুড়ে হত্যা আর রক্তপাতের কাহিনী।