সুইডিশ রেডিওতে র‌্যাবের গুপ্তহত্যার লোমহর্ষক বিবরণ

144

এমএনএ ডেস্ক রিপোর্ট : ‘ক্রসফায়ারের’ নামে র‌্যাব আসলে কী করছে, সে সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রচার করেছে সুইডিশ রেডিও। প্রতিবেদনটির শিরোনাম, গুপ্তহত্যার কথা স্বীকার করেছে র‌্যাব। কীভাবে তারা টার্গেটকে খুন করে তার লোমহর্ষক তথ্য উঠে আসে আলাপচারিতায়।

প্রায় নয় মিনিটের ওই প্রতিবেদনে এক ব্যক্তিকে বাংলা ভাষায় হত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ দিতে শোনা যাচ্ছে। রেডিওটি’র দাবি, বিবরণ দেওয়া এই ব্যক্তি র‌্যাবের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তার অজান্তে অডিওটি রেকর্ড করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে তার নামও গোপন করা হয়।

সুইডেনের সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ‘স্ভারিজেস রেডিও’ গোপনে ধারণকৃত একটি অডিও প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশ পুলিশের এলিট বাহিনী র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) কিভাবে মানুষ হত্যা এবং অপহরণ করে তার বর্ণনা উঠে এসেছে।

ওই অডিওতে একজন উচ্চপদস্থ র‌্যাব কর্মকর্তা বাহিনীটির অপহরণ, হত্যা এবং লাশ গুমের বিষয়ে বিশদ বর্ণনা দেন। স্পর্শকাতর রেকর্ডটি প্রায় দুই ঘণ্টা দীর্ঘ। তবে সুইডিশ রেডিও যে ওই কর্মকর্তার বক্তব্য রেকর্ড করেছে, তা তিনি জানতেন না। ফলে তিনি মন খুলে নির্যাতনের গল্পও করেছেন।

সুইডিশ রেডিওর হাতে থাকা দুই ঘণ্টার সাক্ষাৎকারটি শোনার পর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পুরো ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে। এসব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের ব্যাপারে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকদেরকে বলেন, ‘র‌্যাব আইনবহির্ভূতভাবে কিছু করে না। ক্রসফায়ারে এখন পর্যন্ত যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁরা সশস্ত্র, কুখ্যাত সন্ত্রাসী, ডাকাত ও জঙ্গি। ওঁদেরকে ধরার জন্য যখন অভিযান চালানো হয়, তখন তাঁরা র‌্যাবের ওপর গুলি ছোড়েন। তখন র‌্যাবকেও গুলি ছুড়তে হয়।’

তিনি আরও বলেন, শুধু র‌্যাবের গুলিতেই সন্ত্রাসীরা নিহত হয়েছেন—ব্যাপারটা তেমন নয়, র‌্যাবের কর্মকর্তা ও সদস্যরা নিহত হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।

সুইডিশ রেডিওর প্রতিবেদনে র‌্যাবের কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি বলেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি তাঁদের নির্দেশনা হলো, ‘যদি ধরতে পারো—সে যেখানেই থাকুক, তাকে গুলি করে মারবে, তারপর পাশে একটা অস্ত্র
রেখে দেবে।’

সাধারণত যাঁরা সন্দেহভাজন অপরাধী, যাঁদের বিরুদ্ধে বিচার দ্রুত করা যাবে না বা যাঁদের পুনর্বাসন অসম্ভব, তাঁদেরই তুলে এনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হয়। এই তালিকায় সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও থাকেন কখনো কখনো।

এ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আরও জানান পুলিশ কীভাবে অপরাধীদের কাছ থেকে ঘুষ নেয়। যাঁদের হত্যা করা হয়, তাঁদের মৃতদেহের পাশে সেই অস্ত্র ফেলে আসেন। এতে করে এমন একটা ধারণা দেওয়া হয় যে তাঁরা আত্মরক্ষার জন্য গুলি ছুড়েছেন।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো র‌্যাবের কর্মকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সমালোচনা করে আসছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এ ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। র‌্যাব দ্বারা নির্যাতিত, গুম ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ব্যক্তিদের পরিবারের সাথে সম্পর্ক রাখছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

