২৩ অক্টোবর মিয়ানমার যাচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

36
এমএনএ রিপোর্ট : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা এগিয়ে নিতে আগামী ২৩ অক্টোবর মিয়ানমারে যাচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। তবে তিনি রাখাইনে যাওয়ার সুযোগ পাবেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
কয়েকটি সরকারি দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি মিয়ানমার সফরে যাবেন বলে জানা গেছে। আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী নিজেই এ তথ্য জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে নয় সদস্যের প্রতিনিধি দলটির সফর শেষে ২৫ অক্টোবর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
রোহিঙ্গা সঙ্কট ছাড়াও দ্বিপক্ষীয় চারটি পূর্বনির্ধারিত বিষয়ে মিয়ানামার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হবে বলে জানান কামাল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব, পুলিশ প্রধান, বিজিবি প্রধান, কোস্টগার্ড প্রধান, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক) এই সফরে মন্ত্রীর সঙ্গে থাকছেন।
মিয়ানমার সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমার সরকারের অনুরোধে আমি খুব সম্ভবত ২৩ তারিখ (অক্টোবর) মিয়নমার যাব। আমাদের অমীমাংসিত কিছু এজেন্ডা ছিল সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব। মূল যে এজেন্ডা, যেটার জন্য আমরা যাচ্ছি সেটা হলো আমাদের দেশে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে তাদের ফিরিয়ে দেয়া। কত তাড়াতাড়ি তাদের (রোহিঙ্গা) আমাদের দেশ থেকে নেয়া হবে সেটাই থাকবে আমাদের মূল এজেন্ডা।’
‘তাদের (মিয়ানমার সরকার) প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা এমন পরিবেশ নিশ্চিত করবেন যাতে রোহিঙ্গারা নিজেদের আবাস ত্যাগ করে আমাদের এখানে আর না আসে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করছি এ সফরের মাধ্যমে অবস্থার উন্নতি হবে। তারা (রোহিঙ্গারা) যাতে না আসে এজন্য একটা পদক্ষেপ মিয়ানমার সরকারকে নেয়ার জন্য অনুরোধ করব।’
নির্যাতনের শিকার মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের এলাকাগুলো পরিদর্শন করবেন কি না- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি চাইব, যদি তারা আমাকে অ্যালাউ করে আমি অবশ্যই যেতে চাইব।’
মূলত কোন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার জন্য মিয়ানমার তাদের দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে- জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘তাদের সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার যখন এসেছিলেন তখন চারটি বিষয় নিয়ে আলোচনার কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে তিনটি বিষয়ে এমওইউ (সমঝোতা স্মারক) সই করা। একটি বিষয় ছিল ইনস্ট্রুমেন্ট হ্যান্ডওভার করা। এর চারটি তো রয়েছেই। এখন মূল এজেন্ডা যেটা সেটা নিয়ে আমাদের অ্যাম্বাসেডর সাহেব সেখানে কথাবার্তা বলছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হোক।’
ফিরিয়ে দেয়া মূল এজেন্ডা হলেও এখনও রোহিঙ্গারা আসছে, তাদের থামান যাচ্ছে না কেন- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘থামাচ্ছি না এটা কিন্তু সঠিক নয়। আমাদের বর্ডার গার্ড ও কোস্টগার্ড সেখানে (সীমান্তে) আছে, প্রতিনিয়ত তাদের নিরুৎসাহিত করছি, বাধা দিচ্ছি। এরপরও যখন এসেই পড়ে… তখন তাদের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন এবং তাদের অবস্থা দেখে একটা মানবিক কারণে মাঝে মাঝে প্রবেশ করে। কিছু এলাকা আছে অত্যন্ত দুর্গম, সেই এলাকা দিয়েও এরা প্রবেশ করে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘নতুন করে পাঁচ লাখ আসার আগে আরও পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা আমাদের দেশে ছিল। বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরও কিন্তু তারা রয়ে গেছে। এখন টেকনাফ ও উখিয়ায় যে সামাজিক বিপর্যয় ঘটছে তা থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে রোহিঙ্গাদের ভাষানচরে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যারা থেকে যাবেন তাদের সেখানে নিয়ে যাব। থেকে যাবে বলতে বোঝাচ্ছি, যারা (ফিরে যেতে) সময় নেবে, আমরা মনে করছি শিগগিরই (মিয়ানমারে ফিরে যাবে), যদি শিগগিরই না হয় তবে তাদের সেখানে (ভাষানচরে) সরাতে বাধ্য হব।’
একজন ফটো সাংবাদিক পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়ে পুলিশ কমিশনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এর সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন। পুলিশ কমিশনার আমাকে তাই জানিয়েছেন।’
রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে আপত্তি জানিয়ে আসা মিয়ানমার সরকারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি আন্তার্জাতিক চাপের মুখে গত ১৯ সেপ্টেম্বর দেশটির পার্লামেন্টে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বলেন, নব্বইয়ের দশকে করা প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় ‘যাচাইয়ের মাধ্যমে’ বাংলাদেশে থাকা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে তার দেশ প্রস্তুত আছে।
সে সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজটি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হবে।
এরপর সু চির দপ্তরের মন্ত্রী কিয়া তিন্ত সোয়ে ঢাকায় এসে গত ২ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয় সেখানে।
এ বিষয়ে আরও আলোচনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিগগিরই মিয়ানমার সফরে যাবেন বলে সেদিনই জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।
মিয়ানমারের মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রস্তাব করে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলকে ওই চুক্তির খসড়াও হস্তান্তর করা হয়।
তবে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ওই খসড়ার বিষয়ে এখনও কোনো জবাব মেলেনি বলে গত ৯ অক্টোবর বিভিন্ন দেশের দূতদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
গত মঙ্গলবার ঢাকায় এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি বলেন, মিয়ানমার সরকার ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তার পেছনে ‘আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমিত করার কৌশল’ থাকতে পারে বলে বাংলাদেশ মনে করছে।
রাখাইনে কয়েকশ বছর ধরে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসবাসের ইতিহাস থাকলেও ১৯৮২ সালে আইন করে তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাই রোহিঙ্গাদের বর্ণনা করে আসছেন ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ ও ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে। দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসা চার লাখের মত রোহিঙ্গা গত কয়েক দশক ধরেই বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে।
বেশ কিছুদিন কূটনৈতিক আলোচনার পর ১৯৯২ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি প্রত্যাবাসন চুক্তি করে, যেখানে রোহিঙ্গাদের ‘মিয়ানমার সমাজের সদস্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ওই চুক্তির আওতায় মিয়ানমার সে সময় দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন রোহিঙ্গাকে দেশে ফিরিয়ে নেয়। চুক্তি নির্ধারিত যাচাই প্রক্রিয়ায় আরও ২৪১৫ জন শরণার্থীকে সে সময় মিয়ানমার থেকে আসা বলে চিহ্নিত করা হলেও মিয়ানমার তাদের আর ফিরিয়ে নেয়নি।
বাংলাদেশ সরকার বলছে, যে প্রেক্ষাপটে ১৯৯২ সালের চুক্তির নীতিমালা ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়াগুলো ঠিক করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার তুলনায় আলাদা হওয়ায় ওই চুক্তি অনুসারে এবার রোহিঙ্গাদের পরিচয় শনাক্ত করার প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়। বাংলাদেশ মানবিক কারণ সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সহায়তা দিলেও তাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতেই হবে।
গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে পুলিশের ৩০টি তল্লাশি চৌকিতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর রোহিঙ্গাবিরোধী কঠোর অভিযান শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। ওই অভিযান শুরুর পর এখন পর্যন্ত পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্তী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।