স্ত্রীর সহায়তায় নিজ ঘরেই খুন পিপি রথীশ : র‌্যাব

এমএনএ জেলা প্রতিনিধি : নিখোঁজের দুই মাস আগেই রংপুরের বিশেষ জজ আদালতের পিপি ও আওয়ামী লীগ নেতা রথীশ চন্দ্র ভৌমিককে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২৯ মার্চ রাতে নিজ ঘরেই খুন করা হয় রথীশ ভৌমিককে।
নিহত ব্যক্তির স্ত্রী স্নিগ্ধা সরকার ওরফে দীপা ভৌমিক পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত হয়ে প্রেমিক কামরুল ইসলামের সহায়তায় তাঁর স্বামীকে খুন করেন।
আজ রংপুরের র‍্যাব-১৩ কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন র‍্যাব মহাপরিচালক। আজ দুপুর ১২টার দিকে এ ব্রিফিং হয়।
কামরুল ইসলাম ও স্নিগ্ধা সরকার দুজনই তাজহাট উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। লিখিত বক্তব্যে বেনজীর আহমেদ বলেন, হত্যার কাজে সহায়তা করেছেন বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী।
র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পারিবারিক কলহ, সন্দেহ আর পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত হয়ে দীপা তার স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা করে এবং এ কাজে তাকে সহায়তা করে তার কথিত প্রেমিক কামরুল মাস্টার। … নিহতের স্ত্রীর স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, গত দুই মাস ধরে তারা এই হত্যার পরিকল্পনা করে।
সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৯ মার্চ বৃহস্পতিবার আনুমানিক রাত ১০টার দিকে শোয়ার ঘরে ভাত ও দুধের সঙ্গে ১০টি ঘুমের বড়ি খাওয়ানো হয় রথীশকে। কামরুল আগে থেকেই সেখানে লুকিয়ে ছিলেন। ঘুমের বড়ি খাওয়ানোর পর রথীশ অচেতন হয়ে গেলে গলায় ওড়না পেচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর রাতে রথীশের লাশ শোবার ঘরেই রেখে দেওয়া হয়।
র‍্যাব মহাপরিচালক জানান, এরপর শিক্ষক কামরুল পরদিন শুক্রবার ভোর পাঁচটায় রথীশের বাড়ি থেকে বের হন। সকাল নয়টায় তিনি একটি ভ্যান নিয়ে আসেন। লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে নিহত ব্যক্তির স্ত্রী তাঁর প্রেমিকের সহায়তায় একটি আলমারি পরিবর্তনের নাম করে সেই আলমারিতে লাশ ভরে নিয়ে তাঁদের বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে শহরের তাজহাট মোল্লাপাড়া এলাকায় কামরুলের বড় ভাই খাদেমুল ইসলামের নির্মাণাধীন একটি নির্মাণাধীন বাড়িতে। সেখানে লাশ পুঁতে ফেলার জন্য আগে থেকেই একটি কক্ষে বালি খুঁড়ে গর্ত করে রাখা হয়েছিল। ওই আলমারি বহন করে ভ্যানে তোলার কাজে তিনজন ব্যক্তি নিয়োজিত ছিল, তাদের কামরুল ঠিক করেন।
র‍্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কামরুল তার কিশোর বয়সী দুই ছাত্রকে ৩০০ টাকা করে দিয়ে ওই গর্ত খোঁড়ার কাজটি করিয়েছিলেন। তাদেরও র‌্যাব আটক করেছে। তারা রথীশের স্ত্রী ও কামরুলের ছাত্র। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের নাম প্রকাশ করা হলো না। ওই দুজন র‌্যাবকে জানিয়েছে, কামরুল মাস্টারের নির্দেশে ৩০০ টাকার বিনিময়ে গত ২৬ মার্চ ওই নির্মাণাধীন ভবনের নিচে বালু খুঁড়ে রাখে। পরবর্তী সময়ে গত ৩০ মার্চ বেলা ১১টার সময় বালু দিয়ে গর্তে ঢেকে রাখে। কামরুল তাদের শিক্ষক হওয়ায় তারা আদেশ পালন করে।
নিহত ব্যক্তির স্ত্রীর দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির জানান, রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের স্ত্রী স্নিগ্ধা সরকার ওরফে দীপা ভৌমিককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব গতকাল মঙ্গলবার নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন এবং মৃতদেহের অবস্থান সম্পর্কে র‌্যাবকে জানান। এরপর র‌্যাব গতকাল রাত ১১টায় শহরের তাজহাট মোল্লাপাড়া এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনের ভেতর থেকে মাটি খুঁড়ে মৃতদেহ উদ্ধার করে। রাত আড়াইটায় নিহত ব্যক্তির ছোট ভাই রথীশের ভাই সাংবাদিক সুশান্ত ভৌমিক সুবল ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন।
এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্নিগ্ধা সরকার, কামরুল ইসলাম, দুই এলাকাবাসীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এর আগে এই নিখোঁজের ঘটনায় ১ এপ্রিল নিহত ব্যক্তির ছোট ভাই সুশান্ত ভৌমিক বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির নামে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন।
রথীশ চন্দ্র রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক, জেলা আইনজীবী সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি রংপুর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। জেলা আইনজীবী সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক বাবু সোনা নামে পরিচিত এই আইনজীবী হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি ও রংপুর জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি ছিলেন।
রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক রথীশ জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি এবং মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এ টি এম আজহারুল ইসলামের মামলার সাক্ষী ছিলেন তিনি।
দীপা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ৩০ মার্চ ভোরে নগরীর বাবুপাড়া এলাকার বাড়ি থেকে বের হয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে শহরের দিকে রওনা হয়েছিলেন রথীশ। এরপর থেকে তার সন্ধান তারা পাচ্ছেন না।
অন্তর্ধানের পর ট্রাস্টের নেতারা সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে জামায়াতে ইসলামী কিংবা জঙ্গি গোষ্ঠী কিংবা ভূমিদস্যুরা রথীশকে ধরে নিয়ে গেছে।
রথীশের নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সোমবার সন্দেহভাজন নয়জনকে আটক করে পুলিশ। এরপর মঙ্গলবার দুপুরে রথীশের বাড়ির পাশে আট-দশ ফুট গভীর একটি ডোবায় শুরু হয় তল্লাশি।
সেখানে বিকালে আবর্জনার নিচে হালকা রক্তের ছিটা লাগানো সাদা একটি শার্ট পাওয়ার পর তা মাহিগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়। রথীশের ছোট ভাই সুশান্ত তা দেখে বলেন, শার্টটিতে রক্তের ছিটার মত কিছু লেগেছিল, তবে সেটি তার ভাইয়ের জামা নয়।
রাতে ডোবায় তল্লাশি অভিযান পুলিশ স্থগিত রাখার খানিক পর তাজহাটে র‌্যাবের অভিযানে কামরুলের ভাইয়ের নির্মাণাধীন বাড়িতে রথীশের লাশ পাওয়ার খবর আসে।
র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, ছায়া তদন্তে নেমে সোমবার তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামসহ দুজনকে তারা আটক করেন। এরপর তদন্ত ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
কামরুলের বক্তব্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে দীপাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার স্বীকারোক্তি থেকেই পরে লাশ উদ্ধার করা হয় বলে র‌্যাব মহাপরিচালকের ভাষ্য।
x

Check Also

হাসপাতাল থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে সম্রাট

এমএনএ রিপোর্ট : অবৈধ ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ...

Scroll Up