লন্ডনভিত্তিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ এক্সপার্ট ওলফ ব্লুমকভিস্ট বলেন রেকর্ডিংটি শোনা খুবই কষ্টকর।

রেডিওর প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উলফ ব্লমকভিস্ট বাংলাদেশে র‌্যাবের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল উল্লেখ করে বলেন, ‘এই বিপজ্জনক পর্যায়ের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে কেউ এত স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা গলায় কথা বলতে পারে, তা ভাবলেই গা শিউরে উঠছে। আমরা নিজেরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছি না। তবে এ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে তাঁরা বাংলাদেশে র‌্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ পেয়েছেন, সেগুলোর সঙ্গে এই বর্ণনা মিলে যায়।

র‌্যাবের কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া ওই কর্মকর্তা বলেন, র‌্যাবের সবাই গুম করায় বিশেষ পারদর্শী। হত্যাকাণ্ডের কোনো চিহ্ন যেন না থাকে সে বিষয়ে আমাদেরকে খুব তৎপর থাকতে হয়। যারা এসব করে তাদের সবার পরিচয়পত্র আগেই খুলে ফেলা হয়। যাতে হত্যাকান্ড ঘটানোর সময় সেখানে আমাদের কারো পরিচয়পত্র পড়ে না যায়। এ ছাড়া আমাদেরকে হাতমোজা পরতে হয় যাতে আমাদের হাতের ছাপ ধরা না পড়ে এবং আমাদের জুতার ওপর কাপড় মোড়ানো থাকে যাতে তার দাগ বুঝা না যায়। অভিযানের সময় আমরা ধূমপানও করতে পারি না ক্লু (প্রমাণ) থেকে যাওয়ার ভয়ে।

ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, র‌্যাব বাংলাদেশের পুলিশের একটি বিশেষ বাহিনী। এটি সামরিক বাহিনী ও পুলিশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে। ২০০৪ সালে এই বাহিনীটিকে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ বাংলাদেশে মাদক ও চোরাচালানোর মতো বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্য সামনে রেখে গঠন করা হয়।

পুলিশের অভিজাত ইউনিট হিসেবে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) যাত্রা শুরুর পর থেকে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে অপহরণ, গুম, গুপ্তহত্যা ও ‘ক্রসফায়ারের’ অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি হয়েছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে সরকার এবং র‌্যাব সব সময় এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

অডিওতে র‌্যাব কর্মকর্তার কথোপকথন ছিল বাংলায়। সুইডেনের রেডিওটি জানিয়েছে, তারা নিজেদের সূত্রগুলোর সুরক্ষার জন্য এটি অন্য দেশে অনুবাদ করেছে।

ওই র‌্যাব কর্মকর্তা তার ভাষ্যে তুলে ধরেছেন, বাহিনীটি বাছাইকৃত মানুষকে কিভাবে কোনো ঘটনার সময়ে হত্যা করে। এক্ষেত্রে চায়ের দোকানে বসে থাকার সময়ে বা অন্যান্য দৈনন্দিন কাজ করার সময় টার্গেটদের মেরে ফেলা হয়।

তিনি বলেন, শুরুর দিকে ক্রসফায়ারের ঘটনায় লোকজনের সঙ্গে অস্ত্র থাকতো না। এ কারণে তখন হত্যার কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই এলিট পুলিশ বাহিনী আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালানোর কথা বলতো।

অডিওতে র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা জানান, র‌্যাবের হাতে নিহত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের ঘটনা ক্ষেত্রে কিভাবে গুলি ছোড়া হয়েছিল তা সহ বিভিন্ন তদন্ত হয়। কোনো ঘটনা ঘটলে সব কর্তৃপক্ষ তা কিভাবে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের সাংবাদিক ও জনগণের কাছে তুলে ধরে তার চমকপ্রদ বর্ণনা তুলে ধরেছেন তিনি।

