হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা হয় যেভাবে

এমএনএ রিপোর্ট : রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় করা মামলার রায় কিছুক্ষণের মধ্যে ঘোষণা করবেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। এরইমধ্যে জীবিত ৮ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। তারা রায়ের অপেক্ষায় আছে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই ভয়াবহ হলি আর্টিজান হামলা হয়। এদিন জঙ্গিরা হত্যা করেছিলেন ২০ জন দেশি-বিদেশি নাগরিককে। ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। গত এক বছরে রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলায় ১১৩ জন সাক্ষী হাজির করে।

এ হামলায় জড়িত ২১ জনকে চিহ্নিত করা হলেও রায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন ৮জন। কারণ বাকিরা বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছেন। হলি আর্টিজানে হামলা চালানো পাঁচ তরুণ সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান ‘থান্ডারবোল্টে’ সেদিনই নিহত হয়েছিলেন।

৫ জঙ্গি দুটি দলে বিভক্ত হয়ে বসুন্ধরার বাসা থেকে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার উদ্দেশে রওনা হয়।

২০১৬ সালের ১ জুলাই বিকাল ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার দিকে কাঁধে থাকা ব্যাগে অস্ত্র-গুলি, গ্রেনেড, চাকু নিয়ে বের হয়ে রাত ৮টা ৪২ মিনিটের দিকে সেখানে পৌঁছে।

প্রথমে নিবরাস ইসলাম ও মীর সামেহ মোবাশ্বের এবং একটু পর রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম বাঁধন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হলি আর্টিজানের মূল ফটকে যায়।

ফটকের নিরাপত্তাকর্মী নূর ইসলাম তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে নিবরাস নিরাপত্তাকর্মীর ডান চোখের নিচে ঘুষি মেরে তারা হলি আর্টিজানের ভেতর ঢুকে যায়। ঢুকেই গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

৩০ মিনিটের মধ্যেই পাঁচ জঙ্গির কাছে থাকা অস্ত্র-গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে দেশি-বিদেশিদের হত্যা করে। বিভিন্ন রুম, টয়লেট, চিলারঘর, হিমঘর ইত্যাদি স্থান থেকে বিদেশিদের বের করে এনে তারা এই হত্যাযজ্ঞ চালায়।

একপর্যায়ে তারা দেশি-বিদেশিদের গুলি করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে।

অপারেশন থান্ডারবোল্ট : উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের আদেশক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও র‌্যাব সহযোগী সম্মিলিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়।

সকাল ৭টার দিকে প্যারা কমান্ডো হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট রেকি করে। সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা শুরু হয়।

প্যারা কমান্ডো সদস্যরা ক্রলিং করতে করতে সামনে দিকে এগোতে থাকে এবং গুলি ছুড়তে থাকে পদাতিক ডিভিশন ও স্লাইপার টিম। এ সময় জঙ্গিরাও গুলি ছুড়তে থাকে।

১২ থেকে ১৩ মিনিটের মধ্যে সব সন্ত্রাসী নির্মূল করে প্যারা কমান্ডো টার্গেট এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। পরে অপারেশনের অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করে সকাল সাড়ে ৮টায় অভিযানের সমাপ্তি ঘটে।

অভিযানে এক জাপানি ও দু’জন শ্রীলংকার নাগরিকসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানের ওই হামলায় ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ ২৩ জন নিহত হয়েছিলেন। ওই হামলার পর ৪ জুলাই রাতে গুলশান থানার এসআই রিপন কুমার দাস অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে একটি মামলা করেন।

আসামিদের কার কী সম্পৃক্ততা

জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী : জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে গুলশান হামলার পরিকল্পনাকারী ও হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের সরবরাহকারী হিসেবে তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারি ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এরপর আদালতে ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি গুলশান হামলার আদ্যোপান্ত স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয় রাজীব গান্ধী। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে গাইবান্ধা জেলার বোনারপাড়া বাজারে বাইক হাসানের বাসায় তামিম চৌধুরী, মেজর (অব) জাহিদ, সরোয়ার জাহান, রায়হানুল কবির রায়হান, নুরুল ইসলাম মারজান ও শরীফুল ইসলাম খালেদের সঙ্গে বৈঠকে হোলি আর্টিজানে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করে রাজীব।

আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে র‌্যাশ : গুলশান হামলার পরিকল্পনা সহযোগী ও বাস্তবায়নকারী হিসেবে তদন্তে নাম এসেছে আসলাম হোসেনের। এই গ্রুপের শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ। তাকে ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছরের ১০ আগস্ট হামলায় দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। তার বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেন, হামলাকারীদের প্রশিক্ষণকারী জঙ্গিদের কাছে নিয়ে যাওয়া, বোম চার্জ শিক্ষা দেওয়া এবং হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে তদন্তে। হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া রোহানকে আসাদ গেটের আড়ং থেকে ২০১৫ সালে নিয়ে যায়। পরে প্রশিক্ষক জঙ্গি নেতা রিগ্যানের কাছে পৌঁছে দেয়। সদরঘাটের বুড়িগঙ্গায় হামলাকারীদের নৌকায় করে নিয়ে গ্রেনেড ছোড়া শেখায়। গুলশান হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে হানিফ পরিবহনে করে ঢাকায় আনে। এছাড়া হামলাকারীদের জন্য ঢাকায় বাসা ভাড়া করাসহ নানা রকম লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়। নওগাঁর মান্দা এলাকার আব্দুস সালামের ছেলে আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ উচ্চ মাধ্যমিক পড়া অবস্থায়ই প্রথমে অনলাইনের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে নব্য জেএমবির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তার। ঢাকায় আসার পর তামিম চৌধুরী ও মারজানের সঙ্গে থেকে জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। গুলশান হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তামিম ও মারজানের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই নাটোর থেকে গ্রেফতার হওয়ার পর আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে রাশেদ।

সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ : তার প্রকৃত নাম আব্দুস সবুর খাঁন ওরফে হাসান। জঙ্গি সংগঠনে সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ ওরফে মুসাফির ওরফে জয় ওরফে নসরুল্লাহ নামে জঙ্গিরা তাকে চিনতো। ২০১৭ সালের ৮ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে কয়েক দফা রিমান্ড শেষে ২৩ জুলাই গুলশান হামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় সোহেল। এ হামলায় অর্থ, অস্ত্র, বিস্ফোরক, বোমা তৈরি ও সরবরাহকারী সোহেল মাহফুজ এক সময় পুরনো জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিল। পরবর্তীতে মতবিরোধের কারণে নব্য জেএমবির সুরা সদস্য হয়। সুরা সদস্যরাই গুলশান হামলার পরিকল্পনা করে সোহেল মাহফুজকে হামলাকারী, অস্ত্র ও বোমা সরবরাহ করার দায়িত্ব দেয়।

হাদীসুর রহমান সাগর : ২০১৮ সালের ২১ মার্চ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ৫ মে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। গুলশান হামলার মামলা তদন্তে হাদীসুর রহমান সাগরের বিরুদ্ধে বোমা তৈরি ও অস্ত্র,বোমা সরবরাহের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। পুরানো জেএমবির সদস্য সাগর ২০০১ সালে জয়পুরহাট সদরের বানিয়াপাড়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করার পর থেকেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। ভারত থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আনার সবগুলো রুট জানা ছিল তার। ২০১৪ সালে নব্য জেএমবির হয়ে কাজ শুরুর পর হলি আর্টিজানে হামলার জন্য অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহ করেন।

রাকিবুল হাসান রিগ্যান : মামলার তদন্তে রাকিবুল হাসান রিগ্যান ওরফে রাফিউল ইসলাম রাফি ওরফে রিপন ওরফে হাসান ওরফে অন্তরের (২০) নাম এসেছে হামলাকারীদের প্রশিক্ষক হিসেবে। বসুন্ধরার যে বাসা থেকে হামলার পরিকল্পনা হয় সেই বাসায় তার যাতায়াত ছিল। সেখানে হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ দেয়। বয়সে তরুণ রিগ্যান ২০১৫ সালে বগুড়া সরকারি শাহ সুলতান কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। ওই বছরের ২৬ জুলাই সকালে কোচিংয়ের কথা বলে ঘর ছাড়ে।

মামুনুর রশিদ রিপন : গুলশান হামলার পরিকল্পনা ও হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের সরবরাহকারী হিসেবে নাম এসেছে নব্য জেএমবির নেতা মামুনুর রশীদ রিপনের। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গাইবান্ধা জেলার শাখাডায় জঙ্গি সরোয়ার, মারজানা, বাশার, রায়হানের সঙ্গে হামলার পরিকল্পায় বৈঠক করে। হামলার জন্য জঙ্গি হাদিসুর রহমান সাগরের সঙ্গে একে ২২ রাইফেল, পর্যাপ্ত গুলি এবং চারটি গ্রেনেড, দুটি ৭.৬২ পিস্তল ও ১২ রাউন্ড গুলি মারজানের মাধ্যমে তামিম চৌধুরীর কাছে পৌঁছে দেয়।

শরীফুল ইসলাম খালিদ : রিপনের মতো খালিদও হলি আর্টিজানে হামলার পরিকল্পনায় সহযোগিতা, হামলা বাস্তবায়ন ও হামলাকারী সরবরাহে ভূমিকা রেখেছিল। এছাড়া হামলাকারীদের জায়গা মতো পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের অর্থ সহায়তা করে। খালিদ জঙ্গি রাজীব গান্ধীর মাধ্যমে হামলাকারী পায়েল ও শরীফুল ইসলাম ডনকে বাছাই করে। এছাড়া আগে থেকেই মোবাশ্বর, রোহান ও উজ্জল তার কাছে ছিল। তাদের সবাইকে গাইবান্ধার চরাঞ্চলে প্রশিক্ষণ দেয়। খালিদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম থেকেই যোগাযোগ ছিল তার। রাজশাহী জেলার বাগমারা থানার শ্রীপুর এলাকায় তার গ্রামের বাড়ি। বাবার নাম আব্দুল হাকিম।

x

Check Also

বরেণ্য অধ্যাপক অজয় রায়ের জীবনাবসান

এমএনএ রিপোর্ট : একুশে পদকপ্রাপ্ত পদার্থ বিজ্ঞানের বরেণ্য অধ্যাপক অজয় রায় (৮৫) রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে ...

Scroll Up