তারা ‘ক্রসফায়ারের’ মতো শব্দ ব্যবহার করেন এবং দাবি করেন যে র‌্যাবের ওপর গুলি বর্ষণ করা হলে তারা আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছিল।

ওই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কাউকে জোর করে গুম করার তিনটি কৌশলের কথা বর্ণনা করেছেন। তা হলো-টার্গেটকে ধরা, তাকে হত্যা করা এবং তৃতীয়ত মরদেহ লুকিয়ে ফেলা।

জোরপূর্বক কাউকে তুলে আনা, হত্যা, গুম নিয়ে র‌্যাব সমালোচনার মুখোমুখি হয়ে আসছিলো অনেক আগে থেকেই। গুম কীভাবে করা হয় সেটা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন সে র‌্যাব কর্মকর্তা। কাউকে জোর করে তুলে আনা, খুন করা এবং অতঃপর মরদেহ কীভাবে লুকিয়ে ফেলা হয় সেটা নিয়ে খোলাথুলি বলেন। হত্যা করার পর মরদেহের সাথে কিছু ইট বেঁধে দেওয়া হয়। তারপর নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। র‌্যাব কর্মকর্তা এমন ঠাণ্ডা গলায় কথাগুলো বলছিলেন যেন কোনো হরর ফিল্মের বর্ণনা দিচ্ছিলেন।

ওই কর্মকর্তা তুলে ধরেছেন পুলিশ কিভাবে ধরে নেয়া লোকজনদের সঙ্গে মিথ্যা বলে। তারা আটকদের বলেন, তাদের নিরাপদে রেখে আসার জন্য তাদের কোনো বন্ধুর কাছে নিয়ে যাবেন। কিন্তু এমনটি না করে পুলিশ তাদের হত্যা করে।

ওই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, প্রতিদিনই লোকজন নিখোঁজ হয়। এছাড়া এভাবে নিরাপরাধ মানুষ বা যে কেউ নিহত হতে পারে।

তার মতে, এটিই রাজনৈতিক বিরোধীদের থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হতে পারে এবং এখানে এমন শক্তি রয়েছে যারা ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে মুছে ফেলতে চায়।

তিনি এমন মতও দেন যে, এটি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেরও একটি উপায় হতে পারে। ওই কর্মকর্তার কথোপকথনের রেকর্ডে এত বেশি ভয়ংকর ঘটনার বর্ণনা রয়েছে যে সুইডিশ রেডিওর অনুবাদককে বেশ কয়েকবার বাইরে গিয়ে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে হয়েছে।

র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা বলেন, এই বাহিনী যাদের তুলে নিয়ে যায় তাদের পরিণতির বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ে নির্ধারিত হয়। এই স্পর্শকাতর রেকর্ডে তিনি বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন কিভাবে লোকজনকে নির্যাতন করা হয়।

তিনি একটি অন্ধকার কক্ষের বর্ণনা দেন, যার মধ্যে একটি বাতি ছিল এবং সেখানে গ্রেপ্তার করা একজন ব্যক্তিকে নগ্ন করে রাখা হয়েছিল। তাকে হাতকড়া পরিয়ে ঝুলিয়ে রাখার পর তার অণ্ডকোষে ইট বেঁধে দেয়া হয়েছিল। ওজনের কারণে তার অণ্ডকোষ মোটামুটি ছিড়ে গিয়েছিল। এরপর নির্যাতিত ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, তখন তিনি জানতেন না যে ওই ব্যক্তি মারা গিয়েছিল কী না।

সুইডেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্গট ওয়ালস্ট্রম এই গোপন টেপটির কথা শুনে ধাক্কা খেয়েছেন। কীভাবে মানুষ অপহরণ, খুন ও গুম করা হয় তার বর্ণনা শুনে তিনি এর নিন্দা জানিয়েছেন। মার্গট ওয়ালস্ট্রম বলেন, ‘এ ব্যাপারে শুধু একটি কথাই বলবার আছে। এটা খুবই জঘন্য কাজ হয়েছে এবং এটা অবশ্যই থামাতে হবে। আর বাংলাদেশকে এর জন্য দায় নিতে হবে।’